মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো না

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ঢাকা-৭ আসনের সাবেক এমপি বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সম্মিলিত ছাত্র ফোরাম আয়োজিত স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে না যাওয়ার দলীয় সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো না বলে স্বীকার করেছন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চার সংসদ সদস্যের সংসদে  যোগদান নিয়ে দলের ভেতরে নানা প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি একথা জানান। তিনি বলেন, শুধুমাত্র সস্তা শ্লোগান দিয়ে কথা বললে চলবে না। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তারেক রহমান) মহোদয়। এই কারণেই যে, আমাদেরকে দুই দিকেই লড়াইটা করতে হবে। ওই ভেতরের থেকেও কথা বলতে হবে, বাইরে থেকেও কথা বলতে হবে। এটা (সংসদে চার সদস্য শপথ নেয়া) সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা অতীতে  বলেছিলাম যে, আমরা যাবো না, সেই সময়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেই সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিলো বলে মনে হয় না। এটা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুস সালাম হলে সম্মিলিত ছ্ত্রা ফোরামের উদ্যোগে সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সভাপতি নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি নাহিদুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, প্রচার সম্পাদক শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, কেন্দ্রীয় নেতা শাহিন শওকত, আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, স্বেচ্ছাসেবক দলের ইয়াসিন আলী, শফিকুল ইসলাম মিল্টনসহ পুরনো ঢাকার নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ছয়টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি। ‘প্রহসনের নির্বাচন’ অভিহিত করে দলটি সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা সংসদে যাবে না। সংসদ সদস্য হিসেবে এই ছয়জনের কেউই শপথ নেবেন না। পরে অবশ্য মির্জা ফখরুল বাদে বাকি পাঁচজন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। প্রথমে শপথ নেন জাহিদুর রহমান। শপথ নেওয়ায় তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত হয়। গত ২৯ এপ্রিল দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ব্রাক্ষনবাড়ীয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে আমিনুল ইসলাম ও বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন।
বিএনপি ‘ঐক্যবদ্ধ’ দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের দল ঐক্যবদ্ধ আছে। এতোটুকু সমস্যা নেই। আমরা কঠিন সময় অতিক্রম করছি। এই কঠিন-সংকটময় মুহুর্তে যেকোনো সময়ে আমাদের পার হতে হবে এবং আমাদের কমিটমেন্ট আনতে হবে। বিপদকে সামনে নিয়েও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কখনো নিরাশ হবেন না, হতাশ হবেন না। বুক বেঁধে সোজা হয়ে দাঁড়ান। নেভার গিভ আপ। দলের বিষয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে তা দলীয় ফোরামের বাইরে না বলার জন্য নেতাদের প্রতি অনুরোধ রাখেন বিএনপি মহাসচিব।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক শক্তি নয়। আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু তার উল্টোটা বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের অধিকারগুলো হরণ করে মানুষের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদেরকে একটা কথা মনে রাখতে হবে- রাজনীতি স্থির বলে কোন্ কথা নেই। এটা পরিবর্তন হয়। ১৯৯০ সালের যে চিন্তা, যে ভাবনা সেই পরিস্থিতি কী ২০১৯ সালে আছে। সুতরাং আমাদেরকে ২০১৯ সালের রাজনীতিকে বিশ্লেষন করে, পর্যবেক্ষন করে তার পথ বের করার চেষ্টা করতে হবে। ২০০১ সালের অবস্থা এবং এখনকার অবস্থা কী এক। রাশিয়ার বিপ্লব ১৯১৭ সালে হয়েছিলো, এখন কী সেই রাশিয়া আছে ....।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, শুধু মাত্র নেগেটিভ চিন্তা করে এগুনো যাবে না। পজেটিভ চিন্তা করতে হবে। যখন যেখানে যতটুকু সুযোগ পাওয়া যাবে সেই সুযোগটুকু নিয়ে আমাদেরকে এগুতে হবে। আমাদের সব জায়গা থেকে লড়াইটা করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে, পথ বের করে নিতে হবে। আপনি যতই বলেন, এখানে যারা আছেন তারা প্রত্যেকে লড়াকু ছেলে-পেলে। এরা প্রত্যেকে লড়াকু সৈনিক, বার বার জেলে যাচ্ছে, আসছে। কাজ হচ্ছে না। তাই আমাদেরকে রাস্তা ও পথ বের করতে হবে।
অর্থনীতির ভয়ংকর অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সরকার শুধু গণতন্ত্রেরই ক্ষতি করেনি, দেশেরও ক্ষতি করেছে। আজকে অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। যতই বলুক এখানে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, অর্থনীতির ভীষন উন্নয়ন হয়েছে, চারিদিকে একেবারে গম গম করছে অর্থনীতি। বাস্তবে অর্থনীতি ভয়ংকর অবস্থায়। কয়েকদিন আগে সিপিডি বলছে, দেশে ১২‘শ গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে যেটা থেকে বেশি রাজস্ব আমাদের আসে। রেমিটেন্স ২৬ ভাগ কমে গেছে।
সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি বানাচ্ছেন বড় বড় মেগা প্রজেক্ট, ফ্লাইওভারস, ঢাকা শহরে এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, মেন্ট্রো রেল। খুব ভালো কথা। এটারও প্রয়োজন আছে। তবে একই সঙ্গে আমদের মানুষেরা যাতে নিরাপদে হাটতে পারে, নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, আমাদের মেয়েরা যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে, তাকে যেন আপনার ধর্ষন ও শ্লীলতাহানির শিকার হতে না হয়, কথায় কথায় খুন না হয়, কথায় কথায় হত্যা না হয়-এই জিনিসগুলো দেখতে হবে। এখন দেশে কোনো সুশাসন নেই।
প্রবৃদ্ধি ঘটছে না দাবি করে অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক বলেন, প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়। পুরোপুরিভাবে বানিয়ে-টানিয়ে একটা দিয়ে দেয়া হয়। প্রবৃদ্ধি কার? প্রবৃদ্ধি হচ্ছে আওয়ামী লীগের, তাদের লোকজনের। সাধারণ মানুষের তো অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচেছ না। বরংঞ্চ সাধারণ মানুষ আর্থিক কষ্টে আছে, তাদের গ্যাসের দাম বাড়ছে, তাদের বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, তাদের তেলের দাম বাড়ছে। প্রতি মুহুর্তে তাদের প্রকৃত আয় চলে যাচ্ছে। এই বিষয়গুলো চিন্তা করা উচিত। এটা নিয়ে ভাবা উচিত।
বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কথা তুলে ধরে আবারো তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন ফখরুল। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আজকে গুরুতর অসুস্থ। আমরা বলে দিতে চাই, কারাগারের মধ্যে তার যদি স্বাস্থ্যের অবণতি ঘটে তার সকল দায়-দায়িত্ব এই সরকারকেই বহন করতে হবে।
স্মরণসভায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, মির্জা ফখরুল যদি নেতা-কর্মীদের সঠিক নেতৃত্ব দেন, তাহলে পিন্টুর মতো অনেক নেতা তৈরি হবেন। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মির্জা ফখরুল বলেন, নেতাদের বলব, এসব কথা দলীয় ফোরামে বলবেন। বাইরে দলের বিষয়ে যত কম কথা বলবেন, তত মঙ্গলজনক হবে। তবে দল ঐক্যবদ্ধ আছে। কোনো সমস্যা নেই।
বিএনপির মহাসচিব আরও অভিযোগ করে বলেন, আজ বিচারব্যবস্থা, আইন ও নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এখানে গণতন্ত্র কাজ করতে পারে না। নাসিরউদ্দিন পিন্টুর স্মৃতিচারণ করে মির্জা ফখরুল দাবি করেন, পিন্টু এমনি মারা যাননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিনা চিকিৎসায় হত্যা করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ