বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

১৫ মাসে যৌন সহিংসতার শিকার ২০১ নারী

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : যৌন সহিংসতার শিকার হবে নারী- এটাই যেন তাদের নিয়তি। স্থান-কাল-পাত্র নেই, ঘরে বাইরে সর্বত্রই নারী টার্গেট। কতিপয় পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি যেন খুঁজে ফিরে তাদের। সুযোগ পেলেই হামলে পড়া।
নারীর প্রতি সহিংসতা-একটির পর একটি ঘটনা, কোনটারই যেন রাশ টানা যাচ্ছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সহিংসতাকে লালন করছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এমন কোন দিন নেই যে দেশের কোথাও কোন নারী যৌন নির্যাতন কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন না- এমন খবর খবরের কাগজের পাতায় উঠে আসছে না। প্রতিদিনের শিরোনাম হয়ে আসছে নারীর মন্দ খবর। মানবাধিকারকর্মী ও নারী নেত্রীদের অভিমত “আইনের শাসন নেই বলে স্পর্ধা বাড়ছে অপরাধীর। তাদের মতে, একটি ঘটনার জন্ম হওয়ার সাথে সাথে সেই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিচার হলে পরবর্তী ঘটনা ঘটানোর সাহস পেতো না অপরাধীরা।
সর্বশেষ যৌন সহিংসতার শিকার ফেনীর মেয়ে নুসরাত। তার আগে কুমিল্লার তনুকেও প্রাণ দিতে হয়েছে অকালে। তারও আগে দিনাজপুরের ইয়াসমিন-সিমি-রিমি আরও কত নাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি আর সহিংসতা যেন চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুতে পুরো দেশজুড়ে তোলপাড়। ২০১৮ সাল থেকে গত মার্চ মাস পর্যন্ত এই  ১৫ মাসে যৌন হয়রানি ও সহিংতার শিকার হয়েছেন দেশের ২০১ নারী। আইন ও সালিশ কেন্দ্র সূত্রে এ দাবী করা হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২০১ জন। এর মধ্যে মারা গিয়েছেন ২৪ জন। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৭৩ জন ও চলতি বছরের প্রথম তিস মাসে সেই সংখ্যা ২৮ জন।
যৌন হয়রানির শিকার হয়ে সামাজিক রক্তচক্ষুর ভয়ে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন। জানা যায়, ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন আট জন। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন একজন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছেন ১২ জন। এর মধ্যে তিনজন নারী ও ৯ জন পুরুষ। বখাটে কর্তৃক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১২০ জন। যৌন হয়রানিকে কেন্দ্র করে বখাটেদের সাথে সংঘাতে আহত হয়েছেন ২৬ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে  পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিন জন। আর প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছেন একজন। বখাটেদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৯ জন। বখাটেদের উৎপাতকে কেন্দ্র করে গঠিত সংঘাতে আহত হয়েছেন পাঁচ জন।
শুধু তাই নয় এ ধরনের ঘটনায় মূল ক্ষতির শিকার হন নারীরাই। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ করে দেন অভিভাবকরা। ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া এমন ছয় জন মেয়ের পড়ালেখা বন্ধ করে দেন অভিভাবকরা।
বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক আশ্রয়, গবেষণা না  থাকা, যথার্থ শিক্ষায় তরুণদের শিক্ষিত না করাই এ ধরনের অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে অসংখ্য নুসরাতের মরদেহ নিয়ে কাঁদতে হবে বলছেন তারা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী নীনা গোস্বামী বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন কিছু নয়। বারবার একই ঘটনা ঘটছে। নারীরা হচ্ছেন মূল শিকার। যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছেন এসব কাজে। অনেক সময় অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে কেউ যাতে যৌন হয়রানি করতে না পারেন, সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের শাস্তি দাবি করে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম বলেন, ‘নুসরাতের মৃত্যু খবুই দুঃখজনক। বারবার এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটেই চলছে। কারণ দেশে আাইনের শাসন নেই, দুর্বল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও। আর আইনের শাসন নেই বলেই অপরাধীদের স্পর্ধা বাড়ছে। তারা শাস্তি পায় না বলেই আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এমন ভয়াবহ অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে।’
অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম বলেন, ‘নুসরাতের ঘটনায় রাষ্ট্রের মামলা পরিচালনায় সব ধরনের সহযোগিতা করব আমরা। এমনকি ঠিকমতো এই মামলার কার্যক্রম চলছে কি না, তাও মনিটরিং করব।’
নুসরাতের মৃত্যুতে ক্ষোভ জানিয়ে মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম রাষ্ট্রকেই এর দায়ভার নেওয়ার দাবি জানান। আয়েশা খানম আরও বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের ধারাবাহিকভাবে, ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করতে হবে। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে । দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে নারী সন্ত্রাসীও আছে। এই অধ্যক্ষ একাধারে যৌন নিপীড়ক, সন্ত্রাসী ও হত্যাকারী।’
অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার যাবজ্জীবন সাজা দাবি করে নারীর প্রতি সহিংসতাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলা করার আহ্বান মহিলা পরিষদের সভাপতির।
আয়েশা খানম বলেন, ‘বারবার বলার পরও যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন রোধে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে এখনো পূর্ণ আইন তৈরি করা হচ্ছে না। সরকারকে এ বিষয়ে বারবার আমরা নক করছি।’
নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ‘সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া থাকলেও নারীরা বিভিন্নভাবে সহিংস বৈষম্যের শিকার।’ নারীর প্রতি সহিংসতা বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতায় এখন ধর্ম এবং রাজনীতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘আইনশৃঙখলা পরিস্থিতির অবনতি আর আইনের শাসন না থাকায় অপরাধীরা বারবার একই রকম অপরাধ করেই যাচ্ছে। এসব অপরাধীদের আইনের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাবোধ নেই, তেমনি নারীর প্রতি ন্যুনতম মর্যাদা আর সম্মানবোধও নেই।’
অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘যে দেশে নারী-শিশুদের রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারে না, মানবাধীকারকর্মীরা সোচ্চার হয়েও কোনো লাভ হবে না। এসব অপরাধ দমনে মূল কাজটা করতে হবে রাষ্ট্রকে। এখানে প্রধান অপরাধী অধ্যক্ষ। যে কিনা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মামলা তুলে নিতে নুসরাত আর তার পরিবারকে চাপে রেখেছে। এটাই প্রমাণ করে সে অপরাধে সরাসরি জড়িত।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ