মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্যারোলে মুক্তি, বেগম জিয়ার লন্ডন যাত্রা এবং ৬ জনের শপথ গ্রহণের খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন

আসিফ আরসালান : আমি দৈনিক ৮টি খবরের কাগজ পড়ি। প্রথমেই টেনে নেই ‘ডেইলি স্টার’। বাংলাদেশী কাগজ পড়া শেষ হলে আমি ভারতের ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, ‘স্টেটসম্যান’ এবং ‘দি হিন্দু’ পড়ি। ‘ডেইলি স্টার’ আমার প্রিয় পত্রিকা। কারণ এই পত্রিকাটি ভারতীয় এবং মার্কিন স্ট্যান্ডার্ড ফলো করে। তাদের পরিবেশিত সংবাদকে ঠিক বস্তুনিষ্ঠ বলা যায় না। তারা সরকার বিরোধী সেকথাও বলা যাবে না। তবে সরকারের অনেক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অনেক ভুল তারা ধরিয়ে দেয়। ছাপা ঝকঝকে, মেকাপ সুন্দর। তবে পত্রিকাটিতে মনে হয়, পবিত্র ইসলামের প্রতি একটি এ্যালার্জি রয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো কাজের সমালোচনা করলেও তারা যে, বিএনপির ঘোর বিরোধী সেটি বুঝতে কোনো শিক্ষিত পাঠকের অসুবিধা হয় না। জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের চোখের বালি। একটি পত্রিকাকে বিচার করতে গেলে তার বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বিচার করতে হয়। এই দুটি মাপ কাঠির একটিতেও ডেইলি স্টার উৎরে যাবে না। তবুও ডেইলি স্টার আমার পছন্দের পত্রিকা। এই পত্রিকাটির ১৬ এপ্রিল ইস্যুর একটি সংবাদ শিরোনামে আমার চোখ আটকে যায়। খবরটি প্রকাশিত হয়েছে প্রথম পৃষ্ঠায়, ডাবল কলামে। শিরোনাম, “Khaleda going to UK soon? Government, BNP reportedly reached an ‘understanding” খবরটি লিখেছেন, মোহাম্মদ আল মাসুম মোল্লা। খবরটিকে দীর্ঘ না বললেও নাতিদীর্ঘ বলতেই হবে। তাই আমি অত বড় খবরের অনুবাদে না গিয়ে সংক্ষেপে খবরটির সারাংশ নিচে বর্ণনা করছি।
খবরে বলা হয়েছে যে আর কয়েকদিনের মধ্যেই বেগম খালেদা জিয়ার কারা জীবনের অবসান ঘটবে। রাজনৈতিক মহলে এই ধরনের একটি প্রবল গুঞ্জন রয়েছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শীর্ষ নেতারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৭৪ বছর বয়সী এই নেত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো, তাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেওয়া হবে। এই বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। সমঝোতা মোতাবেক আগামী ৩০ এপ্রিলের আগে যে কোনো দিন তিনি লন্ডনের একটি ফ্লাইট ধরবেন। উল্লেখ্য, বিএনপির যে ৬ জন নেতা বিগত ৩০ ডিসেম্বর ভোট ডাকাতির নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের শপথ গ্রহণের শেষ দিন ৩০ এপ্রিল। খালেদা দেশ থেকে বেরিয়ে যাবেন এবং ঐ ৬ এমপি সংসদে ঢুকবেন। বেগম জিয়ার লন্ডন যাত্রার তারিখ হলো ২৫ বা ২৬ এপ্রিল।
বিএনপি নেতাদের সাথে এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন যে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো সব ভিত্তিহীন এবং খোশগল্প। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগের দিন অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল সোমবার ডেইলি স্টারকে এমন কথাই বলেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন নেতা ডেইলি স্টারের ঐ প্রতিনিধিকে বলেন যে, বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা সম্প্রতি সরকারের একজন উপদেষ্টার সাথে দেখা করেন এবং তাঁর প্যারোলে মুক্তি ও চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা করেন। রিপোর্টে বলা হয় যে, বিএনপি এবং সরকারের সাথে এ বিষয়ে পর্দার অন্তরালে আলোচনা হচ্ছে। সরকার বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে পারেন যদি বিএনপির ঐ ৬ জন নির্বাচিত সদস্য শপথ গ্রহণ করেন।
॥দুই॥
রিপোর্টে বলা হয় যে, ডেইলি স্টারের এই প্রতিনিধি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। গত ১৫ এপ্রিল সোমবার মির্জা ফখরুল বলেন যে, বেগম জিয়া প্যারোলের জন্য আবেদন করবেন কিনা সেটি নির্ভর করে তার ওপর এবং তার পরিবারের ওপর। গত ১৩ এপ্রিল রবিবার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসারত বেগম জিয়ার সাথে বিএনপির ৩ নেতা দেখা করেন। এরা হলেন মির্জা ফখরুল, গয়েশ^র চন্দ্র রায় এবং নজরুল ইসলাম খান। বেগম জিয়ার সাথে দেখা করে বেরিয়ে আসার পর মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদেরকে বলেন যে, তাদের সাথে বেগম জিয়ার প্যারোল নিয়ে কোনো কথা হয়নি। কারণ এটি কোনো দলীয় বিষয় নয়। বিএনপির ৬ জন নির্বাচিত সদস্যের শপথ গ্রহণ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা মনে করি না যে বর্তমান সংসদ একটি নির্বাচিত সংসদ। ঐ নির্বাচনের ফলাফলও আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি।
উপোরক্ত খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরের দিন অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল বুধবার ডেইলি স্টারের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে আরও একটি খবর প্রকাশিত হয়। খবরটির শিরোনাম ছিল,“BNP trashes Khaleda Zia’s parole reports” অর্থাৎ বিএনপি খালেদা জিয়ার প্যারোল রিপোর্টকে ছাইভস্ম বলে উড়িয়ে দেয়। এই খবরটি পরিবেশন করেন ইউএনবি। রিপোর্টে বলা হয় যে, বিভিন্ন সংবাদপত্র বিভিন্ন শিরোনামে বিগত কয়েক দিন হলো বেগম জিয়ার প্যারোল সম্পর্কিত সংবাদ পরিবেশন করছে। আমি পরিষ্কার বলতে চাই যে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বেগম খালেদা জিয়া কোনো রকমের আবেদন করেন নাই।
প্যারোলে যুক্তরাজ্য যাওয়ার ব্যাপারে মির্জা ফখরুল বলেন যে, একটি ইংরেজি সংবাদপত্র তাদের চেয়ারপার্সনের বিদেশ যাত্রার দিন এবং তারিখ পর্যন্ত উল্লেখ করেছে। এটি সঠিক নয়। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পত্রিকাটি মন্তব্যের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। আমি তাদেরকে বলেছি যে, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অসত্য। আমার এই দ্ব্যর্থহীন অস্বীকৃতির পরেও তারা অত্যন্ত ফলাও করে খবরটি ছেপেছে। আমি সকলের কাছে অনুরোধ করবো যে, এই ধরনের হলুদ সাংবাদিকতা পরিহার করুন এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। তিনি আরও বলেন,  তাদের দল সম্পর্কে কোনো খবর পরিবেশন করার আগে তারা যেন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেন।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন যে, সরকারি দলের একটি মহল এখন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সরকারের ইচ্ছা মোতাবেক সমাজ গঠনের চেষ্টা করছে। মিডিয়াকে এমন ভয়াবহভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে যে, অনেক জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী এখন টেলিভিশন টকশোতে অংশ গ্রহণ করতে পারেন না। এখন জনগণের কাছে সঠিক খবর পরিবেশন করা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, যেসব সাংবাদিক সঠিক খবর পরিবেশনের চেষ্টা করেন তারা নির্বাচনের পর চাকরি হারিয়েছেন। সাংবাদিকদের একটি অংশ এখন খুব ভাল অবস্থানে আছেন। কিন্তু তাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখন বেকার। তিনি অভিযোগ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে।
গত বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল দৈনিক ‘ইনকিলাবের’ প্রথম পৃষ্ঠায় যে প্রধান সংবাদটি ছাপা হয়েছে তার শিরোনাম হলো, “শপথ-প্যারোলে না/অবস্থান সুস্পষ্ট করলেন খালেদা জিয়া/কণ্ঠ-মনোবলে ৯০ দশকের দৃঢ়তা”। রিপোর্টে বলা হয়, “বেগম জিয়ার সাথে নেতাদের এক সাক্ষাতে সব কিছু সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। প্যারোল ও এমপিদের শপথ গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের জানিয়েছেন প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যের অবনতি সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তির আবেদন তিনি করবেন না। মুক্তি নিতে হলে আইনি প্রক্রিয়াতেই তিনি মুক্ত হবেন। আর যে দল সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে সেই সংসদে শপথ না নেয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।” এরপর এ সম্পর্কে সমস্ত জল্পনা কল্পনার অবসান হওয়ার কথা। কিন্তু তারপরেও গুজব বিলাসী একটি মহল বলছেন যে আমরা আরও ১২টি দিন, অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেখতে চাই।
॥তিন॥
তো ওরা দেখতে থাকুন। ওরা দেখার আগেই গত শুক্রবার ১৯ এপ্রিল বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সিনিয়র মেম্বার ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ বিষয়টি এত বেশি পরিষ্কার করেছেন যে, এর পর আর পরিষ্কারের কোনো জায়গাই নাই। ঐ দিন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর লিখিত একটি পুস্তকের প্রকাশনা উৎসবে বক্তৃতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, বিএনপি থেকে যে ৬ জন জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের শপথ গ্রহণের কোনো সুযোগ আর নাই। যে কথাটি স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যান্য মেম্বার  খোলাখুলি বলেন নি, ব্যারিস্টার মওদুদ সেটি খোলাখুলি বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, ঐ ৬ জন শপথ গ্রহণ করবেন কিনা সেব্যাপারে প্রথমে তারা স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করেন। যে ৬ জন নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ছিলেন। ঐ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, যে নির্বাচনকেই তারা মানেন না, যে পার্লামেন্টকেই তারা স্বীকার করেন না, সেই পার্লামেন্টের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তারা তাদের এই মতামত লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন  জনাব তারেক রহমানকে জানান। জনাব তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের সাথে সম্পূর্ণ  একমত হন এবং সেটি অনুমোদন করেন। এর ফলে এখন এটি বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত হিসাবে গণ্য হবে। এর পর আর এ বিষয়ে আলোচনার কোনো অবকাশ নাই। কোনো কোনো পত্রিকায় এই মর্মে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে যে, বিএনপির কোনো কোনো নির্বাচিত সদস্যের এলাকাবাসীরা নাকি সংসদে যোগদানের জন্য তাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন। এটি সম্পূর্ণ  বোগাস একটি খবর। আসলে এলাকাবাসীরা সংসদে যোগদান তো দূরের কথা, এখন তারা এই পার্লামেন্টেই আর মোটেই ইন্টারেস্টেড নন। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে গত উপজেলা নির্বাচনে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। কুত্তা, বিলাই ভোট কেন্দ্রের চার ধারে ঘোরাফেরা করেছে। বিএনপির এই দৃঢ় চিত্ততা দেখে আওয়ামী লীগ এখন প্যারোল সম্পর্কে উল্টা গীত গাচ্ছে। এতদিন দেখা গেছে বেগম জিয়াকে প্যারোল দেয়ার জন্য তাদের বড় গরজ। এখন দেখা যাচ্ছে যে, আঙ্গুর ফল টক। প্যারোল নামক বস্তুটিই এখন তাদের কাছে খুব টক হয়ে গেছে।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ