সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রশাসনের গাফিলতি খতিয়ে দেখতে সোনাগাজীতে পুলিশ সদরের তদন্ত দল

 

ফেনী সংবাদদাতা : মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে ফেনীর সোনাগাজীতে এসেছে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল। বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তদন্ত দলের প্রধান ডিআইজি এসএম শেখ রুহুল আমীনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় যান। পুলিশ সদর দফতরের পাঁচ সদস্যের তদন্ত দল মাদরাসার অভ্যন্তরে সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে যান এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ৬ এপ্রিল এখানে নুসরাতকে পরীক্ষার হল থেকে ঢেকে নিয়ে গায়ে কেরাসিন ঢেলে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

পুলিশের এই তদন্ত কমিটির সদস্যরা রাফি যে কক্ষে আলিম পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন সেই কক্ষটিও ঘুরে দেখেন। পরে তারা উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামে রাফির বাড়িতেও যান। সেখানে অবস্থান কালে তারা আশপাশ ঘুরে দেখেন। পরে তারা কবর জিয়ারত করেন এবং নুসরাতের বাবা এ কে এম মুছা, তার দুই ভাই ও মা’র সঙ্গে একান্তে কিছু সময় নিয়ে কথা বলেন।

তদন্ত দলের প্রধান ডিআইজি রুহুল আমীন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত দল ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ প্রশাসনের কোনও ধরনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখছে। বৃহস্পতিবারও তদন্ত দল সোনাগাজীতে অবস্থান করবে। তদন্ত শেষে এ নিয়ে বিস্তারিত গণামাধ্যকে জানানো হবে।’

এসময় তার সঙ্গে তদন্ত দলের সদস্য একজন  পুলিশ সুপার, দুই জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাও  ছিলেন।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিন পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশানের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) প্রাথমিক তদন্তের অগ্রগতি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটিও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ প্রশাসনের কোনও ধরনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখবে। তদন্ত শেষে এই কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করবেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তদন্ত দল বৃহস্পতিবারও তদন্ত কাজ  চালাবেন।

বলৎকারের কথা স্বীকার করলেন শিক্ষক

ফেনীতে মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রকে বলৎকারের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে ওই মাদরাসার শিক্ষক মো. হারুন (৩০)। বুধবার দুপুরে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেনের আদালতে জবানবন্দী প্রদান করে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের রহিমপুর আরবিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা এতিমখানার নূরানী বিভাগের শিক্ষক মো. হারুন তৃতীয় শ্রেণির ১০ বছর বয়সী এক ছাত্রকে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মাদরাসার ভিতরে ঘুম থেকে উঠায়। পরে ওই শিশুকে বলৎকার করে এবং কাউকে না বলার জন্য ভয় দেখায়। ওই শিশুটি বিকাল ৫টার দিকে বাড়ি গিয়ে কাঁদতে থাকে। তার বাবা জিজ্ঞেস করলে সে মাদরাসায় লেখাপড়া করবে না ও শিক্ষকের বিষয়টি জানায়। পরে ওই শিশুর পিতা মো. শাহ আলম বাদী হয়ে শিক্ষক মো. হারুনকে আসামী করে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই দিন রাতে মামলা তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবু তাহের মাদরাসা থেকে মধ্যম ছনুয়া ইউনিয়নের মোল্লা বাড়ির মো. মোস্তফার ছেলে হারুনকে গ্রেফতার করে। গতকাল বুধবার দুপুরে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেনের আদালতে হারুনকে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আবু তাহের। হারুন ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী প্রদান করে।

ফেনী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. সাজেদুল ইসলাম জানান, হারুন ঘটনায় জড়িত থাকার স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে জেল-হাজতে প্রেরণ করা হয়।

ছাত্রীদেরকে বখাটেদের ‘সিগারেটের আগুন’ নিক্ষেপ

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে বর্বরোচিত হত্যার ঘটনায় ফেনী সহ সারাদেশ যখন উত্তাল তখন ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় মাদরাসা ছাত্রীদের ‘জ্বলন্ত সিগারেট’ নিক্ষেপ করেছে রাসেল নামের এক বখাটে। এলাকাবাসীর গণধোলাইকালে পুলিশ হাজির হয়ে ওই বখাটেকে থানায় নিয়ে রাতে ছেড়ে দেয়। এনিয়ে অভিভাবক ও সচেতন মহলে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

এলাকাবাসী, মাদরাসার শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানান, সোমবার বিকালে ছুটি শেষে খন্ডল ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার কয়েকজন ছাত্রী বাড়ি যাচ্ছিল। পথিমধ্যে স্থানীয় চিহ্নিত বখাটে তাদের লক্ষ্য করে জ্বলন্ত সিগারেট ছুঁড়ে। এসময় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর বোরকা ও পায়ের উপর পড়ে। অন্য সহপাঠিরা শোর চিৎকার করলে পালিয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে অভিভাবক ও এলাকার লোকজন জড়ো হয়। বিকালে তৎসংলগ্ন সাহেবের বাজারে তাকে আটক করে গণধোলাই দেয় স্থানীয়রা। একপর্যায়ে সন্ধ্যায় থানার এসআই মোতাহের হোসেনের কাছে সোপর্দ করা হয়। রাতেই স্থানীয় একটি মহল দেনদরবার করে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়। রাসেল চারিগ্রাম এলাকার বাসিন্দা লিটনের ছেলে।

বুধবার সরেজমিনে জানা গেছে, এর আগে ২০১৮ সালে মাদরাসার জানালা দিয়ে ওই বখাটে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতো। ওই ঘটনায়ও তাকে আটক করে মারধর করা হয়। তখনও স্থানীয় একটি মহল তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে এলাকায় স্কুল-মাদরাসা পড়–য়া ছাত্রীদের উত্ত্যক্তের অভিযোগ অহরহ।

স্থানীয় বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু তাহের ভূঞা জানান, ঘটনার পরপরই আমি বাড়ি থেকে ছুটে এসেছি। এলাকার লোকজন তাকে আটকের পর পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কিভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে তা জানা নেই। তার তিন নাতনি এ মাদরাসায় পড়াশোনা করছেন। নিরাপত্তা দিতে অপারগ হলে তাদের ছাড়পত্র দিতে মঙ্গলবার মাদরাসার সুপার ও শিক্ষকদের জানিয়েছি।

মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এনামুল করিম মজুমদার বাদল জানান, ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে সমাধান হয়েছে বলে শুনেছি। এর বেশি কিছু তিনি জানেন না বলে জানান।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল করিম পাটোয়ারি জানান, বিষয়টি তেমন কিছু নয়। এটি আমরা বসে মিমাংসা করে দিয়েছি।

থানার এসআই মোতাহের হোসেন জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে তাকে থানায় নিয়ে আসি। এ ঘটনায় মামলা হয়নি। কোন ছাত্রীর পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি।

পরশুরাম মডেল থানার ওসি মো: শওকত হোসেন জানান, এ ধরনের কোন ঘটনা তার জানা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ