মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে ভোগান্তি বাড়ছে মানুষের

পবিত্র রমযান শুরু হতে দিন কয়েক বাকি থাকলেও এরই মধ্যে মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি বাড়ানোর নানামুখী অপতৎপরতা লক্ষ্যযোগ্য হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী-মহাজনরা প্রতি বছরের মতো এবারও একের পর এক পণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে। পেঁয়াজ-রসুন এবং ডাল ও ছোলা থেকে বিভিন্ন ধরনের সবজির তো বটেই, মাত্র দিন দশেকের ব্যবধানে চিনি, লবণ ও সয়াবিনসহ সব নিত্যপণ্যেরই দাম বেড়ে গেছে। কোনো বাজারে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। ওদিকে মুরগি ও মাংসের দামও কেবল বাড়ছেই। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়বে না বলে ঘোষণা দেয়া হলেও এবারের রমযানেও জনগণকে সবই কিনতে হবে অনেক বেশি দামে।  

সাম্প্রতিক সময়ে কষ্ট ও ভোগান্তির দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে আরো একবার প্রাধান্যে এসেছে যানজট। রাজধানী ঢাকার এই যানজট বহুদিন আগেই একটি প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। টিভি ও সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমেও যানজট নিয়ে নিয়মিতভাবে সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। এসব রিপোর্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে শত শত গাড়ির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাসহ সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের বিবরণ শুধু নয়, পাশাপাশি থাকছে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথাও। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনাও যথেষ্টই হয়েছে। এখনো হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত যানজট সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগের অবসান হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। 

যানজট প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তথ্যটি হলো, কেবলই যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার এবং ট্রাফিক পুলিশের অব্যবস্থাপনার কারণে নয়, এই সময়ের যানজটের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে এসেছে মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণের কার্যক্রম। উত্তরা থেকে মিরপুর-শ্যাওরাপড়া ও ফার্মগেট-বাংলামোটর হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণের কাজ চলছে মাসের পর মাস ধরে। যেসব এলাকায় নির্মাণ কাজ চলছে সেসব এলাকায় প্রধান সড়কগুলোকে তিনভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে মাঝখানের অংশে। এর ফলে রাজধানীর বিরাট এলাকাজুড়ে সড়কগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে আর যানবাহনের প্রচন্ড চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো রাজধানী। ফার্মগেট থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে একই স্থানে। পরিণতিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব দেখা ও জানা সত্ত্বেও সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, যার ফলে নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্ত হবে। বাস্তবে সবই চলছে অতি ধীর গতিতে। 

আমরা মনে করি, মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের নামে রাজধানীকে স্থবির করে ফেলার চলমান কার্যক্রম সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কারণ, মাত্র কিছুদিন আগে পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য মহানগরীর বিভিন্ন অংশে কয়েক বছর নষ্ট করা হয়েছে। মেট্রোরেলের জন্যও একইভাবে নষ্ট হচ্ছে মাসের পর মাস। আশংকা ও আপত্তির কারণ হলো, এই নির্মাণ কাজ আরো কতদিন চলবে সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে কিছুই জানানো হচ্ছে না। অথচ যে গতিতে নির্মাণ কাজ চালানো হচ্ছে কোনো দেশের রাজধানীতে অমন ধীর গতিতে এত বিরাট ধরনের নির্মাণ কাজ চালানো যায় না। চালানো হয়ও না। কিন্তু সব জেনে বুঝেও সরকার এখনো নীরবতাই অবলম্বন করে চলেছে।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে উদ্বেগের প্রধান একটি কারণ উল্লেখ করা দরকার। মাত্র বছর দেড়েক আগে, ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক এক গবেষণা রিপের্টে জানিয়ে রেখেছে,  তীব্র যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষের ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর অর্থের দিক থেকে প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকার। সে হিসেবে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৪ কোট টাকা। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়েছিল, যানজটের ফলে রাজধানীতে গাড়ির গতি অনেক কমে গেছে। ১০ বছ আগেও  ঢাকায় একটি যানবাহন ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো। ২০১৭ সালে সে একই যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ছয় দশমিক দুই কিলামিটারে নেমেছে। অথচ একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে পারে। সেদিক থেকে যানবাহনের গতি মানুষের হাঁটার গতির প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছিলেন, অবস্থায় পরিবর্তন না ঘটানো গেলে ২০২৫ সালে যানবাহনের গতি আরো কমে ঘণ্টায় মাত্র চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। তখন মানুষ হেঁটেই যে কোনো যানবাহনের চাইতে কম সময়ে বেশি দূরে যাতায়াত করতে পারবে। 

বিশ্বব্যাংকের ওই গবেষণা রিপোর্টে এমন আরো কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান জানানো হয়েছিল, যেগুলো সকল বিচারেই আশংকাজনক। যেমন ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ১৩৪ শতাংশ বাড়লেও রাস্তা বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। এসব রাস্তারও বেশিরভাগ জায়গা দখল করে রাখে যানবাহন, বিশেষ করে প্রাইভেট তথা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি। বিশ্বব্যাংকের ওই রিপোর্টে শংকিত হওয়ার মতো অন্য একটি তথ্যও জানানো হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ৫০ শতাংশ বেড়ে রাজধানীতে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ। এই হারে বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সালে দ্বিগুণ বেড়ে রাজধানীর জনসংখ্যা তিন কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাবে। ওই গবেষণা রিপোর্টটি সব মিলিয়েই উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বব্যাংকের গবেষকরা বলেছিলেন, রাজধানীর যানজট সমস্যার অবশ্যই সমাধান করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন তারা। বলেছিলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং রাস্তায় দ্রুত গতিসম্পন্ন যানবাহন নামানোর পাশাপাশি ঢাকার পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিত নগরায়ন করতে হবে। 

অন্যদিকে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পরিবর্তে ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের মতো এমন সব কর্মকান্ডেই সরকার ব্যস্ত রয়েছে, যেগুলোর কারণে মাসের পর মাস তো বটেই, বছরের পর বছর ধরেও রাজধানীবাসীকে প্রচন্ড কষ্ট ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। একযোগে রমযানের প্রাক্কালে চলছে দাম বাড়ানোর এবং পণ্যের সংকট সৃষ্টির অপতৎপরতা। সরকারের উচিত  মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের কাজকে দ্রুত সমাপ্ত করা এবং যানজটের প্রাত্যহিক ক্ষতি ও যন্ত্রণা থেকে জনগণকে মুক্তি দেয়া। পণ্যমূল্যের ব্যাপারেও সরকারকে জনস্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, ব্যবসায়ী ও মহাজনসহ কোনো গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পক্ষেই যাতে জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তি বাড়ানো সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ