শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

মাহিনের সু-পথে ফেরা 

রুহুল আমিন রাকিব : মাহিন নামটা কত সুন্দর! তাইনা? নাম সুন্দর হলে হবে কি! মাহিন কিন্তু একটুও ভালো ছেলে নয়। মাহিনের বাড়ি, কামাল খামার, আমবাড়ি নামের গ্রামে। মাহিনের কাজ সব সময় সবার সাথে দুষ্টুমি করা। হোক না সে বয়সে বড় আর ছোট কোন বাছ বিচার নেই, সবাই কে অসম্মান করতেই যেন সব থেকে বেশি ভালোবাসে মাহিন। আর পড়া-লেখার ধারেও যায় না, কখনো স্কুলের মাঠেও ঠিক মতো পা দেয়নি মাহিন। গাঁয়ের সব ছেলেরা মাহিনের কাছ থেকে সব সময় দূরে-দূরে থাকে। অন্য ছেলেদের মা-বাবা কখন’ই ওদের ছেলেকে মাহিনের সাথে মিশতে দেয় না। আর মাহিনকে নিয়ে প্রতিদিন একটার পর একটা অপমানের লজ্জায় পড়তে হয় মাহিনের মা, বাবা’কে। এমন কোন দিন নেই যে মাহিনের নামে নালিশ করে না গাঁয়ের লোকেরা। গ্রামে কোন কিছু চুরি হয়ে গেলেই হয়, সব দোষ আর সন্দেহের তীর এসে পড়ে মাহিনের উপর। চুরি না করেও কত জনের হাতে যে চড় থাপ্পর সহ্য করতে হয়েছে মাহিন কে, এর যেন কোন শেষ নেই, নেই এই প্রশ্নর উত্তরও। এই’তো কিছু দিন আগেও পাশের বাড়ির হাঁস চুরির অপরাধে মাহিনকে সন্দেহ করা হলো এরপরে মাহিনকে ধরে ইচ্ছা মতো উত্তম মাধ্যম দেওয়া হলো, গাঁয়ের সবার সামনে। যদিও চিৎকার করে সেদিন অশ্রুশিক্ত নয়নে বলে ছিলো আমি চুরি করি নাই, এই হাঁস চুরির বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে কে শুনে তার কথা! মাহিনের প্রতি মাহিনের বাবা মায়েরও ঘৃণা হয়, রোজ কত বকা আর মাইর যে খায় বাবার হাতের এর পরেও একটুও ভালোর পথে আসে না মাহিন। মাহিনের প্রিয় একটি নেশা হলো পাখির বাসা খুঁজে বের করা আর নীরিহ পাখিদের ফাঁদ পেতে শিকার করা। বক পাখি, ঘুঘু পাখি, শালিক পাখি, টিয়ে পাখি এদের বাসা খুঁজে বের করে, ওদের বাসার ডিম পাড়া থেকে শুরু করে বাচ্চা ফুটানো পর্যন্ত সব খোঁজ খবর রাখে মাহিন, ডিম থেকে বাচ্চা ফুটলেই হলো ছানাগুলো একটু বড় হতে না হতে, সুযোগ বুঝে মাহিন গাছ বেয়ে তা পেড়ে নিয়ে আসতো। আর বাজারে নিয়ে বাচ্চাগুলো বিক্রি করে দিতো নয়তো মেরে ফেলতো। কত পাখির ছানা যে এভাবে মাহিন ধরে আনে, এর কোন শেষ নেই। ওই গাঁয়ের মানুষ মাহিনের ব্যবহারে একদম অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে মাহিনের প্রতি। শুধু কি মাহিনের প্রতি? মাহিনের জন্য তার বাবাও গাঁয়ে সমাজে মুখ দেখাতে লজ্জা করে, গাঁয়ের কোন সমাজ-মূলক কাজে মুখ খুলে কোন কথা বলাতো দূরে থাক, মাহিনের বাবাকে কেউ সমাজের কোন কাজে ঠিক মতো ডাকেও না। যদিও মাহিনের বাবা একদম সহজ সরল আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। গাঁয়ের সবাই মাহিনের বাবাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে জানে, তবে ছেলের এমন ব্যবহারের জন্য কেউ এখন আর তেমন একটা মান দেয় না মাহিনের বাবাকে। ছেলের জন্য কত দোয়া করে মাহিনের মা আল্লাহর কাছে। তবে একটুও পরিবর্তন নেই মাহিনের। সেদিন রাতের ঘটনা, সেদিন দিনে অনেকগুলো পাখি ধরছে মাহিন, ইয়া বড় বড় ঠোঁট আর বেশ সুন্দর দেখতে পাখিগুলো। পাখিগুলো ধরে অনেক খুশি মাহিন, কারণ আজ বাজারে পাখিগুলো বিক্রি হলে অনেক টাকা আয় করবে মাহিন। যদিও পাখিগুলোর নাম সঠিক জানা নেই মাহিনের, তবে এই পাখিগুলো যে শীতের অতিথি পাখি, এই কথা বেশ ভালো করেই জানে মাহিন। কারণ প্রতি শীতের মৌসুম আসলে এমন নাম না জানা অনেক রঙ বে রঙের অতিথি পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে আমাদের দেশে। 

যখন ওদের দেশে প্রচন্ড রকম শীত পড়ে পাখিগুলো তখন অনেকটা অসহায় হয়ে পরে। নিজের জীবন বাঁচাতে পাড়ি জমায় লাল সবুজের এই প্রিয় বাঙলা দেশে। আর মাহিন ওদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে রোজ ফাঁদে আটকে ফেলে। 

পাখিগুলো বাজারে বিক্রি করে হাসি খুশি মন নিয়ে বাড়িতে এসে রাতের খাবার খাওয়া শেষ করে, পরের দিন পাখি ধরার পরিকল্পনা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছে মাহিন। হঠাৎ মাহিনের ঘুম ভাঙে শরীরে প্রচন্ড রকম ব্যথা আর জ্বর নিয়ে, পানির পিপাসাও খুব পেয়ে বসেছে মাহিন কে। তবে বিচানা থেকে একটুও উঠে দাঁড়াবার শক্তি যেন নেই মাহিনের শরীর জুড়ে, অনেক চেষ্টার পরেও দাঁড়াতে পারলো না মাহিন। শেষে মাহিনের চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে ঘুম-ঘুম চোখে উঠে আসে মাহিনের মা, এর পর মাহিন সব ঘটনা খুলে বলে তার মায়ের কাছে। সেদিন রাতটা অনেক কষ্ট করে কাটিয়ে দিল মাহিন, সকাল বেলা ডাক্তার ডাকা হলো বাড়িতে, ডাক্তার মাহিনকে দেখে বললেন মাহিনের কালো জ্বর হয়েছে, এটা অনেক খারাপ জ্বর। তাড়াতাড়ি করে মাহিনকে হাসপাতালে নিতে বললেন ডাক্তার। 

এর পরে মাহিন'কে একটি সেবা-ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো। আজ তিন দিন হলো, জ্বর যেন কিছুতে থামছে না মাহিনের। আজ যেন একটু বেশি অসুস্থ মাহিন, শরীর একদম কালো হয়ে গেছে দূর থেকে দেখে যে কেউ ভয়ে আতকে উঠবে মাহিনের মুখ দেখে। একটুও ঘুমাতে পারছে না মাহিন চোখের পাতা বন্ধ করলে মাহিন দেখতে পায় তার সামনে ছোট বড় অনেকগুলো পাখি চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি সবাই মিলে মাহিনকে খেয়ে ফেলবে। আর পাখিগুলো যেন মাহিনের খুব পরিচিত, যে পাখিগুলো রোজ ফাঁদ পেতে শিকার করতো। এই দৃশ্য দেখে ভয়ে আঁৎকে উঠে মাহিন ভয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকায়, আর মায়ের কাছে বলে মা-মা দেখ এই যে পাখিগুলো আমাকে ধরতে আসছে। মাহিনের কথা শুনে, শান্তনা দিয়ে মাহিনের মা বলে কি বলছো এই সব আবল-তাবল কথা? হাসপাতালে আবার পাখি আসবে কোথা থেকে! তুমি ঘুমাওতো এই সব কথা বাদ দিয়ে।

সব সময় পাখির খবর রাখতে রাখতে তোমার মাথাটা গেছে একেবারে। সেদিন রাতে ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমাতে যায় মাহিন।হঠাৎ করে মাহিন স্বপ্নে দেখে ছোট বড় ওই পাখিগুলো মাহিনের কাছে এসে বলতেছে এই যে মাহিন তুমি আমাদের সবাই কে মেরে ফেলছ, তুমি আমাদের ফাঁদ পেতে ধরে এনে বাজারে বিক্রি করেছ। তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছো আমাদের নীড়ে আমাদের বাবা মা, ভাই বোন, আর আমাদের ছোট-ছোট ছানাদের কষ্টের কথা? আমাদের ধরার কারণে, বাসায় আমাদের ছোট ছানাগুলো দিনের পর দিন না খেয়ে মারা গেছে। তুমি একবার চিন্তা করে দেখ।

তোমার বাবা মায়ের মুখপানে তাকিয়ে দেখতো ওরা কত কষ্ট পাচ্ছে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়াতে। এই যে মাহিন প্রতিটা বাবা মায়ে এমন কষ্ট পায়, ছেলে মেয়ের কিছু হয়ে গেলে। আজ থেকে তুমি শপথ করো আর কোন দিন কারো ক্ষতি করবে না, পাখির ছানা ধরবে না, বাবা মা আর বড়দের সম্মান করবে, ছোট দের আর বন্ধুদের ভালো বাসবে, রোজ স্কুলে যাবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। তুমি যদি আমাদের কথা রাখ তবে তোমার এই রোগ থেকে আল্লাহ্ তোমাকে মুক্ত করবে, নয়তো তোমার মৃত্যু হবে। ভালো থাক মাহিন ভালো থাক, স্বপ্ন শেষ হতে না হতেই ঘুম ভেঙে গেল মাহিনের, এর পরে চিৎকার করে বাবা মায়ের পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নিলো, আর শপথ করলো আজকের পর থেকে আর কোন খারাপ কাজ করবে না মাহিন, পাখির ছানাও ধরবে না। আর কখনো খারাপ আচরণও করবে না কারো সাথে। 

আজকের পর থেকে বাবা মায়ের সব কথা মন দিয়ে শুনবে আর রোজ স্কুলে যাবে সময় মতো নিয়মিত নামাজও পড়বে মাহিন। মাহিনের কথা শুনে অনেক খুশি হলো মাহিনের বাবা মা। দেখতে দেখতে মাহিনের শরীর প্রায় সুস্থ হয়ে গেল যদিও ডাক্তার বলছে আরো কিছুদিন রেষ্টে থাকতে হবে মাহিন কে, তবে হাসপাতাল থেকে চাইলে এখন চলে যেতে পারে মাহিন। আজ সোমবার হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরছে মাহিন, মাহিন এখন থেকে আর খারাপ কাজ করবে না এই কথা জেনে গেল মাহিনের গাঁয়ের বন্ধুরা। সবাই অপেক্ষায় বসে আছে মাহিনদের বাড়ির পাশে পুকুর পারে 

দেখতে দেখতে রিক্সা এসে দাঁড়াল মাহিনদের পুকুর পারে, এবার রিক্সা থেকে নামার পালা, একে একে মাহিনের সব বন্ধুরা এসে দাঁড়াল মাহিনের পাশে। এরপর মাহিনকে সবাই মাঝখানে নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এক সুরে সবাই বলে উঠলো শুভ হোক মাহিন তোমার নতুন জীবনের পথ চলা। আর সেদিনের পর থেকে কামাল খামার, আমবাড়ি গ্রামে কেউ পাখি ধরে না, কেউ কোন খারাপ কাজ করতে পারে না। এখন রোজ সকালে ওই গ্রামে সবার ঘুম ভাঙে মাহিনের মিষ্টি কণ্ঠে ফজরের আজান শুনে আর পাখিদের কিচির-মিচির শব্দের সুর শুনে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ