শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আগুনে জ্বলেছে দোকান  পুড়েছে স্বপ্ন সহায়-সম্বল

 

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মালিবাগ কাঁচাবাজারে আগুন লেগে বেশ কিছু দোকান পুড়ে গেছে।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মাহফুজ রিবেন  জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ওই বাজারে আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নি নির্বাপক বাহিনীর ১২টি ইউনিট এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।  তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকা-ের কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি রিবেন।

স্থানীয়রা জানায় , গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মালিবাগ কাঁচাবাজারের পশ্চিম পাশের একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। শুরুতে স্থানীয়রা আগুন নেভাতে শুরু করে। প্রায় আধাঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ নিতে কাজ শুরু করে। তবে এর আগেই গোটা বাজারটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

মালিবাগ সুপার মার্কেটের পাশে ওই কাঁচাবাজারে সব মিলিয়ে ৫০টির মত দোকান রয়েছে। আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক ভবন ও হোটেল।

আগুনে জ্বলেছে দোকান, পুড়েছে স্বপ্ন-সহায়-সম্বল : খানিকক্ষণ আগেই চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখেছেন দোকানের ক্যাশ বাক্সে রাখা নগদ চার লাখ টাকা। বড় মেয়ের বিয়ের জন্য বানানো ৯ ভরি সোনার অলংকার ছিল দোকানে। আগুনে পুড়ে ছাই সেই অলংকারও। দোকানের ৪২৫ বস্তা চাল, এমনকি ৯-১০ লাখ টাকার যে বাকির খাতা- কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি সেই আগুন। দিশেহারা হুমায়ুন কবিরের কণ্ঠে তাই কেবলই বিলাপ- ‘আমি এখন কই যামু, কী খামু!’ সকাল ১১টার দিকে মালিবাগ কাঁচাবাজারে নিজের পুড়ে যাওয়া দোকান ‘টাঙ্গাইল রাইসে’র সামনে বসে এভাবেই বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন আর বিলাপ করছিলেন হুমায়ুন কবির। এদিন ভোরে এক ঘণ্টার আগুনে পুড়ে গেছে এই বাজারের প্রায় আড়াইশ দোকানের সবগুলোই।

কিছুটা ধাতস্থ হলে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। হুমায়ুন কাঁদতে কাঁদতে জানালেন, গতকালই  হালখাতা ছিল দোকানে। অনেক ক্রেতাই আগেই টাকা পরিশোধ করেছিলেন। মেসে নিয়ে গেলে ছিনতাই হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় সেই টাকা রেখে গিয়েছিলেন দোকানের ক্যাশ বাক্সে। এই সতর্কতায় হিতে বিপরীত হলো হুমায়ুনের। নগদ টাকাগুলো এখন কেবলই ছাই।

হুমায়ুনের কণ্ঠে সব হারানোর বেদনা, ‘১০ বছরে একা লড়াই করে তিলে তিলে যে সম্পদ করছিলাম, সব পুড়ে গেছে ঘণ্টাখানেকের আগুনে।’

বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে মালিবাগ কাঁচাবাজারের পাশেই মেসে ঘুমাতে যান হুমায়ূন। ভোরে বাজারে আগুন লাগার খবরে দোকানে ছুটে আসেন। দেখেন, দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সেই আগুন নিভেছে, তার সঙ্গে নিভে গেছে হুমায়নের সব স্বপ্নও। তিনি জানান, ঢাকায় একবেলা খাওয়ার টাকাও নেই তার কাছে। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার জন্য নিজের জীবন ছাড়া এখন সহায়-সম্বল বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তার।

হুমায়ুন বলেন, ‘টেকাগুলান মেসে নিয়া গেলে আবার দোকান খুলতে পারতাম। আমি কী করলাম রে ভাই! আমি পথের ফকির হয়্যা গেছি। আমি এখন পরিবাররে কেমনে দেখুম? কেমনে সংসার চালামু? আমার ছোড মাইয়্যাডারে কেমনে বিয়া দিমু? কার কাছে বিচার দিমু?’

হুমায়নের পাশে বসে তখন কাঁদছিলেন আবুল বাশার সুমন। সকালের আগুনে পুড়ে গেছে চাঁদপুরের এই দোকানির মুদি দোকান। প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল ছিল দোকানটিতে। সেই সঙ্গে পুড়েছে নগদ একলাখ টাকা। সাত লাখ টাকার বাকির একটি খাতা ছিল, পোড়া ছাইয়ের স্তুপে সেটিও খুঁজে পাননি তিনি।

দোকান আর মালপত্র পোড়ার বেদনা তো আছেই, আবুল বাশার সুমনের গলা ছেড়ে কান্নার আরও একটি বড় কারণ তার মা। ষাটোর্ধ্ব মায়ের জটিল রোগগুলোর ব্যয়বহুল চিকিৎসা যে চলছিল এই দোকানের আয় থেকেই। এখন সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এই দোকানি কিভাবে মায়ের চিকিৎসা খরচ চালাবেন, কীভাবেই বা চালিয়ে নেবেন সংসারের খরচ- সেই চিন্তায় রীতিমতো দিশেহারা তিনি।

সুমন বলেন, ‘ঢাকায় আর থাকা হবে না। গ্রামে চলে যাইতে হবে। আমার সব গেছে, নিঃস্ব হয়ে গেছি আমি। সরকার যদি সাহায্য করে, তাইলে হয়তো ব্যবসা শুরু করা যাবে। নাইলে গ্রামে গিয়া না খেয়ে মরার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়াই আর কিছুই করার নাই আমার। যে মা আমারে লালন পালন করে বড় করছে, তার জন্য শেষ বয়সে কিছু করতে পারব না, এই দুঃখ নিয়া মরতে হবে।’

হুমায়ুন কবীর কিংবা আবুল বাশার সুমনের মতো এমন আরও প্রায় ২৬০ জন দোকানির ভাগ্য পুড়েছে মালিবাগের আগুনে। বাজারের ২৬০টি দোকানের মাছ, মাংস, চাল, ডালসহ সব পুড়ে গেছে। এদের বেশিরভাগেরই একমাত্র সম্বল ছিল দোকানগুলো।

গোলাম মাওলা নামের একজন জানালেন, ৩৯টি খাসি বিক্রির জন্য গত রাতেই মালিবাগের বাজারে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সবগুলোই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। সেই সঙ্গে পুড়ে গেছে তার মাংস বিক্রির দোকানটিও।

মাদরাসায় অগ্নিকা- : যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে একটি মাদরাসায় অগ্নিকান্ড ঘটেছে। বুধবার মধ্যরাতে মাদরাসাটিতে আগুন লাগার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে নেভানোর কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস।

বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা ফরহাদ আলম বলেন, “কুতুবখালীতে ওই মাদরাসায় আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে আমাদের সাতটি ইউনিট।”আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রার বিষয়েও কিছু জানা যায়নি।

গতকাল সকালে ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা ফরহাদ আলম জানান, তাদের নয়টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে ভোর পৌনে ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। আগুন লাগার কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

‘ভেতরে চিৎকার শুনি, পরে তালা ভেঙে ২ ছাত্রকে বের করি’ : ‘আমরা ফায়ারকর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টার পাশাপাশি ভবনের ওপরের দিকে উঠে গিয়ে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করি। ভবনের পাঁচতলায় গিয়ে দেখি- একটি কক্ষে এর বাইরের দিক থেকে তালাবদ্ধ। কিন্তু ভেতর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তখন ওই তালা ভেঙে ভেতরে আটকে থাকা দুই ছাত্রকে উদ্ধার করে বেরিয়ে আসি।’ বুধবার (১৭ এপ্রিল) দিনগত রাতে  যাত্রাবাড়ীর কাজলার কুতুবখালী এলাকার একটি মাদরাসায় অগ্নিকান্ডের সময় দমকলকর্মীদের উদ্ধার তৎপরতার কথা এভাবেই বলছিলেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পোস্তগোলা স্টেশনের লিডার মোহাম্মদ সেলিম রেজা।

রাত ১২টা ৫ মিনিটে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় ভোরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ওই ভবনটিকে ‘অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস।

গতকাল মোহাম্মদ সেলিম রেজা জানান, সকালে আমরা ওই ভবনটি ‘অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করে একটি ব্যানার টানিয়ে দিয়েছি। এর কারণ হচ্ছে ওই ভবনের ৫, ৬ ও ৭ তলায় পরিচালিত মাদরাসার নিচতলায় টিভির মেরামতের মালামালের গোডাউনসহ আরও কয়েকটি গোডাউন আছে। পুরো ভবনটি ‘অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ ছিল এবং অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। আবারও যেকোনো সময় অগ্নিকান্ড ঘটে যেতে পারে।

আগুন নেভানোর তৎপরতা নিয়ে তিনি বলেন, ভবনটির নিচতলায় যখন আগুন লাগে আমাদের ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু করে। সে সময় আমাদের কাছে সংবাদ আসে, ওপরে প্রায় ৫০ জন আটকে পড়েছে। একদিক দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলে, অন্যদিকে আমরা ফায়ারের সদস্যরা ওপরের দিকে উঠে গিয়ে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করি। ভবনের পাঁচ তলায় গিয়ে দেখি- একটি কক্ষে এর বাইরের দিক থেকে তালাবদ্ধ। কিন্তু ভেতর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তখন ওই তালা ভেঙে ভেতরে আটকে থাকা দুই ছাত্রকে উদ্ধার করে বেরিয়ে আসি।

কিছুক্ষণ দেরি হলেই অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো উল্লেখ করে সেলিম রেজা বলেন, হয়তো আগুন লাগার সময় ভুলবশত কেউ দরজা তালা দিয়ে দ্রুত চলে গেছে। তারা হয়তো বুঝতে পারেনি যে ভেতর দু’জন ছাত্র রয়ে গেছে।ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্তসাপেক্ষে জানা যাবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে ওই ভবনের নিচতলায় টিভি মেরামতের গোডাউন থেকে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।

পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলীতে ‘মাদক কারবারি’ আহত : গেন্ডারিয়ায় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলীতে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, আহত মো. জাকারিয়া হক সুমন ওরফে সমু (৪০) মাদক কেনাবেচায় জড়িত।

 গেন্ডারিয়া থানা ওসি এম এ জলিল বলেন, বুধবার  রাত সাড়ে ৩টার দিকে ধুপখোলা মাঠে পুলিশের সঙ্গে মাদক কারবারিদের গোলাগুলি হয়।“ধুপখোলা মাঠে মাদক কারবারিদের মাদক বেচাকেনার জন্য জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে তাদের লক্ষ্য ককটেল নিক্ষেপ করে মাদক কারবারিরা। এসময় পুলিশ আত্মরক্ষায় শটগান দিয়ে ১০ রাউন্ড গুলি করে।“পুলিশের প্রতিরোধের মুখে অন্য মাদক কারবারিরা পালাতে পারলেও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জাকারিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।”

মাদক কারবারিদের ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে এসআই মো. রুহুল আমীন, এএসআই মো. মিজানুর রহমান ও এএসআই আব্দুল্লাহ আল মামুন আহত হয়েছেন বলে জানান ওসি জলিল। তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে ১০১৭ পুরিয়া হেরোইন, ১১টি অবিস্ফোরিত ককটেল, একট চাপাতি, একটি চাকু ও বিস্ফোরিত ককটেলের অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাম হাঁটুতে গুলীবিদ্ধ জাকারিয়াকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল এবং আহত পুলিশ সদস্যদের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ওসি জলিল বলেন, জাকারিয়ার বিরুদ্ধে গেন্ডারিয়া থানায় দুটি ও যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ