বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শ্রীলংকায় নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড

গত রোববার শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বো এবং তার নিকটবর্তী অন্য এক শহরে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণে ৩২১ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। আহত হয়েছে পাঁচশ’রও বেশি। দিনটি ছিল ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে। এই উপলক্ষে বিভিন্ন গির্জায় ধর্মপরায়ণ খ্রিস্টানরা উপাসনার জন্য সমবেত হয়েছিলেন। বোমা বিস্ফোরণের শিকারও প্রধানত তারাই হয়েছেন। সে কারণে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, খ্রিস্টানদের হত্যার উদ্দেশ্যেই সন্ত্রাসীরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা গেছে, তিনটি গির্জার পাশাপাশি তিনটি বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলসহ আরো দুটি পৃথকস্থানেও হামলা চালানো হয়েছে। আর এসব হামলায় শ্রীলংকার খ্রিস্টানরা তো বটেই, বাংলাদেশ ও ভারতসহ অন্য কয়েকটি দেশেরও অন্তত ৩৫ জন নাগরিক মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাত ভাই ও সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের মাত্র আট বছর বয়সী নাতি জায়ান চৌধুরীও রয়েছে। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এসব তথ্যের মধ্যদিয়ে পরিষ্কার হয়েছে, রোববারের ওই হামলা কেবলই খ্রিস্টানদের হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয়নি। এর পেছনে রয়েছে আরো কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য।
এদিকে বোমা বিস্ফোরণ এবং হত্যাকান্ডের পর থেকেই এমন কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলোর কারণে সমগ্র বিষয়টি নিয়ে রহস্যের জাল দানা বাঁধতে শুরু করেছে। শ্রীলংকার পুলিশ প্রধানের স্বীকারোক্তি এরকম খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি তথ্য। এই স্বীকারোক্তিতে পুলিশ প্রধান জানিয়েছেন, বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তাকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, দেশটিতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হতে পারে। এই খবরের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ প্রধান নাকি ১১ এপ্রিল সারাদেশে সতর্কতাও জারি করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা সাফল্যের সঙ্গেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং দু’-একটি নয়, আটটি পৃথক স্থানে ৩২১ জনের বেশি নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করেছে।
শুধু পুলিশ প্রধান নন, শ্রীলংকার দু’জন মন্ত্রীও হামলা হতে পারে বলে আগেই খবর পেয়েছিলেন। দু’জনের মধ্যে একজন, টেলিকম মন্ত্রী হারিন ফার্নান্দো এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, তার পিতাও হামলার খবর জানতেন এবং তিনি তাকে সেদিন গির্জায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। পিতার কথা শুনে গির্জায় যাননি বলে বেঁচে গেছেন মন্ত্রী হারিন ফার্নান্দো। হামলার আশংকা সম্পর্কে জানার পরও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেন প্রতিরোধের পদক্ষেপ নেয়নি সে ব্যাপারে তদন্ত করার এবং দায়ী কর্মর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত অন্য এক তথ্যে জানা গেছে, আত্মঘাতী হামলাকারী ছিল সাতজন এবং তাদের প্রত্যেকেই শ্রলংকার নাগরিক। তারা সকলে মারাও গেছে। সে কারণে হামলাকারীদের কাছ থেকে এই তথ্য জানার কোনো সুযোগ নেই যে, হামলা এবং বোমা বিস্ফোরণের পেছনে আসলে কারা ছিল বা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং সিসি ক্যামেরার ছবিসহ সংগৃহীত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হচ্ছে, শ্রীলংকারই একটি অখ্যাত ইসলামী সংগঠন নাকি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। কোনো কোনো মহল থেকে আবার এমন দাবিও জানানো হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক ইসলামী সংগঠন আইএসও নাকি ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। এসব তথ্য ও কথিত দাবির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে হলে আরো কিছুদিন অপেক্ষা যেমন করতে হবে তেমনি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে সত্যাসত্যও যাচাই করে দেখতে হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা। কারণ, ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী শ্রীলংকার এ হত্যাকান্ডকে গত মাসে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চে জুমার নামাজে মুসলিমদের হত্যার প্রতিশোধের পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা মনে করি, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে পর্যন্ত এ ধরনের প্রচারণা ও চেষ্টা বাস্তবে চরম উসকানির কাজ করবে এবং তার মাধ্যমে ধর্ম নির্বিশেষে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদীদেরকেই প্রশ্রয় দেয়া হবে। এমন কিছু অবশ্যই কারো কাম্য হতে পারে না। আমরা শ্রীলংকার রাজধানীতে বোমা হামলা ও হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। আমরা বেশি উদ্বিগ্ন এজন্য যে, সার্কের সদস্য এ রাষ্ট্রটিকে দীর্ঘ ২৬টি বছর গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পার হতে হয়েছে। এর প্রকাশ্য কারণ ছিল তামিলদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই গৃহযুদ্ধে মারা গেছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে তামিলরা যেমন ছিল তেমনি ছিল সিংহলীরাও। মূলত ভারতের সাহায্যে যুদ্ধ চালালেও ২৬ বছরের কোনো পর্যায়েই তামিলরা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘসহ সকল সংস্থা বরং প্রাণবিনাশী যুদ্ধ বন্ধ করার আহবান জানিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এসব আহবান ও প্রচেষ্টার ফলেই ২০১০ সালে ২৬ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। শ্রীলংকার নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল শান্তি ও প্রগতির লক্ষ্যে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে গণচীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে শ্রীলংকা নতুন নতুন চুক্তি করার মধ্য দিয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছিল। শ্রীলংকার এই স্বাধীন নীতি ও অবস্থান কোনো কোনো রাষ্ট্র ও শক্তির কাছে সম্ভবত সঠিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
বলা হচ্ছে, অমন কোনো এক বা একাধিক শক্তি ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুকৌশলে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে আরো একবার শ্রীলংকায় যুদ্ধ ও সংঘাত বাঁধানোর সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর পাশ্চাত্যের কয়েকটি রাষ্ট্রের কারণে যেহেতু ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী প্রচারণা চালানো সহজেই সম্ভব সে কারণে আইএস ধরনের বিভিন্ন সংগঠনকে জড়িত করার চেষ্টাও চালানো হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের কৌশল ও উদ্দেশ্যকে আমরা ভয়ংকর মনে করি। আমরা তাই আশা করতে চাই, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বশান্তির বৃহত্তর স্বার্থে কলম্বো হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সকল সংস্থাকে শুধু নয়, ভারত, গণচীন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর জন্যও যথোপযুক্ত ভূমিকা পালনের সুযোগ রাখতে হবে। আমরা চাই, এমন আয়োজন নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো দেশে কলম্বো হত্যাকান্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ