বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া সেই নারী আটক!

স্টাফ রিপোর্টার : ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া নারী সন্দেহে একজনকে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। এই নারীর নাম কামরুন নাহার মনি। সে নুসরাতের সহপাঠী ও ওই মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মনিকে সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার সামনে থেকে আটক করা হয়।
ফেনী পিবিআই’র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া সেই নারী সন্দেহে ওই ছাত্রীকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার কেন্দ্র সচিব নুরুল আফসার ফারুকী বলেন, পিবিআইয়ের সদস্যরা গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শেষে জান্নাতুল আফরোজ মনিকে আটক করেছেন।
এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি নূরউদ্দিন রোববার রাতে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছিল, তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মনি ছিল।
মনিসহ নুসরাত হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত সাতজন, বাকিরা সন্দেহভাজন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র ফেনী অফিসের পরিদর্শক শাহ আলম  জানান, ১৫ জনের মধ্যে এজাহারভুক্ত ১ নম্বর আসামি সিরাজ উদ্দৌলাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সে সাতদিনের রিমান্ড আদেশপ্রাপ্ত। ২ নম্বর আসামি নূরউদ্দিন (২০) ও তিন নম্বর আসামি শাহদাত হোসেন শামীম (২১) রোববার (১৪ এপ্রিল) রাতে দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। চার নম্বর আসামি পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলমকে (৪৫) সোমবার পাঁচদিনের রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ নম্বর আসামি জাবেদ হোসেনকে (১৯) সাতদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ছয় নম্বর আসামি মাদ্রাসার ইংরেজি বিষয়ের অধ্যাপক আফছার উদ্দিন (৩৫) ও সাত নম্বর আসামি আলাউদ্দিন (৩০)।
তিনি আরও জানান, এছাড়া কেফায়েত উল্লাহ (৩২), নুসরাতের সহপাঠী ও অভিযুক্ত অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা (১৮), মাদ্রাসাছাত্র নূরউদ্দিন (১৯), নূর হোসেন (২১), শহীদুল ইসলাম (১৯), জোবায়ের আহমেদ (২১) ও আরিফুর ইসলাম (১৯) পাঁচদিন করে রিমান্ডের আদেশ পেয়ে কারাগারে আছে।
নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে তাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।
এদিকে, এ হত্যা মামলায় জড়িত অভিযোগ তুলে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
 
শাস্তির দাবিতে ফেনী ও সোনাগাজীতে মানববন্ধন
নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফেনী ও সোনাগাজীতে মানববন্ধন করেছে একাধিক সংগঠন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জেলা শহরের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে ‘ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতি’। বিকালে একাদশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে শহরের শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে মানববন্ধন করে ‘সরকারী জিয়া মহিলা কলেজ’ শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া সকালে সোনাগাজী বাজারের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন করে ‘সোনাগাজী মহিলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ শিক্ষার্থীরা। ফেনী ও সোনাগাজীর আরও কয়েকটি স্থানেও বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে।
ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন মানববন্ধনে তার বক্তব্যে বলেন, “দুই আসামির জবানবন্দিতে নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিনের নাম উঠে এসেছে। অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওয়তায় আনা হোক।”
অন্য বক্তারাও নুসরাতে হত্যায় জড়িত সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা না হয় সে ব্যাপারে সরকারের সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারা।

নুসরাতের ঘটনাকে আত্মহত্যা বানানোর অপচেষ্টাও হয়!
নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার পরপরই ঘটনাটি ‘আত্মহত্যাচেষ্টা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। সোনাগাজী থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের ‘ভাষ্য’ দিয়ে ‘আত্মহত্যাচেষ্টা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচারণায় ছিলেন একটি জাতীয় দৈনিকের সোনাগাজী প্রতিনিধিও।
নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ, এই ছাত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালানো হয় ‘আত্মহত্যাচেষ্টা’ হিসেবে। এই অপপ্রচার ছিল ‘কিলিং মিশনের’ অংশ। বিপুল অর্থের বিনিময়ে  অপপ্রচারটি হয়েছিল। যদিও ওই সাংবাদিকের দাবি, তিনি প্রত্যাহার হওয়া ওসির কথায় এই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন।
৬ এপ্রিল সকাল পৌনে ১০টার দিকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়া হয়। এক ঘণ্টার মধ্যেই ওই সাংবাদিক তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেন, ‘মাদ্রাসার ছাদে উঠে শরীরে পেট্রোল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় সোনাগাজী ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার নুসরাত জাহান নামের এক ছাত্রী। সকাল ১০টার দিকে ঘটে বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীৃ।’ এই পোস্টটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফেসবুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা দেয় বিভ্রান্তি।
যদিও এরমধ্যে সবকিছুই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। তবে রোববার (১৪ এপ্রিল) নুসরাত হত্যা মামলার দুই ও তিন নম্বর আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর সব বিভ্রান্তিই উড়ে যায়। নুর উদ্দিন ও শামীম স্বীকার করেন, জেলখানা থেকে (মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা কারাবন্দি) হুকুম পেয়েই তারা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারেন। শামীম সরাসরি হত্যায় অংশ নেন।
তবে নুসরাতের স্বজন ও সতীর্থরা বলছেন, আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর নুসরাত কয়েকদিন বেঁচেছিল বিধায় সে তাকে ঝলসে দেওয়ার কথা বলে যেতে পেরেছে। ঘটনাস্থলেই সে প্রাণ হারালে এই অপপ্রচারই পোক্ত হয়ে উল্টো নুসরাতের ওপর দায় চাপতো। তাতে পুরো ঘটনাটিই উল্টে যেতো।
এদিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত পরোক্ষদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
এরইমধ্যে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করতে থানায় যাওয়ার পর নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ায় সোমবার (১৫ এপ্রিল) সোনাগাজী থানার সেসময়কার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে একটি মামলা হয়েছে। এ মামলাও তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ