বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা হয় কাদেরের রুমেই

স্টাফ রিপোর্টার : ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী হাফেজ আবদুল কাদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিেেয়ছেন। তাঁকে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৩০ মিনিটে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে হাজির করা হয়। আবদুল কাদের সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক। বুধবার রাতে তাঁকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।

এর আগে যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, সে অনুযায়ী আবদুল কাদের মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার পক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সাক্ষাৎ করা এবং হত্যাকান্ডের দুদিন আগে, অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকালে এবং রাতে পৃথক পৃথক সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১২ জনের উপস্থিতিতে নুসরাত হত্যার রূপরেখা নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পরামর্শে হত্যাকান্ডে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারিত হয়।

সোনাগাজীতে এখনো মানববন্ধন চলছে। আজ শুক্রবার বিকেলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সংগঠনটি সোনাগাজীতে নুসরাত হত্যার বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করবে।

পরিকল্পনা ও হত্যায় অংশ নেন হাফেজ কাদের : নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ফাজিলের শিক্ষার্থী হাফেজ আবদুল কাদের হেফজ বিভাগের প্রধান। তিনি এ মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলার অন্যতম সহযোগী। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়। 

রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল এসপি মো. ইকবাল গণমাধ্যমকে হাফেজ আবদুল কাদেরের স্বীকারোক্তির তথ্য নিশ্চিত করে জানান, হাফেজ আবদুল কাদের আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি হত্যাকারীদের নিরাপত্তায় মাদরাসার গেট পাহারায় ছিলেন এবং পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম। নিজের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। তার রুমেই হয়েছে পরিককল্পনা।

সহপাঠী শামীম ৫ দিনের রিমান্ডে : নুসরাতের সহপাঠী মোহাম্মদ শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলাম জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমেদ শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। তিনি বলেন, আসামি নূর উদ্দিন ও আবদুর রহিম শরিফের স্বীকারোক্তিতে নুসরাতের সহপাঠী মোহাম্মদ শামীমের নাম এসেছে। “তাকে রিমান্ডে নিলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।” শামীম সোনাগাজী উপজেলার তুলাতলী গ্রামের শফি উল্লাহর ছেলে।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক গোলাম জিলানী জানান, এ মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ১২ জন রিমান্ডে রয়েছেন। এ পর্যন্ত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুর রহিম শরিফ।

এদিকে এ হত্যার ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফেনীতে মানববন্ধন করেছে একাধিক সংগঠন। গতকাল সকালে শহরের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে এনসিটিএফ নামে একটি সংগঠন ও ফেনী ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।

আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন শহরের শান্তি কোম্পানি সড়ক এলাকায়। মহিপাল সরকারি করেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মহিপাল এলাকায়। এ সময় ওইসব সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। তারা নুসরাত হত্যায় জড়িত সবার বিচার দাবি করেছেন।

গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত আলিমের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে গেলে মাদরাসায় একদল তরুণ-তরুণী তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান।

মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে দায়ের করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় তাকে হত্যার জন্য আগুন দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

২৭ মার্চ ব্যবস্থা নিলে এ ঘটনা এড়ানো যেত---তদন্ত কমিটির প্রধান : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামীয়া ফাজিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল কি-না তা খতিয়ে দেখতে দু’দিন ধরে ফেনীতে তদন্ত করছে পুলিশ সদর দফতরের পাঁচ সদস্যের একটি দল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তদন্ত কমিটির প্রধান ডিআইজি (মিডিয়া) শেখ মো. রুহুল আমীন সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও মাদ্রাসা কমিটি যদি ২৭ মার্চের ঘটনার পর যথাযথ ব্যবস্থা নিতো, তাহলে ৬ এপ্রিলের নির্মম ঘটনাটি হয়তো এড়ানো যেত।

ডিআইজি শেখ মো. রুহুল আমীন বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন সবার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, তার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা সোনাগাজীর বিভিন্ন মহল, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং নুসরাতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। 

ফেনীর এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকারের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে শেখ মো. রুহুল আমীন বলেন, আমরা সোনাগাজীতে তদন্ত করেছি, ফেনীতেও করবো। তদন্তের পরেই সব বলতে পারবো। এখনো স্পষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে আমরা ফেনীতে আরও কিছুদিন থাকবো। এসময় এখানকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মেয়েটির পরিবার ও স্বজনসহ সবার সঙ্গে কথা বলবো। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করা হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ড তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার তিনদিন পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। 

গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। এ ঘটনার জেরে গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। পরে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে মারা যায় নুসরাত। এ ঘটনায় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি ও ফেনীর এসপির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ এপ্রিল ওসি মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে পুলিশ সদর দফতর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ