বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

১১দফা দাবিতে অচল নৌ-পথ

বেতন-ভাতা বাড়ানো ও নদীপথে চাঁদাবাজি বন্ধসহ ১১ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে নৌযান শ্রমিকরা। এতে করে জনজীবনে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের চিত্র -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ১১ দফা দাবি আদায়ে দেশের নৌযান শ্রমিকদের অনিদিষ্টকালের ধর্মঘট বিচ্ছিন্নভাবে চলছে। নৌপথে সন্ত্রাস,চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধসহ ঘোষিত বেতন স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে। ধর্মঘটের কারণে নৌযান(লঞ্চ না ছাড়ায়) বন্ধ থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সারাদেশ। এতে নৌপথ অচল হয়ে পড়েছে। পণ্য পরিবহন এবং নৌযাত্রীরা বিপাকে পড়েছে।
 সোমবার রাতে শ্র প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। তবে বাস্তবে এর প্রতিফলন ঘটেনি। নৌযান শ্রমিক নেতাদের মধ্যে বিভেদের কারণেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
অবশ্য গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবারও নৌযান শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। জানা গেছে, এই বৈঠকে বাংলাদেশ নৌযান ফেডারেশনের অন্য নেতাদের সঙ্গে গতকাল রাতের বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও অংশ নেবেন।
এদিকে ঘোষণা সত্ত্বেও ধর্মঘট প্রত্যাহার কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে জানতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সামাদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে নৌ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, এই ধর্মঘটের বিষয়ে কিছুই করার নেই তাদের। কারণ, নৌপথে চাঁদাবাজির ঘটনা দেখার কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। আর শ্রমিকদের পূর্ণ বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি দেখার কথা শ্রম মন্ত্রণালয়ের। তাই এই ধর্মঘটের বিষয়ে যা করার তাদেরই করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় লঞ্চ এলেও সারা দিন সদরঘাট থেকে কোনও লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। বিশেষ করে সকালের দিকে চাঁদপুর ও শরীয়তপুরগামী কোনও লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। তবে বিকেলের দিকে ঢাকা থেকে হুলারহাটগামী (পিরোজপুর) লঞ্চ ছেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) আলমগীর হোসেন।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক দীপক কুমার সাহা বলেন, টার্মিনাল থেকে ইতোমধ্যে একটি ছোট লঞ্চ ছেড়ে গেছে। অধিকাংশ লঞ্চ ছাড়বে সন্ধ্যায়।
এদিকে সোমবার শ্রম অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে নৌযান মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে নেতারা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এরপরও ঢাকার সদরঘাটসহ দেশের বিভিন্ন নৌবন্দরে অনেকে এসে দেখেন লঞ্চ চলাচল বন্ধ। এতে বিপাকে পড়েন যাত্রীরা।
জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠেয় বৈঠকে চৌধুরী আশিকুল ইসলাম, শাহ আলমসহ বাংলাদেশ নৌযান ফেডারেশনের অন্য নেতাদের সঙ্গে গতকাল রাতের বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও অংশ নেবেন।
জানতে চাইলে চৌধুরী আশিকুল আলম বলেন, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১১ দফা দাবি নিয়ে সরকার, মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানানোর পরও কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যে কারণে কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।
তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আলোচনার জন্য আমাদের ডেকেছেন, তাই আমরা সন্ধ্যায় আলোচনায় যাচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সোমবারের বৈঠকে তারা ছিলেন না।
গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা ঘোষণা দেন, ১৫ এপ্রিলের মধ্যে নৌযান শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি বাস্তবায়িত না হলে ওই দিন মধ্যরাত থেকে কর্মবিরতি পালন করা হবে।
নৌযান শ্রমিকদের ১১ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং নৌযান শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় কর্মস্থলে কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হলে তার পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া, সমুদ্রভাতা ও রাত্রিকালীন ভাতা নির্ধারণ করা ইত্যাদি।
মংলা বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ  : ১১ দফা দাবিতে খুলনায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। সোমবার দিবাগত রাত ১২টা এক মিনিট থেকে তারা এ কর্মবিরতি শুরু করেছে। নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধসহ ২০১৬ সালের ঘোষিত বেতন স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস প্রদান ও হয়রানি বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা, নদীতে প্রয়োজনীয় মার্কা, বয়া ও বাতি স্থাপনসহ ১১ দফার দাবিতে তাদের অনির্দিষ্টকালের এ কর্মবিরতি চলছে।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের  খুলনা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনন জানান, সোমবার নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের দাবি-দাওয়া নিয়ে ঢাকায় যে বৈঠক হয়েছে সেখানে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তাই অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন।
এদিকে নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতির ফলে খুলনা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মংলাসহ সারাদেশের নৌপথে পণ্য পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে আমদানি-রফতানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশনের মংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ননের মংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মামুন হাওলাদার বাচ্চু জানান, ১১ দফা দাবিতে নৌযান শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। এজন্য মংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল ও মংলা নদীতে পণ্য বোঝাই ও খালি কার্গো-কোস্টার জাহাজগুলো অলস সময় পার করছে। নৌযান শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে মংলা বন্দরে অবস্থানরত বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহন কাজও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া মংলা বন্দরের সঙ্গে নদী পথে দেশের বিভিন্ন নৌ বন্দরের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে মংলা বন্দরের আমদানি-রফতানিকারকরা।
বাল্কহেডসহ সব নৌযান ও নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী ও ডাকাতি বন্ধ, ২০১৬ সালের ঘোষিত বেতন স্কেলের পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস প্রদান ও হয়রানি বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা, নদীতে প্রয়োজনীয় মার্কা, বয়া ও বাতি স্থাপনসহ ১১ দফা দাবিতে সোমবার রাত ১২টা ১মিনিট থেকে মংলা বন্দরসহ সারাদেশে নৌযান চলাচল বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন শুরু করেছে নৌযান শ্রমিকেরা। সারাদেশের প্রায় ২০ হাজার নৌযানের ২ লাখ শ্রমিক এ কর্মবিরতি পালন করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম পটল। তিনি বলেন, ‘নৌযান শ্রমিকদের আন্দোলন বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করার অপচেষ্টা চলছে। কেউ কোন ধরনের অপপ্রচারে কান দেবেন না।’
নৌ-যান ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরে
নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা: ১১ দফা দাবীতে দেশব্যাপী নৌ-যান (কার্গো, কোস্টার) শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরেও। মঙ্গলবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জের নদীবন্দরের লঞ্চঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি রুটে যাত্রীবাহি লঞ্চ চলাচল করলেও চাঁদপুর, মোহনপুর ও এখলাছপুর সহ অন্যান্য দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। লঞ্চের অপেক্ষায় যাত্রীদের কেউ কেউ দুই তিন ঘন্টা যাবত টার্মিনালে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। ধর্মঘটের সমর্থনে লঞ্চঘাটে সারিবদ্ধভাবে কয়েকটি লঞ্চ বেঁধে রাখা হয়েছে। তবে ধর্মঘট পালনকারী শ্রমিক কর্মচারীরা লঞ্চঘাট থেখে অন্যত্র সড়ে আছে। আবার কোন কোন যাত্রী শুরেশ্বর ও বরিশাল যাওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ যাতায়াত করেও লঞ্চ পাচ্ছেন না। যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
লঞ্চ শ্রমিকরা জানান বর্তমান বেতনে তাদের সংসার চলে না। বার বার আন্দোলন করে বেতন বৃদ্ধির চুক্তি হলেও মালিকরা মানছেন না। নিজেদের বাঁচার তাগিদেই ধর্মঘটে আছেন। দাবী না মানা পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে বলেও জানান।
বাংলাদেশে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ফেডারেশন এসোশিয়েশনের সভাপতি আব্দুর রউফ এর দাবী বহু আন্দোলনের পর সরকার দাবী মেনে নেয়ার পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও মালিক সমিতি তা মানছে না। দাবী আদায়ের জন্যই এ ধর্মঘট চলছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সিনিয়র সহ-সভাপতি জানান, শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মালিক সমিতির কাছে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের দাবি উপস্থাপন করা হয় নি। তিনি জানান, সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আজ বিকেলে সদরঘাটে লঞ্চ মালিক কার্য্যালয়ে সমস্ত লঞ্চ ও নৌ-যান মালিকদের নিয়ে আলোচনায় বসে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে জনগণের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের প্রতি আহবান জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৭০টি যাত্রীবাহি লঞ্চ সহ সহ¯্রাধিক বাল্কহেড ও পণ্যবাহি কার্গো চলাচল করে থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ