মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শা’বান মাসে পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতির জন্য আমাদের করণীয়

প্রফেসর এ বি এম ফজলুল করিম : পবিত্র শা’বান মাসের শুরু হওয়ার অর্থ হলো রমযান মাসের সূচনা। কেননা এ মাসের পরই আসে রমযান মাস। তাই মাহে রমযান পূর্ব প্রস্তুতির মাস শা’বান মাস। পবিত্র রমযান মাসের প্রস্তুতির জন্য শা’বান মাসে আমাদের করণীয় কি তা আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে, তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো।
প্রথমত : শা’বান মাস থেকেই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত শারীরিকভাবে কোনো ছোট বা বড় রোগ থাকলে তা সারানোর চেষ্টা করা, যেন পবিত্র রমযানের ৩০ রোযা ভালভাবে রাখতে পারেন। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার সাথে সাথে আমাদের মানসিকভাবেও রমযানের রোযা রাখার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত : শা’বান মাসে এমন পরিমাণ নফল রোযা রাখব, যাতে রমযানের রোযা রাখতে কোনো অসুবিধা না হয়। এ ব্যাপারে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বান মাসে এমনিভাবে রোযা রাখা আরম্ভ করতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি বুঝি আর রোযা ছাড়বেন না। আবার তিনি এমনিভাবে রোযা রাখা ছেড়ে দিতেন যে, আমরা মনে করতাম তিনি বুঝি আর রোযা রাখবেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান মাস ব্যতীত আর কোনো মাসে পুরো মাস রোযা রাখতে দেখিনি। তা ছাড়া শা’বান মাস ব্যতীত আর কোন মাসে এত বেশি রোযা রাখতে দেখিনি। -বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যেন রমযানের একদিন বা দু’দিন পূর্ব থেকে রোযা না রাখে। হ্যাঁ, তবে যে ব্যক্তি ঐ দিনগুলোতে রোযা রাখতে অভ্যস্ত, সে ঐ দিনগুলোতে রোযা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত : পবিত্র মাহে রমযান প্রতি ১১ মাস পর আমাদের নিকট রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে হাজির হয়। এ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে রমযান আসার কারণে রমযানের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয় মাছআলা-মাছায়েল অনেক সময় আমরা পুরোপুরি মনে রাখতে পারি না। তাই শা’বান মাসের শুরু থেকে আমাদের রমযানের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করার জন্য চেষ্টা করা উচিত।
চতুর্থ : আমাদের দেশে ১০০ ভাগ মুসলমান রমযান মাসে রোযা রাখে না। সুতরাং আমাদের উচিৎ শা’বান মাস থেকে যারা রমযানের রোযা পুরোপরি রাখে না তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে ও গ্রুপ দাওয়াতের মাধ্যমে রোযা রাখার জন্য উৎসাহিত করা। সম্ভব হলে ঐ সময়ে রোযা আসার আগে ছোট বা বড় ধরনের সভার আয়োজন করা।
পঞ্চম : পবিত্র মাহে রমযানের পবিত্রতা ও মর্যাদা যাতে কোনভাবে নষ্ট হতে না পারে, সেই জন্য শা’বান মাসেই আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করা দরকার। পারিবারিকভাবে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে যাতে রমযান মাসে দিনের বেলার পরিবেশ সুন্দর থাকে, সম্ভব হলে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি আমাদের উচিত শা’বান মাস থেকেই যাতে রমযান মাসের রোযা পুরোপুরি রাখতে পারি তার জন্য আল্লাহর রহমত ও সাহায্য কামনা করা।
ষষ্ঠতম : যেমন কোনো মহান ব্যক্তি আমাদের বাসায় আসলে আমরা আমাদের সাধ্যমত বাসা-বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করি, ডেকোরেশন করি এমনি ভাল পোশাক পরিধান করি। তার জন্য ভাল মানের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি, ডেকোরেশন করি এমনকি ভাল পোশাক পরিধান করি। তার জন্য ভাল মানের আপ্যায়নের ব্যবস্থা ইত্যাদির আয়োজন করে থাকি। তার চেয়েও শতগুণ বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পবিত্র মাহে রমযানের আগমনকে। কারণ রমযান মাসের গুরুত্ব অনেক বেশি। রমযান মাস হচ্ছে :
১. রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হচ্ছে পবিত্র রমযান মাস।
২. রমযান হচ্ছে পবিত্র আল কুরআন নাজিলের মাস।
৩. রমযান মাসে এমন একটি রাত আছে, যে রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
৪. রোযা আমাদের জন্য গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ।
৫. রোযা কাতওয়া অর্জন ও সবর করার মাস।
৬. আল্লাহ বলেন- “রমযান মাসে কল্যাণের দ্বার খুলে দাও এবং অকল্যাণের দ্বার বন্ধ করো”।
সুতরাং পবিত্র মাসে রমযানের আগমনে শা’বান মাস থেকেই আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। শা’বান মাস থেকে কুরআন চর্চার জন্য আমরা উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।
আমরা জানি “আত্মার সাথে যেমন দেহের সম্পর্ক তেমনি কুরআনের সাথে মু’মিনের সম্পর্ক থাকা উচিত।” কেননা বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের সেতুবন্ধন হলো আল কুরআন। সুতরাং এ সম্পর্ক অটুট রাখার জন্য আমাদের করণীয় কাজ হলো :
ক. ভক্তি ও সহিহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা করা। প্রতিদিন আমাদেরকে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াতসহ অধ্যয়ন করতে হবে।
খ. কুরআন বুঝে অধ্যয়ন করা ও বাস্তবে আমলা করা এবং কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে, কুরআন থেকে হিদায়াত পাবার লক্ষ্যে।
গ. কুরআনের প্রতি নির্ভেজাল বিশ্বাস আনা এবং আমাদেরকে নির্ভেজাল বিশ্বাস আনার আহ্বান জানান।
ঘ. আমাদের জীবনের যাবতীয় বিষয়ের সমাধান কুরান থেকে জানতে হবে।
ঙ. রাসূল (সা)-এর ২৩ বছরের জীবনী কুরআন থেকে জানতে হবে। বেশি বেশি করে হাদীস অধ্যয়ন করা দরকার এবং সাহাবাদের জীবনী অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।
চ. আখিরাতের নাজাত ও মুক্তি পাবার উদ্দেশে কুরআনের ব্যাপক চর্চা করতে হবে। কুরআন ও হাদীসের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ছ. তালিমুল কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জ. ব্যাপকভাবে মসজিদে মসজিদে দারসুল কুরআন চালু করা।
ঝ. বয়স্কদের মসজিদে মসজিদে সহিহ-শুদ্ধ করে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
ঞ. ব্যাপকভাবে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের ব্যবস্থা করা।
সপ্তমত শা’বান মাস থেকেই মসজিদে, বাসায় বা অন্য কোনো স্থানে কুরআন বুঝা আমাদের নেশায় পরিণত করতে হবে। এ মাস থেকে জান্নাত পাবার পথ সুগম করার জন্য বাস্তবে আমাদের কতগুলো আমল করতে হবে। তাহলো :
ক. কুরআন ও হাদীসের আলোকে বাস্তবে আমাদেরকে আমলের অভ্যাস করতে হবে।
খ. এই সময়ে একজন রোজাদার আল্লাহর সাথে তার গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
গ. নফল রোজা ও নফল নামাজ পরার জন্য শা’বান মাস থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।
ঘ. বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত ও বাস্তবে তার আলোকে আমল করা।
ঙ. শা’বান মাস থেকেই ব্যক্তিগত তহবিল থেমে বেশি বেশি দান-খয়রাত করা।
চ. জিকির-আজকারসহ নফল ইবাদাত-বন্দেগী বেশি পরিমাণে করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।
অষ্টমত মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) শা’বান মাসে কী কী আমল করতেন তা আমরা শা’বান মাসেই জেনে নিব। তাহলে:
ক. শা’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবর জিয়ারত করতেন।
খ. দিনে বেলা নফল রোজা রাখতেন এবং রাতে নামাজ আদায় করতেন।
গ. ব্যাপকভাবে কুরআন অধ্যয়ন ও জিকির আজকার করতেন।
ঘ. শা’বান মাসের প্রথম অংশে নফল রোজা রাখতেন এবং শেষ অংশে রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতেন।
ঙ. রাত জাগরণ করে ইবাদত করতেন।
চ. শা’বান মাসে সাহাবায়ে কেরামকে পবিত্র মাহে রমযানের প্রয়োজনীয় হিদায়েত দিতেন।
সুতরাং পবিত্র মাহে রমযানের আগমনের পূর্বেই আমাদের শা’বান মাস থেকেই পবিত্র মাহে রমযান মাসকে সফলভাবে পালন করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
প্রবন্ধকার : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ