বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সড়ক মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না

এইচ এম আব্দুর রহিম : দেশের সড়ক মহাসড়কে যেন দুর্ঘটনা থামছে না। যন্ত্রদানবের বেপরোয়া তান্ডবে মৃত্যুর মিছিল ক্রমান্বয়ে আরো প্রলম্বিত হচ্ছে। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়টি নিয়ে খুদে শিক্ষার্থীরা দেশ কাঁপানো আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। আবারও একজন কলেজ ছাত্রের করুণ মৃত্যুতে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। 

গত ১৯ মার্চ সকালে রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বাসচাপায় প্রাণ হারাল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। ২০ মার্চের সকল জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় খবরটি শিরোনাম হয়ে আসে। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাসহ সড়কে নৈরাজ্যের কথা উঠে এসেছে। গত বছর খুদে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশ কাঁপানো আন্দোলন গড়ে তুলে ছিল। রাজধানী শহীদ রমিজদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপা দেয়ার ঘটনায় টানা ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠলে তাদের দাবি মানার আশ্বাস দেয় সরকার। কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়ে ছিল তার বাস্তবায়ন কতটুকু হলো? এ ক্ষেত্রে শুধু উল্লেখযোগ্য ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ জাতীয় সংসদে অনুমোদন হয়েছে। গত সেপ্টেন্বরে আর সাবেক মন্ত্রী ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ব্যস এই পর্যন্ত। বাকী দাবি একটাও মানা হয়নি। অতীতের ঘটনার আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা না নিতে পারায় আবার আবরার নামে এক ছাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুমুখে পতিত হল। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় আবরারের মৃত্যু বেপরোয়া চালকদের সাবধান করতে পারে। এ দিকে শিক্ষার্থীদের চলা আন্দোলনের মধ্যে গত ২১ মার্চ গাইবান্ধা ও যশোরে যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হয়েছে তিন স্কুলছাত্রী। সড়ক আন্দোলনের পর থেকে গত আট মাসে সড়ক র্দর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। ১৯ মার্চ আবরার নিহত হওয়ার পর ছাত্ররা ১২ দফা দাবি দিয়েছে। তাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। এগুলো হলো পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করা এবং বাস চালকদের লাইসেন্সের কাগজ চেক করতে হবে। দুর্ঘটনায় আটক চালককে দ্রুত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালককে দ্রুত সময় অপসারণ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সব স্থানে আন্ডারপাস, স্পিড বেকার এবং ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। চলমান আইনের পরিবর্তন করে সড়ক হত্যার সাথে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দায়িত্ব অবহেলাকারী প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে স্থায়ী অপসারণ করে প্রয়োজনীয় আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাস স্টপেজ এবং যাত্রী ছাউনি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ছাত্রদের হাফপাস (অর্ধেক ভাড়া) অথবা আলাদা বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।

আমাদের দেশে আইন আছে। আইনের প্রয়োগ নেই ক্ষমতাসীনদের দাপটে। আমাদের দেশে প্রায় কোথাও না কোথাও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পত্রিকার খবর ২০ মার্চ আরও ১১ জনের মৃত্যু, ২১ মার্চ পরদিনের খবর দুই শিক্ষার্থীসহ ১৮ জনের মৃত্যু, সড়ক র্দুঘটনার ব্যাপারে অনেকে ধারণা করে ছিল শিক্ষার্থীদের দেশ কাঁপানো আন্দোলনের পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে বা দীর্ঘদিনের জনদাবি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সব রকম ব্যবস্থা দ্রুত নেয়া হবে। কিন্তু তার বিন্দুমাত্র বাস্তবায়িত হয়নি। ২০ মার্চ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা গেছে বাসের পাল্লাপাল্লি প্রতিযোগিতায় রাজধানীর প্রগতি সরণিতে কলেজ ছাত্রের অকাল মৃত্যু। এ ঘটনার পর ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এর পর সাতদিনের আলটিমেটাম দিয়ে ১১ দফা দাবি পূরণের দাবির আশ্বাস পেয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ২০ মার্চ তাদের বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করে। প্রশ্ন হলো, দায়িত্বশীলরা গত আট মাসে দাবি পূরণে আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেননি। সাতদিনে তারা কি করে সক্ষম হবেন?।

এ দিকে বিআরটিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে ৫ লাখ ১১ হাজার  ৩৪৮টি। এসব গাড়ির ৪১ শতাংশ রাজধানী ঢাকায় চলাচল করে। বিআরটিএ জানাচ্ছে, গত বছর সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ছিল ৩ লাখ অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। বিআরটি আরো জানাচ্ছে, ৫০ শতাংশ গাড়ি চালায় লাইসেন্সবিহীন অবস্থায়। এর ৩০ শতাংশ ঢাকায় চলছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে, বাড়ছে প্রাণহানি। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেন্বর পর্যন্ত ঢাকায় ৬৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬৯৯ জন নিহত হয়েছে এবং এক হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে বাসের কারণে ঘটা ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বাসেরই ফিটনেস ছিল না। আবার কোনটির চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রির্সাচ সেন্টারের (এআরসি) গবেষণা অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতিবছর ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং আহত হয় ৩৫ হাজার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে মৃত্যুর হার ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছাড়াও আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণের হারও কম নয়। এ সমস্যা একটি সোশ্যাল বা সামাজিক ট্র্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হয় যানবাহনে চড়তে হয়। কিন্তু লাশ হওয়ার ভয়ে শঙ্কিত হতে হয়, তাহলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না, মৃত্যু একদিন হবে, তবে এভাবে কেন? সড়ক দুর্ঘটনা শুধু সামাজিক সমস্যা নয় এর পিছনের রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রয়েছে। উপরন্ত বিচারহীন, প্রতিকারহীন ঘটনা ঘটতে থাকলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেবে এটাই স্বাভাবিক। এজন্য দুর্ঘটনার পর ড্রাইভার পালিয়ে যায়। আবার অনেক ড্রাইভারের নিজের প্রাণ চলে যায়। আবার সড়ক দুর্ঘটনা আইন দুর্বল হওয়ায় অনেকে আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

 সরকারি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫০০০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হিসেবে প্রদান ভিত্তি হলো পুলিশের রির্পোট, যেখানে অনেক দুর্ঘটনার রিপোর্ট উঠে আসে না। তাদের মতে সরকারি হিসাবের দুই-তিন গুণ করলে সঠিক সংখ্যাটা পাওয়া যাবে। মোট কথা হলো, বলা যায় লাইসেন্স তৈরি করার সময় দুর্নীতি দূর করা না গেলে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা রক্ষা করা দুরূহ হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবহন চালকের মানুসিকতার পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অর্থাৎ যথোপযুক্ত মটিভেশন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মানুসিক উন্নতি ঘটানো না গেলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। এছাড়া পরিবহন খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটে গেল আবরার রাস্তার মাঝ অবধি ক্রস করতে না করতেই সুপ্রভাত পরিবহনের বাসচালক তার ওপর দিয়ে বাসটি চালিয়ে দেয়। এবং বাস চাপা দিয়ে বাস চালক ক্ষান্ত ছিল না। সে আরও বেশ কিছু দূর আবরারের থেতলানো দেহটি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল। ইউনিভার্সিটি বাসে উঠিয়ে দিতে এসে আবরারের বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফ সন্তানের নৃশংস হত্যাকা- অসহায়ের মতো চেয়ে দেখলেন। এর চেয়ে বড় আঘাত একজন পিতার পক্ষে আর কি হতে পারে? পরিবহন ভাতের নৈরাজ্য এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সরকার রাখে না। এজন্য চাই ফিটনেসবিহীন গাড়ি উঠে যাক, সড়ক মহাসড়ক থেকে। লাইসেন্সবিহীন চালকও ফিটনেসবিহীন গাড়ি মালিকদের আইনের আওতায় আনা হোক শৃঙ্খলা ফিরে আসুক সড়কে। পুলিশের দুর্নীতির ব্যাপারে গোদের উপর বিঁষফোঁড়া। পুলিশের মানুসিকতার পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ট্রাফিক আইন বাস্ততবায়নে পুলিশের ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসিনতা পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে গেলে চলবে না। আগেও বলেছি আবার বলছি, বিষয়টি পরিবহন খাতে নৈরাজ্যের বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। আর এ বিষয়টি হলো, পরিবহন খাতের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের কব্জায়। প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এদের বেগ পেতে হয় না। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে দুর্নীতি ও দুর্ঘটনায় এদের ব্যবহার করে এরা বড় বড় অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সুদৃঢ় না হলে দুর্নীতিবাজরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তারা কথা দিয়ে কথা রাখে না। মনে রাখতে হবে, নিরাপদ সড়কের আন্দোলন সরকার বিরোধী আন্দোলন নয়। পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গত বছরের মতো পেটোয়া বাহিনী দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সরকারকে বড় রকমের খেসারাত দিতে হবে। বাস্তবতাকে স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তত থাকতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ