মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রস্তুত করা হয়েছে ৫ লক্ষ লোকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৪৭৯ টি ত্রাণ আশ্রয় কেন্দ্র, ৩ লক্ষ লোকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ২২৬৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে তৈরী রাখা হয়েছে।  এছাড়া ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং শুরু হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে বলা হচ্ছে।

প্রস্তুত রাখা হয়েছে, সিপিপির ৬,৬৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক। রেড ক্রিসেন্টের ১০ হাজার স্বেচ্ছা সেবক ছাড়াও বিএনসিসি এবং স্কাউটের সেচ্ছাসেবকগণকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এছাড়াও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ৫০,০০০ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ১,৪০০ পিস হাইজিন কিডস মজুদ করা হয়েছে। আরো ১ লক্ষ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সংগ্রহ করা হচ্ছে। জি.আর চাল রয়েছে ২২৭ মেঃ টন, ৭০০ বান্ডিল ঢেউটিন ও ৬,৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রয়েছে।

 যে কোন ধারণের দূর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীসহ, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

 জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার সহযোগিতায় প্রাণি সম্পদ রক্ষায় ঔষধ ও খাবার মজুদ ও সংরক্ষণসহ প্রয়োজনে পশুপাখি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে বিদ্যুৎ বিভাগসহ অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে সেবা দান অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

 জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে। জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নাম্বার ০৩১-৬১১৫৪৫ মোবাইল নং-০১৭০০৭১৬৬৯১ নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ফণী’র আঘাতের আশঙ্কায় যেকোনো সহযোগিতায় প্রস্তুতি নিয়েছে নগর পুলিশও। নগরীর ১৬টি থানাকে সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুর রহমান। থানার পাশাপাশি সিএমপি সদর দফতরেও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। যে কোনো প্রয়োজনে ০১৬৭৬-১২৩৪৫৬, ০১৬৭৯-১২৩৪৫৬, ০১৯৮০-৫০৫০৫০, ০১৭৩৩-২১৯১১৯, ০৩১-৬৩৯০২২, ০৩১-৬৩০৩৫২,০৩১-৬৩০৩৭৫- এই নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ করা হয়েছে ।

 জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের জরুরী চিকিৎসা সেবা দিতে সব ধরণের প্রস্তুত গ্রহণ করেছে সিভিল সার্জন অফিস। চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলায় ৫টি করে ৭০টি, ২০০ ইউনিয়নে ১টি করে মোট ২০০টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৫টি এবং নগরে আরও ৯টি আরবান ডিসপেনসারি টিম গঠন করে তাদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি টিমে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট মিলিয়ে তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। মোট ৮৫২ জন টিমের সদস্যকে সম্ভাব্য দুর্যোগসহ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। কক্ষের নম্বর- ০৩১-৬৩৪৮৪৩।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ফণির ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ও নগরবাসীর সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুম চালু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন নম্বরে (৬৩০৭৩৯, ৬৩৩৪৬৯)।

ঘূর্ণিঝড় ফণি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম নগরীর উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সহায়তা দিতে মেয়রের নির্দেশে চসিক কাজ শুরু করেছে। করপোরেশনের পক্ষ থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ফণি চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত করলে যাতে দ্রুত পরিস্থিত মোকাবিলা করা যায়-এ জন্য চসিকের স্বেচ্চাসেবক, মেডিকেল টিমকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার ও স্যালাইন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার স্টেশন আগ্রাবাদ এর উপপরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, ফায়ার সার্ভিসের সকল কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের বিশেষ টিমকে প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা আগ্রাবাদের একটি বিশেষ টিম তৈরী রেখেছি। চট্টগ্রামের ৮২০০জন স্বেচ্ছসেবক প্রস্তুত রয়েছে। টহল গাড়ী গুলো টহল দিচ্ছে। যে কোন ধরণের দুর্ঘটনা ঘটলে উপকূলীয় লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কাজ চলছে। নগরীর জন্য ১০টি স্পেশাল গাড়ী প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

  যে কোন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী‘র ক্ষয়ক্ষতির আশংকায় আমরা সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছি। সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে দুর্যোগ মোকবিলায় সকল সেক্টরকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত নিয়ে রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে। জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নাম্বার ০৩১-৬১১৫৪৫ মোবাইল নং-০১৭০০৭১৬৬৯১ নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাস বন্ধ রাখার নির্দেশ : প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে আবহাওয়া অধিদপ্তর বিপদ সংকেত জারি করার পর চট্টগ্রাম বন্দরে তিন মাত্রার সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

এর অংশ হিসেবে বন্দরে বহির্নোঙ্গরে অবস্থানরত বড় জাহাজগুলোতে পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রাখার পাশাপশি বন্দর জেটি এলাকার জাহাজগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলাসহ সব ধরনের প্রস্তুমিূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সুমদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলার পর আমরা এখানে নিজেদের সতর্কতা হিসেবে ৩ নম্বর অ্যালার্ট জারি করেছি।

বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থাই আমরা নিচ্ছি। বহির্নোঙ্গরে বড় জাহাজ থেকে মালামাল খালাস বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২১টি জাহাজ বন্দর এলাকায় ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, সেগুলোকে বহির্নোঙ্গরে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলার পাশাপাশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সবসময় ইঞ্জিন চালু রাখতে বলা হয়েছে।

তিন নম্বর সতর্কতা জারি করায় চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলোতে সীমিত পর্যায়ে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চলছে বলে বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর মহাবিপদ সংকেত জারি করলে তখন চট্টগ্রাম বন্দরে চার মাত্রার সতর্কতা জারি করা হতে পারে। এর অর্থ হল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ