শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিক্ষার মূল ভিত্তি

সুপ্ত সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটে, জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি-আচার আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, মানুষের মধ্যে উন্নততর এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশিত হয়, আধ্যাত্মিকতার  উন্মেষ ঘটে, মানুষের দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি হয়, ফলে মানুষ সৎ চরিত্রবান ও নীতি নৈতিকতার ধারক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং মানুষ মানব সম্পদে পরিণত হয়। শিক্ষার্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ সর্ববিবেচনায় সমাজের একজন সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠার সুযোগ পায় এবং মানুষ প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো শিক্ষার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি। এই ভিত যত মজবুত ও নৈতিক গুণাবলি, মানবিক গুণাবলীসহ আদর্শিক হবে শিক্ষার মানও ততই শক্তিশালী ও উন্নত হবে। শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। রাষ্ট্র শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুশিক্ষা নিশ্চিত করবে এটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি শিশু যেমন তার মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শেখে, পরবর্তীতে তার জীবনে কথায় কাজে সেই ভাষার প্রভাব বিস্তার লাভ করে ঠিক তেমনি একটি শিশু যখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যে জ্ঞান বা শিক্ষা লাভ করে পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর পড়ে। এজন্য বলা হয় প্রথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষার মূল ভিত্তি। বর্তমানে ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে সবচেয়ে হতাশা এবং ক্ষোভের জায়গা হচ্ছে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমানে শিক্ষার বিষয়বস্তু সামগ্রীকভাবে একজন সৎ, যোগ্য , সামাজিক ও মানবিক গুণে গুণান্নিত মানুষ তৈরি করতে যখন ব্যর্থ হচ্ছে। তাই সকলের কাছে আমাদের প্রাথমকি বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বর্তমানে নানা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার মধ্যে দিয়ে আমাদের প্রথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আমাদের প্রথমিক বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি ভবিষৎ শিশুদের নিয়ে তাদের অভিভাবকগণ গভীর উদ্বিগ্ন। গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রির্পোট প্রকাশ করে। রিপোর্টে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রির্পোটে বলা হয় ৫ম শ্রেণিতে গণিতে পাস ২৫ শতাংশ এবং ৩য় শ্রেণিতে বাংলা পড়তে পারে ৩৫ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ তার সব শিশুকে প্রাথমিক স্কুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হলে ও শিক্ষার গুণগত মান এখন গভীর উদ্বেগের পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান না থাকায় পরবর্তীতে তাদের চাকুরি ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। উক্ত সমস্যাটি সমাধানের জন্য সকলের নিকট ৩টি পরামর্শ প্রদান করে। উক্ত অনষ্ঠানে সরকারি পর্যায়ের দায়িত্বশীলগণও উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার শুরু থেকেই  সকল ধর্মের ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হয়। যাতে কোমলমতি শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে সৎ, যোগ্য ও মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হতে পারে। অথচ বিগত এগার বছরে যাও ছিটেফুটা ধর্মীয় শিক্ষা শিক্ষার শুরুতে ছিলো তাও পর্যায়ক্রমে তুলে দিচ্ছে।
২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষার যে বেহাল দশা এ থেকে উত্তরণ করতে হলে শিশু শ্রেণি থেকে সকল শ্রেণিতে ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি শিক্ষা যেখানে শিশুদের মনের বিশুদ্ধ চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং একজন শিশু ভবিষৎ জীবনে নীতি নৈতিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ইসলামসহ সকল ধর্মই মানুষকে খারাপ ও অন্যায় কাজ পরিহার করার কথা বলে থাকে। একটি শিশু যখন প্রাথমিকভাবে এই শিক্ষা অর্জন করে থাকে তখন ভবিষৎ জীবন তাদের আলোকিত হয়। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে যতটুকু ধর্মীয় শিক্ষা ছিল তার সাথে আরো যোগ না করে বর্তমানে ধর্মীয় শিক্ষা প্রায় বাদ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে আজ অধিকাংশ ছাত্র অন্যায় ও অপকর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ঐশী তাদের বাস্তব প্রতিনিধি হয়ে আমাদের হতাশ করেছে। শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষৎ নিয়ে অভিভাবক সহ সকল মহল আজ চরম হতাশ। তাই আমি মনে করি, পুনরায় শিশু শ্রেণি থেকেই সকল ধর্মীয় শিক্ষা শুরু করতে হবে। প্রয়োজন মোতাবেক সকল শ্রেণিতে ধর্মীয় শিক্ষা চালু করতে হবে। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা বেহাল দশার আরো একটি কারণ হচ্ছে এখানে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়া। বরং অসৎ উপায়ে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অদক্ষ ও নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। যার ফলে কোমলমতি শিশুরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষৎ জীবন তাদের প্রকৃত শিক্ষার আলো থেকে অন্ধকার জগতের দিকে তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বর্তমানে নৈতিকতার মান এমনভাবে নীচে নেমে গিয়েছে যেন মনে হয় মিথ্যাই সত্য আর সত্যই মিথ্যায় পরিণত হচ্ছে যা জাতির জন্য কলংকজনক। তাই মনে হয় যে, সত্য দুর্বল হচ্ছে আর মিথ্যা কেবল শক্তিশালী থাকছে। কবি বলেছিলেন, ”সত্য সমাগত, মিথ্যা বিতাড়িত” বর্তমানে তা যেন অবাস্তব পরিণত হচ্ছে।
 ২০১৯ সালে বর্তমান এই আধুনিকতার বিকাশের যুগে প্রাথমিক শিক্ষা আজ আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ একটি জরিপে দেখা গেছে যারা সরকারি রেজিস্ট্রিকৃত এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, আর যারা অন্যান্য প্রাইভেট স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে, তাদের গুণগত মানের অবস্থা সমান না। বলা চলে যারা প্রাইভেট স্কুল, কিন্ডারগার্ডেন ও ইংরেজি ভার্সন থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে তারা বেশি মেধাবী ও সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। এই অসম অবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য।  প্রাথমিক শিক্ষাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের শিক্ষার জন্য অনেক পুরাতন শিক্ষা সরঞ্জাম ও পুরাতন সিলেবাস কারিকুলামের মাধ্যমে পাঠদান করানো হয়ে থাকে। সুতারাং আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ও আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামীদের মাধ্যমে প্রথমিক শিক্ষাকে আরো ঢেলে সাজাতে হবে। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি বাজেট কম, আর যতটুকু বাজেট হয় তা দুর্নীতের ক্ষুধার টানে তা যথাযথ প্রয়োগ হয় না। তাছাড়া এখন অনেক শিক্ষক আজ মানবেতর জীবন যাপন করছে, তারা যে বেতন পান তা দিয়ে তাদের পরিবারকে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যার কারণে তাদের আয়ের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়।
ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ মেধা খাটাতে পারে না। সতুরাং প্রাথমিক শিক্ষার সকল পর্যায়ে সরকারিভাবে বাজেট বাড়াতে হবে এবং বাজেটের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। সর্বসময় মনে রাখতে হবে শিক্ষা বাজেটে যেন দুর্নীতি স্থান না পায়। বর্তমানে প্রথমিক বিদ্যালয় নিয়ে যে সকল কারণে জাতি আজ গভীর সংশয়ের মুখে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অর্ধশিক্ষিত ও অযোগ্য শিক্ষক ও দলীয়ভাবে ম্যানেজিং কমিটি নিয়োগ দেওয়া। এই একটি কারণে প্রাথমিক শিক্ষা আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। অভিভাবকসহ সকল সুশীল সমাজ এই ব্যাপারে একমত। তাদের মতে বিদ্যালয় পরিচালনা করার জন্য দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সৎ, যোগ্য, কেপাবল ও শিক্ষার একটি নিম্নতম যোগ্যতা থাকতে হবে এবং বিদ্যালয়ের গুণাগত মান ধরে রাখার জন্য একটি কার্যকরী নিয়ামাবলি থাকবে যা প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো উন্নত করবে।   তাই বর্তমানে চালু শিক্ষার দুর্বল ও অনৈতিকতার সাথে এমন শিক্ষাকে বাদ দিতে হবে। তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে যাতে সৎ, যোগ্য, মানবিক গুণে গুণান্নিত ছাত্র-ছাত্রী তৈরি হতে পারবে। তার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঠ্যসূচি, শিক্ষকম-লী, অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের কতকগুলো বাস্তবসম্মত শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা অতিব জরুরি। নিম্নে তার বর্ণনা করা হলো:
১) আদর্শিক বিষয় সম্বলিত পাঠ্য বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা।
২) ছাত্র-ছাত্রীদের যার যার ধর্মীয় শিক্ষা মান সম্মতভাবে পাঠ্যসূচিতে থাকতে হবে।
৩) উচ্চ শিক্ষিত, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
৪) শিক্ষকদের আলাদা ব্যবস্থাপনায় বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা।
৫) শিক্ষকগণ মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছেন কিনা, তা দেখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের  মাধ্যমে মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৬) প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই বাংলা, আরবী ও ইংরেজি তিন ভাষা শিক্ষা করার ব্যবস্থা করা।
৭) শিক্ষার ঘর, বইসহ উপায় ও উপকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা।
৮) প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন স্তর থেকে পরিবর্তন করে এক স্তরে আনার ব্যবস্থা করা।
৯) শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো ও নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় সংখ্যক তৈরী করা                                                                                                                                 
 ১০) ব্র্যাক বা কোন এনজিওকে প্রাথমিক শিক্ষার মনিটরিংসহ সকল দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা।
সুতরাং পরিশেষে বলা যায় বর্তমানে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার দুরাবস্থা দূর করতে আমাদের উচিত উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
লেখক : অধ্যাপক এ.বি.এম ফজলুল করীম। সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।                    

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ