মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এসব অপকর্ম দেখবার কি কেউ নেই?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আমাদের দেশসহ উপমহাদেশের কয়েকটি দেশে মাযারব্যবসা বেশ ধুমধামেই চলে। এ ব্যবসার বিরুদ্ধে কথা বলাও বিপজ্জনক। স্পর্শকাতর। কারণ এ ব্যবসা চালানো হয় ধর্মের আবরণে। এমনকি যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁদেরও সমর্থন ও সহায়তা থাকে এতে। কাজেই এসবের বিরুদ্ধে লেখেটেখে বা বলেকয়ে কোনও কিছু হয় না।
মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন নামে এক ফেবুফ্রেইন্ড একটি দীর্ঘ ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন আমার ইনবক্সে। আমি সেটাই সামান্য এডিট করে আমার পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করবার দুঃসাহস দেখাতে চাই। তিনি অবশ্য এমন আগ্রহই ব্যক্ত করেছেন। তাই তাঁর অভিজ্ঞতা বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরছি।
“কিছুদিন আগে মিরপুর এক নম্বর গিয়েছিলাম বিশেষ কাজে। কাজ শেষ হতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। কাজ শেষ করে যখন মাযারের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, তখন দেখলাম হাজার হাজার মানুষের ভিড়। বুঝতে পারলাম এরা সবাই মাযারদর্শনে এসেছেন। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে কি সারারাত লোকজন থাকে?’ তিনি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন।
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আজকের রাতটা মাযারেই কাটিয়ে দেবো। রুমমেটকে কল করে বলে দিলাম, আজ আর আমি আসছি না। কত নির্ঘুম রাতইতো কাটিয়েছি। আজ না হয় আরেকটি রাত কাটাবো। কিছু অভিজ্ঞতা তো হবে। হালকা খাবার খেয়ে মাযারে ঢুকে পড়লাম। তবে এই বিশ্বাসে নয় যে, মাযার থেকে আমি কিছু পাবো।
আমার মনে পড়ে গেল, তিনটি জায়গা ব্যতীত জিয়ারতের উদ্দেশে সফর করা হারাম। সে তিন জায়গা হলো: বায়তুল্লাহ অর্থাৎ কা’বাঘর, মদিনার মসজিদুন নবী (স) এবং বাইতুল মুকাদ্দাস। কিন্তু কোনও কাজে কোথাও যাবার পথে যদি কোনও ওলি-আউলিয়ার মাযার সামনে পড়ে তবে জিয়ারত করতে কোনও নিষেধ নেই। আমিও তাই করলাম। মাযারের কাছে গিয়ে দু’আ পড়লাম এবং শায়িত ব্যক্তির রূহের মাগফিরাত কামনা করলাম।
শুরু হলো আসল মাযারদর্শন। প্রথমে পুরো এলাকা ঘুরেফিরে দেখলাম। একটু ধাতস্থ হবার জন্য বটমূলের নিচে বসে এককাপ চা পান করলাম। লক্ষ্য করলাম, প্রত্যেকটা জায়গায় আলাদা আলাদা সামিয়ানা টানানো। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওখানে কি হবে ভাই?’
তিনি আমাকে বললেন, ‘একটু পরেই আসর বসবে।’
ভাবলাম যাক বাবা! বিনোদনের মধ্য দিয়েই রাতটা কাটানো যাবে তাহলে। ভাবলাম, এ সুযোগে বাইরে থেকে ঘুরে আসলে খারাপ হবে না।
প্রায় চল্লিশ মিনিটপর মাযারে আবার ঢুকলাম। একি! এ তো আগের মতো নেই। এর ফাঁকে আসর জমে উঠেছে। বিচ্ছিন্ন লোকগুলো যে যার খুশি মতো আসরে জায়গা নিয়ে বসে পড়েছেন। এ রকম আসর প্রায় ৫০টির মতো হবে। আমিও কষ্ট করে একটিতে ঢুকে পড়লাম। ঢুকে তো আমার ভিমড়ি খাবার উপক্রম। আসরের মাঝখানে বেশ কয়েকজন সুন্দরী দেখলাম। সারিবদ্ধ হয়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর এখান থেকে একটি মেয়ে মাইক্রো ফোন হাতে নিয়ে অনেকটা নৃত্যের ভঙ্গিতে কাওয়ালি গাওয়া শুরু করলেন। সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের সমাহার তো আছেই। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম, অবিকল যাত্রার মতো কিছুলোক ঠিক মেয়ের বুকের ওপর টাকা ছিটিয়ে যাচ্ছেন। আর মানুষ বেশ আনন্দে হাততালি দিচ্ছেন। কিছু দর্শকও একটু পরে মাতালনৃত্য শুরু করে দিলেন। বুঝতে পারলাম যাতে দর্শকরা বোরিং ফিল না করেন, সেজন্য এতোসব আয়োজন। আমি খুব বেশিক্ষণ এখানে থাকতে পারলাম না। আমার বিবেক সেখানে থাকতে দিল না। আবার কিছুক্ষণের জন্য বটমূলের নিচে বসে পড়লাম। এরপর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এখানে আর কখনও আসবো না। তবে আজকে কী ঘটে তা অবশ্যই দেখে যাবো। আবার উঠে পড়লাম। একটু একটু করে প্রতিটা মজমা ঘুরে দেখলাম। সব জায়গায় একই চিত্র। নাচ-গান ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয় হলো: পাশেই বিশাল মসজিদ। মনে মনে ভাবলাম আর প্রমাদ গুণলাম! আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবেন মসজিদ কমিটির লোকজন এবং ইমামসাহেব!
এককাপ চা খেয়ে সামনের দিকে এগুলাম। দেখলাম, একদল জটাধারীলোক গোল হয়ে বসে আছেন। দূর থেকে মনে হবে তাঁরা গভীর কোনও ধ্যানে মগ্ন। কাছে গেলেই হয়তো ধ্যানভঙ্গ ঘটতে পারে! তারপরও কাছে গেলাম। কাছে গিয়ে তো আমারই ধ্যান ভঙ্গ হবার অবস্থা। ক্ষণিকের মধ্যে আমার ভুল ভেঙ্গে গেল। কী সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকভাবে একহাত থেকে অন্য হাত বদল করে করে গঞ্জিকাসেবন চলছে। আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এও কি সম্ভব! হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। ‘ইলবাবা!’ এই ‘ইলবাবা’ কী বুঝতে পারলাম না। তবে আমার মনে হলো, গঞ্জিকাসেবনের জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর একটিও নেই। গাঁজাব্যবসায়ীদের বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়। কোথায় গাঁজার আসর বসাতে হবে তা তাঁরা ভালোই বোঝেন।
হঠাৎ করে খুব বেশি অদ্ভূত জিনিস দেখলে মাথা যেমন কাজ করে না, আমারও তাই হলো। মাযার সম্পর্কে অনেক আজগুবি কথা শুনেছি। আজ নিজচোখে দেখে মস্তিষ্কে ধারণ করতে একটু সময় লাগছে বুঝতে পারলাম। আমিও নাছোড় বান্দাহ আজ সব দেখেই ছাড়বো। এ দিকে ক্ষিধেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। কলা আর রুটির ওপর দিয়েই চালিয়ে দিলাম। আবারও ঘুরে ফিরে সেই বটমূল। হ্যাঁ, এই জায়গাটা বসার জন্য বেশ ভালো। চারপাশ ইট দিয়ে বাঁধানো। এখানে বসলে একটা সুবিধাও আছে। চারপাশটা সুন্দর করে দেখা যায়। হঠাৎ উত্তরের দিকে দৃষ্টি পড়লো। বেশ কিছুলোকের জটলা লক্ষ্য করলাম। কিন্তু কোনও গানবাজনার শব্দ আসছে না। কৌতূহলবশত সামনের দিকে এগুলোম। স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলাম। মাঝখানে শ্বেতশুভ্র একজন মানুষ বসে আছেন। তাঁর পা দুটো সামনের দিকে ছড়ানো। আর একদল লোক সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। লক্ষ্য করলাম, একজন একজন করে সামনের দিকে এসে সেই শ্বেতশুভ্র লোকটির হাতে কি যেন গুঁজে দিচ্ছেন। বুঝতে কষ্ট হলো না এটা নজরানা। আর শ্বেতশুভ্র লোকটি নাকি একজন পীর। সবাই তাঁর হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে পায়ের ওপর সিজদায় লুটে পড়ছেন। অনেক মহিলা দেখলাম। তাঁরাও আবেগে গদগদ হয়ে পীরকে জড়িয়ে ধরছেন। নিজচোখে দেখলাম সবচেয়ে বড় শিরক কীভাবে এখানে সংঘটিত হয়। আর আমারও উপলব্ধি হলো: আমার ঈমান কত নি¤œস্তরের। ঘৃণা করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। এই মাযারে আরও ভয়ঙ্কর খারাপ যে দুটো জিনিস আমার চোখে ধরা পড়লো তা প্রকাশ্যে বর্ণনা করা সমীচীন মনে করিনি। আমার মনে হয়েছে এ দুটো জিনিসের আকর্ষণেই মানুষ এখানে জড়ো হয়ে থাকেন। সবচেয়ে মজার বিষয়টা ঘটলো ফজরের আযানের সময়। যখন আযানের আওয়াজ আসতে শুরু করলো, দেখলাম তাড়াহুড়ো করে বাদ্যযন্ত্র সরিয়ে গানবাজনা বন্ধ করে দেয়া হলো। মুহূর্তেই সব ফাঁকা। আমার মনে হলো: আযান হলে শয়তান যেমন পালিয়ে যায়, এখানেও তাই ঘটলো। মসজিদে গিয়ে দেখি মুসল্লিশূন্য প্রায়। জন পঞ্চাশের বেশি হবে না। অথচ মসজিদটা যথেষ্ট বড়। বিষয়টা আমার কাছে অদ্ভূত লাগলো। তবে সারারাত এখানে যারা ছিলেন তাঁরা কি সবাই গঞ্জিকাসেবক এবং ঐ বিশেষ (!) কাজের কাজি?
যাই হোক, “সালাতশেষ করে বাসায় চলে আসলাম। আর বিস্মিত মনে ভাবতে লাগলাম, আমি এসব কী দেখলাম!” উল্লেখ্য, এটা হযরত শাহ আলী (রহ) এর মাযারের বর্ণনা।
সবশেষে সালাহউদ্দিন আরও লেখেন, “আমি যদি একবিন্দুও মিথ্যে বলে থাকি তবে এর ফয়সালা আল্লাহ অবশ্যই করবেন। আর হাতেনাতে নগদ প্রমাণ চাইলে কোনও এক বৃহস্পতিবার রাতে ঘুরে আসতে পারেন।”
বলতে দ্বিধা নেই, মিরপুর মাযারের যে লোমহর্ষক বর্ণনা জনাব সালাহউদ্দিন আমার ইনবক্সে পাঠানো ম্যাসেজে দিয়েছেন তা প্রায় এ উপমহাদেশের সব মাযার-খানকাতেই অব্যাহতভাবে চলে। কোনও কোনও মাযারের দানবাক্স নাকি কোটি কোটি টাকাতে ভরে যায়। এ বিপুল টাকা গুণে নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ মাসে মাসে ব্যাংকে জমার দিন নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয় বলে প্রকাশ। এই যদি হয় প্রকৃত ঘটনা, তাহলে মাযারব্যবসা বন্ধ করবেন এমন আহাম্মক কোথাও কেউ আছেন নাকি?
তবে উল্লেখিত ব্যক্তি মাযারকেন্দ্রিক অনাচার এবং শরিয়াপরিপন্থি কার্যকলাপের যে বিবরণ দিয়েছেন তা প্রায় এদেশের সব মাযার, দরগাহ বা খানকাতেই চলে বলে এন্তার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এগুলো দেখভাল যারা করেন এবং প্রশাসনে যারা আছেন তাঁরা চোখ বুজে থাকেন কেন? তবে কি ধরে নিতে হবে যে, ‘দাল মে কুচ কালা হ্যায়!’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ