শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

অশান্ত শান্ত

অয়েজুল হক : আবার আকাশে কালো মেঘ জমা হয়েছে। গতকাল এমন ছিলনা। বেশ চমৎকার রোদ্রজ্জ¦ল দিন। গরমে বার বার গা থেকে দুহাতে ঘাম ঝাড়তে ঝাড়তে মনে হচ্ছিল পা দুটোকেও যদি এ কাজে ব্যবহার করা যেত মন্দ হতো না। গতকালই ভাল ছিল এমন মনে হয় শান্তর। মনে হবার যথেষ্ট কারণও আছে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে বহু প্রোগ্রাম করা। সকাল বেলা উঠেই প্রথমে পান্তা ইলিশ দিয়ে ভাত খাবে। আয়োজনটা বাড়িতে নয়। ইলিশ মাছের যে দাম, বাবাকে বললেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। এমনিতেই অভাবের সংসার। কথায় আছে মড়ার উপর খড়ার ঘা।বাবা যদিও বহুদিন বেত্রাঘাত করেন না তারপরও পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ আনতে বললে বহুদিন পর সে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যাবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। কি দরকার শুধু শুধু ঝামেলা করার। বাবা বাবার মতোই থাক। গত ছ’মাসে বিভিন্ন কৌশলে বাবার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কাজটা বাকি রাখেনি শান্ত। প্রাইভেট, কোচিং বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিয়েছে। সর্বশেষ গিয়েছিল ছোট বোনের বাড়ি। বিয়ের পর খুব একটা যায়নি। শত অনুরোধ করেও যে ভাইকে আনতে পারেনি সে কিনা বিনা নোটিশে হাজির। দেখেই চোখ বড় বড় করে হাস্যজ্জ¦ল মুখে বলে, ভাইয়া তুমি?  

-হ্যাঁ।

-তোমাকে তো খবর দিলেও আসোনা। খুব অবাক হলাম।

-এমনি তো আসিনি।

-জানি।

-আমার কিছু টাকা লাগবে।

-কতো টাকা?

-হাজার পাচেঁক হলেই হবে।

-এতো টাকা দিয়ে তুমি কি করবে, ছাত্র মানুষ! 

শান্তর দুই বছরের ছোট বোন মিলার চোখে কিছুটা বিস্ময়। দেশের অবস্থা ভাল না। যুব সমাজ নানা ধরনের অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। ধনী-গরিব ভেদাভেদ নেই। একে একে বড় হচ্ছে অসভ্য, নোংরা মানুষের মিছিল। 

-কিরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছিস যে? না দিলে বলে দে চলে যাই। কথা বলে শান্ত।

-ভাইয়া তুমি এরকম হয়ে গেছ কেন?

-কি রকম! 

-খচ্চর টাইপের?

-হ্যাঁ।

-তাহলে চিড়িয়াখানায় ফোন দে।

-কেন?

-নতুন একটা খচ্চর পেয়ে তারা খুশি হবে। মানুষ খচ্চর দেখেছে কেউ! সবাই দেখবে আর অবাক হবে।

মিলা খিল খিল করে হেসে ওঠে। ছোট বেলা থেকেই এ বোনটার হাসি শান্তর ভাল লাগে। পিঠাপিঠি ভাই-বোন, অনেকটা বন্ধুর মতো বড় হয়েছে। মাঝখানে মিলার বিয়ে হয়ে গেল। চেহারা ভাল হওয়ার সুবাদে ডাক্তার ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে মিলার। পরিবারটাও ভাল, সমাজ যাকে বলে অভিজাত পরিবার।  

-হাসছিস কেন? টাকা দে, চলে যাই।

-চলে যাবে?

-হ্যাঁ।

-এতদিন পর এসে একদিনও থাকবে না, এতটা পর হয়ে গেলে ভাইয়া?

-আমার জরুরী কাজ আছে মিলা।

মিলা ভেতরে চলে যায়। মিনিট পাঁচেক পর এক হাজার টাকার পাঁচটা কড়কড়ে নোট গুনে দেয়। টাকা হাতে নিয়ে শান্ত উঠে দাঁড়ায়।

-যাই। পরে আবার আসবো।

-কি জন্য, টাকা নিতে?

-হ্যাঁ।

-আচ্ছা, তবে আমাকে একটু আগে ভাগে জানিয়ে রেখ, সবসময় তো আর কাছে টাকা থাকেনা।

-আগে ভাগে জানানো হয়তো সম্ভব হবেনা। যা পারিস তাই দিস।

- আচ্ছা।

শান্ত চলে আসে। মিলা হয়তো বেশ কিছুক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিছু ভাববে। কিছু কষ্ট তাকে ছুঁয়ে যাবে। মেয়েরা সব ছেড়ে স্বামীর সংসারে আসে। অতি আপন মানুষগুলো ছেড়ে স্বামীকে নিয়ে স্বপ্ন সাজায়। শত স্বপ্নের ভীড়েও হারিয়ে যায় না এক সাথে বেড়ে ওঠা আপনগুলো। মাঝেমাঝে মনের ভেতর কামড় দেয়। খুঁজে ফেরে আপন মুখ । খুঁজে বেড়াক, যার যা ইচ্ছা তা খুঁজুক। শান্তর ভাবতে ভাল লাগেনা। ওর মাথায় আপাতত একটাই চিন্তা তাপসী। বৈশাখী অনুষ্ঠানটা জমজমাট হোক।

তাপসীকে চেনা মাস ছয়েক আগে। প্রথম পরিচয় পর্বটা মোটেও সুখকর ছিল না। শীতের দুপুরে মিষ্টি রোদ মাড়িয়ে বড় রাস্তা ধরে আপন মনে হেঁটে যাওয়া যুবক। মাথা ভরা চিন্তা, বুদ্ধি। বেশি চিন্তা বুদ্ধিটাও শান্তর জন্য আরেক দুশ্চিন্তার কারণ। কলেজ লাইফে অতিবুদ্ধির কারণে স্যারদের বহু বেত্রাঘাত হজম করতে হয়েছে। বেত্রাঘাতে শান্তর একার কষ্ট এমনও নয়, যিনি বেত্রাঘাত করেন তাকেও পরিশ্রম করতে হয়। বেত নিয়ে ছুটতে, মারতে, রাগতে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি ব্যয় হয়। শান্তকে মারতে মারতে একবার ইংরাজী স্যার হাঁপিয়ে ওঠেন। হাস ফাঁস করে দম নেন। তড়িঘড়ি নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে লাল চোখে শান্তকে দেখেন। মানুষটা পরিশ্রান্ত, যথেষ্ট ক্লান্ত। তার চোখ মুখ সে কথা বলে দেয়। শান্ত হাসি আটকাতে পারে না। স্যার মানুষটা আবার ধেয়ে আসেন, এই বেয়াদব হাসছিস কেন?

-স্যার আপনি ক্লান্ত, রেষ্ট নেওয়া দরকার।

-চুপ কর একটা কথাও বলবি না।

-জ্বি স্যার। একটা কথাও বলবো না। শান্ত চুপ করে গেলেও স্যার মানুষটা চুপ করেন না। নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে দম টেনে টেনে বলেন, এমন বদমাশ আমার জীবনে দেখিনি। স্যারকে কুক দেয়, ইট মারে।

শান্তর চোখে ভেসে ওঠে একটা সুন্দর প্রভাত। শুক্রবার। সকাল ১০ টার মতো বাজে। পড়ার নাম করে বন্ধু লিটনদের বাড়িতে রাত কাটানো বেশ আগের অভ্যাস। দুজনের পিতার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকাতে বিষয়টা সহজ হয় শান্তর জন্য। মাঝে মাঝেই এক সাথে থাকে দু’বন্ধু। একসাথে খায়, ঘুমায়। পড়াটা পড়ার যায়গাতেই থাকে। সেদিন রাতে শতাধিক ভাঙ্গা ইটের আধলা নিয়ে ছাদে যায়। লিটন রিতাকে ভালোবাসে। রিতা মেয়েটা ওকে পাত্তাই দেয় না। একটা উপযুক্ত প্রতিশোধ নেয়া দরকার। প্রতিশোধের চিন্তা থেকেই ইটের আধলা নিয়ে ছাদে যাওয়া। তিন চারটে বাড়ির পরই রিতাদের টিনের ঘর। শেষ রাত পর্যন্ত চলে ভৌতিক আক্রমণ। একের পর এক গুড়ুম গুড়ুম করে ইটের আধলা পড়তে থাকে রিতাদের টিনের চালে। সিনেমার নয়করা নায়িকাকে পাবার জন্য কত্তো কিছু করে, আর এ তো সামান্য ইটের আধলা ফেলা। প্রথম শব্দেই হয়তো ঘুমন্ত সবগুলো মানুষের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তারপর এক ঝাঁক ভয় সবার বুকে দানা বেধে ভীত সন্ত্রস্ত করেছে সবাইকে। রিতারা কষ্ট পাক। ভালোবাসার এ যুগে কেন ভালোবাসবে না মেয়েটা! গরম কাল বলে চারতলার ছাদের উপরই ঘুমানোর সিদ্ধান্ত হয়। সকালের সূর্য থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মি একটু ঝাঁজালো হয়ে যখন ওদের চোখে পড়ে তখন ঘুম ভাঙ্গে। চোখ কচলাতে কচলাতে ছাদের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রথম দেখা যায় ওদের ইংরেজী স্যার বাজারের ব্যাগ হতে করে যাচ্ছেন। হেলে দুলে হাঁটছেন। কয়েকটা ইটের আধলা তখনও অবশিষ্ট, এগুলোকে কাজে লাগানো দরকার। 

-স্যারের সামনে একটা ইটের আধলা ফেললে কেমন হয়? প্রশ্ন করে শান্ত।

-ওহ্, গুড আইডিয়া। আমরা নতুন নতুন কিছু করছি।

চারতলার ছাদ থেকে একটা ইটের আধলা স্যারের একটু সামনে নিক্ষেপ করে। আধলাটা আবার স্যারের মাথায় না পড়ে সেটা দেখার জন্য সামান্য অপেক্ষা। মাথায় না পড়ে সামান্য সামনেই পড়ে। স্যার মানুষটা লাফিয়ে ওঠেন। সাথে সাথে উপরের দিকে তাকান। শান্ত মুখ লুকাবার আগে ছোটবেলা পালাপালি খেলার সেই কুক শব্দটা বেশ জোরের সাথে বলে। কুক কুক। হাসতে হাসতে দুজন লুটিয়ে পড়ে ছাদের উপর। 

ধক করে একটা কিছুর সাথে ঘা লাগে শান্তর। একটা মেয়ে ছিটকে পড়ে। দেখতে যতটুকু সময়, মুহূর্তেই মেয়েটা উঠে এসে চটাস করে একটা থাপ্পড় লাগায় শান্তর গালে। চমকে ওঠে শান্ত। কিরে! একটা মেয়ে মানুষ ওকে থাপ্পড় মারে! কি অদ্ভূদ ব্যপার? শান্তও প্রতি উত্তর দিতে দেরি করেনা। কষে একটা থাপ্পড়। শান্তর থাপ্পড়টা হজম করতে পারেনা মেয়েটা। হুড়মুড় করে আবার পড়ে যায় রাস্তায়। দুপুরের ফাঁকা রাস্তা। এদিকে ওদিক তেমন কোন মানুষজন নেই। এবার আর মেয়েটা উঠছে না। ভয় করে শান্তর। পালালে পালাতে পারে, বিবেক বাধা দেয়। অনেকদিন পর উপলব্ধি করে তারও বিবেক নামের একটা জিনিস আছে। কোথায়? কে জানে। মেয়েটাকে টেনে টুনে গাছের ছায়ায় নিয়ে যায় শান্ত। কিছুক্ষণ বাদেই হুশ ফেরে মেয়েটার। 

-আপনি?

-হ্যাঁ।

-আপনার এতোবড় সাহস আমার গালে থাপ্পড় দিলেন?

-এটা সাহসের কিছু না।

-চোখ কি বাড়িতে রেখে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন?

-না। চোখ সাথেই ছিল, আপনারটা কোথায় ছিল!

-আমি চিন্তামগ্ন ছিলাম, খেয়াল করিনি।

-আমি ও তাই। আমার অনেক বুদ্ধি। বুদ্ধির সাথে খেলা করছিলাম।

-ব্যাস, শোধবাদ।

সেই থেকে তাপসীর সাথে পরিচয়। তারপর সেই তাপসী মেয়েটাই হয়েছে ওর জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ। কাঙ্খিত মানুষ। 

মেঘ জমেছে তাতে কি! বৈশাখ ব্যর্থ হবে? এতো দিনের প্লান প্রোগাম। তাপসীকে ফোন করে। 

-হ্যালো তাপসী।

ওপাশ থেকে তাপসীর কন্ঠ ভেসে আসে, হু।

-বৈশাখী শুভেচ্ছা। কি করো?

-এই তো ঘুম ভাঙ্গলো। অনেক রাত পর্যন্ত সিরিয়াল দেখলাম, ঘুমোতে দেরি হলো।

-গুড। পান্তা ইলিশ খেতে হবেনা?

-হু, সারা বছর তো চাইনিজ খেয়ে কাটালে চলবে না। 

-কখন আসছো?

-এই তো, তুমি রেডি হয়ে বের হও। আমিও বেরোচ্ছি।

নিরি বের হবার সময় বাবার সাথে দেখা। 

-কোথায় যাস?

-একটু জরুরী কাজ....?

-আকাশে মেঘ, সে খেয়াল আছে?

-জ্বি। আছে।

সামনে হাঁটতে শুরু করে শান্ত। পেছনে বাবা। সামনে পহেলা বৈশাখ। মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা। রুপম টাওয়ারের সামনে তাপসীর সাথে দেখা। ভ্রুকুঁচকে কথা বলে তাপসী, একটু দেরী হয়ে গেল না?

-হ্যাঁ। চল পান্তা ইলিশ খেতে হবে।

-এখন কি আর পান্তা ইলিশ পাওয়া যাবে! দেখেছো কতো বাঁজে?

শান্ত হাত ঘড়ির দিকে তাকায় বেলা ১১ টা। আকাশে মেঘ। ঠিক বোঝা যায়না সময় এতোখানি গড়িয়েছে। তাপসীর কথাই সত্য হয়। কোথাও পান্তা ইলিশ পাওয়া যায় না। হাজার হাজার দোকান বসেছিল পান্তা ইলিশের। অধিকাংশ দোকানই মাত্র একদিনের জন্য। বৈশাখী বাঙ্গালীদের পান্তা-ইলিশ খাওয়ানোটাই তাদের উদ্দেশ্য। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে দুজন মানুষ ঘোরাফেরা করে। বিকালের দিকে তাপসী চলে যায়। শান্ত তাপসীকে মনে করিয়ে দেয়, রাতে কিন্তু মেলা আছে। মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা। প্রথম দিনটা মিস করা যাবে না। প্লান করা ছিল! বুদ্ধিটা বের করেছিল তাপসী। উভয় পরিবারের মানুষগুলো সেকেলে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। চৈত্র বৈশাখ যাই হোক কোনভাবেই তাপসীকে বাইরে থাকতে দেবেনা ওর বাবা-মা। 

-একটা উপায় আছে। কথা বলে তাপসী।

-কি!

-নিতুদের বাড়িতে থকবো বলে রাতে বের হতে পারি। নিতু ভাল ছাত্রী, আমার বান্ধবী। তাকে বাড়ির সবাই খুব বিশ্বাস করে। বলবো রাতে ওদের বাড়িতে অনুষ্ঠান।

-রাতে যদি ফোন করে!

-নিতুর কাছে বলে ওর কিছু কথা রেকর্ড করে বাজিয়ে দিলেই তো হয়।

-গুড আইডিয়া। হাস্যজ্জ্বল শান্ত।

সন্ধ্যা নামতেই জমজমাট হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গন। চারিদিকে মানুষ। ধুম ধাড়াক্কা বেজে চলছে হিন্দি ইংলিশ গান। ইংলিশ গানের কিছু বুঝে আসেনা শান্তর। শুধু চিৎকার আর মিউজিক শুনে যুবকের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠা। কারণ কি! কতো কিছুরই তো কারণ জানা নেই আমাদের। সব কিছুর কারণ খোঁজাও ভাল না। 

মেয়েগুলো সেজেছে বৈশাখী সাজে। কারও হলুদ শাড়িতে ফুল, ফুলের ভেতর লেখা এসো হে বৈশাখ। কারও লাল, কারও। শান্ত মাথায় একটা ফিতা বেধেছে। ফিতায় বেশ মোটা আচড়ে লেখা-এসো হে বৈশাখ। শান্ত বেশ জানে বৈশাখ কে না ডাকলেও সে তার সময় মতো ঠিকই আসবে। ডাকার মানে কি! দেশ প্রেম। আমরা বাঙ্গালী। বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতি আমাদের আবহমান কালের ঐতিহ্য। তাইতো এ উৎসব, ডাকা!

তাপসী বিকালে বিদায় নিয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর থেকেই মেয়েটাকে অনুভব করছে বুকের ভেতর। রাত নটায়ও যখন তাপসীর খবর নেই তখন মেজাজ খারাপ হয়। ফোন করে, তাপসী আসবে না?

-হ্যাঁ। মেকি সুরে গলে পড়ে মেয়েটা।

- কোনো সমস্যা?

-না, সিরিয়াল টা শেষ করে আসছি।

-কিসের সিরিয়াল! শান্তর মেজাজ গরম হলেও প্রকাশ করে না।

-হিন্দি সিরিয়াল। ওফ্ জানো কি সুইট। আচ্ছা রাখি পরে কথা হবে।

টেলিভিশনের কিছু আবহ শব্দ আর তাপসীর রাখি, পরে কথা হবে একসাথে বেজে ওঠে, তারপরই লাইনটা কেটে যায়। খারাপ মেজাজ নিয়ে মেলার ভেতর একা একা বসে থাকে শান্ত। জুয়ার আসর বসেছে। আসর থেকে হাক ডাক শোনা যায়। বিভিন্ন কৌশলে মানুষকে ডাকছে। আসুন ল্যাইগা যাবে, ভাগ্যে থাকলে ঠেকায় কে! নিরির ভাবনায় আপাতত তাপসী। রাত সাড়ে দশটার দিকে তাপসী আসে।  

-কি তোমার সিরিয়াল শেষ হলো?

-হ্যাঁ। জানো.......... 

তাপসী কে থামিয়ে দেয় শান্ত, থাক আর বলতে হবে না।

-তুমি খুব রাগ করেছো?

-না।

-সরি। তাপসীর কথায় সব ভুলে যায় শান্ত।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে সময় যায়। ওরা গিয়ে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে। নাচ-গান হচ্ছে। হঠাৎ করেই তাপসীর মোবাইলটা বেঁজে ওঠে। ওর বাড়ি থেকে ফোন করা হয়েছে। শান্ত রেকর্ডিং বাঁজিয়ে দেবার জন্য নিজের ফোনটা রেডি করে। 

-হ্যা, আম্মু। কথা বলে তাপসী

-তুই কোথায়?

-এই তো মিতুর সাথে গল্প করছি।

-এত মানুষের চিৎকার গান বাজনার শব্দ কেন?

-ওদের বাড়ি অনুষ্ঠান তো।

-কই নিতুর কাছে দে। নিতুর গলাটা চেনা তাপসীর আম্মুর। রেকর্ডিং বাজতে শুরু করে।

-আন্টি কেমন আছেন?

-ভাল আছি, তোমার আংকেল কথা বলবে।

-হ্যালো। কথা বলেন তাপসীর আব্বু।

-জ্বি আন্টি, তাপসী আমার কাছেই আছে।

-নিতু আমি তোমার আংকেল।

-না না আপনি কোন দুঃশ্চিন্তা করবেন না।

-মানে!

-এই তো আন্টি, একটু পর ঘুমাবো।

-আমি তোমার আংকেল। কি সব বলছো!

-জ্বি আন্টি। 

শান্তর হাসি চাপতে কষ্ট হয়। কি সব হচ্ছে। রেকর্ডিং কি বোঝে আংকেল, আন্টি! ভদ্রলোকের মেজাজ খারাপ হয়, তাপসী কোথায়?

-জ্বি আন্টি, দোয়া করবেন।

-নিতু আমি তোমার আংকেল, তাপসী কোথায়?

-অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়ুন। আন্টি রাখি তাহলে।

শান্ত খিল খিল করে হেসে ওঠে। তাপসীর মুখটা ভীত-সন্ত্রস্ত। শান্ত হাসি থামিয়ে সান্তনা দেয়, ভয় নেই, আমি আছি না।

-তুমি থাকলে কি হবে!

-আমার মাথায় যে বুদ্ধি তা তো জানোই। ঠিকই একটা সমাধান বের করে ফেলবো।

মুখের কথা শেষ হতে না হতেই প্রচন্ড ঝড়ো বাতাস শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই হুড়ো হুড়ি দৌড়া-দৌড়ি। বাতাসের প্রথম ঝাপটা আর সাথে সাথে প্যান্ডেলের কয়েকটা বাঁশ খুঁটি হুড়মুড় করে এসে পড়ে শান্তর গায়ের উপর। তাপসী শান্তর কাছেই ছিল। দৌড়ে পালাতে যায়। চাপা পড়া শান্ত কাতর কন্ঠে ডাকে, তাপসী। তাপসী। ডাক শুনে মেয়েটা শান্তর কাছে আসে। বেশ কয়েকটা বাঁশ কাপড় দড়ি শান্তর প্রায় সবটা ঢেকে ফেলেছে। একটা আঘাতে শরীরের কোথায় যেন ক্ষত হয়েছে। লাল রক্তে ভিজে উঠছে সাদা কাপড়। সাথে সাথেই বাতাসের আরেকটা দমকা। কড় কড় করে ওঠে বাঁশ খুঁটি। তাপসী দৌড় দেবার আগে শুধু বলে, শান্ত আরও অনেক বাঁশ খুঁটি আছে। তাপসী চলে যায়। একা একা পড়ে থাকে শান্ত। শরীরের সব শক্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! কোথায় হারালো? বিদ্যুৎ চলে যায়। আবার বাতাসের ঝাপটা। মানুষের চিৎকার। কিছু মানুষের পায়ে পিষ্ট হয় চাপাপড়া অশান্ত শান্ত। তাপসীর কথা আর মনে পড়েনা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ