রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বিএনপির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০ দলে আলোচনা হয়নি

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারল না বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির বিজয়ীদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে এ নির্দেশের পরও শপথ নেননি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফলে তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। বিএনপি মহাসচিব শপথ নেয়ার বিষয়টিকে দেখছেন চমক ও রাজনীতিতে ইউটার্ণ হিসেবে। তবে বিএনপি নের্তৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা দেখছেন ভিন্নভাবে। কেউ বলছেন, বিএনপির এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা। কেউ বলছেন, পর্দার অন্তরালে ঘটে যাওয়া কোনো সমঝোতা। তবে সবই উড়িয়ে দিলেন মির্জা ফখরুল। গতকাল তিনি আরও খোলাসা করে বলেছেন, সরকারের সাথে সমঝোতার প্রশ্নই আসে না। সমঝোতা করলে তো বিএনপি এখন ক্ষমতায় থাকতো।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর চার মাস ধরে সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে দলটির শক্ত অবস্থান নমনীয় হওয়ার পেছনে তিনটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন কিন্তু বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল একজন বুদ্ধিজীবী। তাদের মতে, বিএনপির দলীয় এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করা তিনটি কারণ হলো: এক. বিএনপির সম্ভাব্য ভাঙন ও বিভেদ ঠেকানো, দুই. দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রতি সরকারের নমনীয় আচরণ ও বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি দলটির নেতাদের আস্থাহীনতার প্রকাশ দৃশ্যমান না করা। বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, সিদ্ধান্তটা তারেক রহমান নির্বাচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং দল ও দলের বাইরের কয়েকজন শুভাকাক্সক্ষীর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন। তবে এটাও ঠিক, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সব সদস্য এটা জানতেন না। ওই নেতা বলেন, এটা ঠিক যে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিএনপির অসহায়ত্ব, দুর্বলতা, কিছু করতে না পারা, নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বসহ নানা দিক থেকে বিবেচনা করবেন। কিন্তু বিএনপি দেখেছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিএনপি যে সমস্যায় পড়বে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে সংকট আরও ভয়াবহ হবে। আলাপকালে ওই নেতা বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া অন্যদের শপথ নেওয়া ঠেকানো যাচ্ছিল না। বিশেষ করে দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদকে শপথ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় দলটিকে এই সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রেখেছে। বিএনপির পাঁচজন সংসদসদস্য সংসদে অবস্থান করলে এবং বিএনপি তাদের ধারণ না করলে সংসদের এই নেতারা বাইরের নেতাদের চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে বেশি অগ্রাধিকার পেতেন। এতে দলে বিভিন্ন সময় অন্য পর্যায়ের বা অন্য কোনো কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নেতারা নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করে যেতেন, যা দলে বিভক্তি সৃষ্টি করত। দলকে ভাঙনের দিকে নিতে পারত। সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নিষ্ক্রিয় ও বিভ্রান্তিতে ফেলে দিত।
বিএনপি বলছে, ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান ২৫ এপ্রিল শপথ নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে বড় কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কর্মীদের ক্ষোভ সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। ফলে, অন্যরা শপথ নিলে বিএনপির মধ্যে এদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে বলে মনে হয়নি দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের।
বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রায় ১৫ মাস ধরে কারাগারে। বিএনপির সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখন মোটেও ভালো না। এ অবস্থায় সংসদে যাওয়া নিয়ে বিএনপি যদি আগের অবস্থানেই থাকে, তাহলে সরকার বিএনপির চেয়ারপার্সনের জামিন, প্যারোল বা মুক্তির বিষয়ে কঠোর অবস্থানেই থাকবে। অন্যদিকে, আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছে না বিএনপি। ফলে, বিএনপি অনড় অবস্থানে থেকে খালেদা জিয়ার ব্যাপারে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের আন্দোলনকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে বিএনপি যুক্তিযুক্ত মনে করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সংসদে যাওয়া নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত বদলের বিষয়টি তার জানা ছিল না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহাসচিবের মাধ্যমেই তুলে ধরেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ২০ দলীয় জোটের শরিক নেতারা। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিল (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমেদ বিএনপির শপথকে হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাদের কী কথা হয়েছে বা হয়নি এ ব্যাপারে আমাকে বলা হয়নি বা ২০ দলীয় ঐক্যজোটের মিটিং ডাকা হয়নি, আলোচনাও হয়নি।
তিনি বলেন, বিএনপি সর্বপ্রথম এ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার পর ওই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তারা সংসদে যাচ্ছে, এখন তারা দলের কর্মীদের কী জবাব দেবে ? জনগণকে কী জবাব দেবে? সেটা তাদের ওপর নির্ভর করে। তবে আমি মনে করি এটা হঠকারী একটি সিদ্ধান্ত।
দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, যেখানে কোনো নির্বাচন হয়নি আমরা সেই সংসদে শপথের বিপক্ষে। এটা জাতির সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। বেইমানি করা হয়েছে। চক্রান্তের অংশ হিসেবে তাদের এমপি করা হয়েছে। এই চক্রান্তের কারণে তারা শপথ নিয়েছেন। বিএনপির এই সিদ্ধান্তে শরিকরা সবাই ক্ষুব্ধ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিএনপির কাছে মিটিংয়ে জবাব চাইব। ব্যাখ্যা চাইব।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান বলেন, বিএনপির মতো একটা বৃহত্তম রাজনৈতিক দল শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও যেভাবে লুকোচুরি করে শেষ সময়ে এসে শপথ নিল এটা দুঃখজনক। এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এই ছলচাতুরি নীতি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিএনপির জন্য বুমেরাং হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, কারান্তরীণ বেগম খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে রেখে এমপির শপথ নেয়া সঠিক হয়নি। অযথা এই ভুলের মাশুল ১৬ কোটি মানুষকে দিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান বলেন, জানি এই রকম নিষ্ঠুর সরকার ক্ষমতায় আসেনি। বেগম জিয়া বলে গিয়েছিলেন, লেডি হিটলার ক্ষমতায় এসছে। আমি মনে করি উনি খুব ফিল করেন। আমি বেগম জিয়া, আবদুস সালামসহ যারা জেলে আছেন সবার মুক্তি দাবি করছি। আমি সবার কাছে আবেদন করে বলতে চাই, আমাদের লড়াই ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। আপোষকামীতায়-সহযোগিতা-সহমর্মিতায়-সমঝোতায় আপনি জিততে পারবেন না। যদি সমঝোতা হয় তা হলে সেই সমঝোতাটা খোলাখুলি বলেন কী সমঝোতা হয়েছে ? আগেই তো আপনার কাজ  সেরে ফেলেছেন তারপরে সমঝোতার গুটি আপনার কাছে আছে। খেলতে বসে দাবার চাল দিয়ে দিয়েছেন এবার ওই পক্ষ চাল দেবে। আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।
তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম দাবি করেছেন তাদের নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণে জোটে ভাঙনের কোনো আশঙ্কা নেই। তিনি বলেছেন, এই শপথ রাজনীতির চমক  ও ইউটার্ণ। তিনি  বলেন, সময় প্রমাণ করবে যে এটা (সংসদে শপথ নেয়া) সঠিক সিদ্ধান্ত হলো কি হলো না। আমরা বিশ্বাস করি এই সিদ্ধান্তটা সঠিক সিদ্ধান্ত।  মির্জা ফখরুল বলেন, সমঝোতার কথা অনেকে বলেছেন। বিএনপি সমঝোতা করলে অনেক আগেই সমঝোতা করতে পারতো। বেগম খালেদা জিয়া যদি সমঝোতা করতে তাহলে উনি প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না বহু আগে থেকে- এই কথাগুলো আপনাদের মনে রাখতে হবে। আমরা বাস্তবতা সামনে রেখে চলছি, আমরা অন্ধের মতো চলছি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ