বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

একটি নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড

শেষনিশ্বাস পর্যন্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর ঘোষণা দিয়েছিল ফেনীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। কিন্তু প্রতিবাদ জানিয়ে আলোড়ন তুলতে পারলেও নিজের জীবন বাঁচাতে পারেনি সে। বুধবার রাতে মৃত্যু হয়েছে তার। এই মৃত্যু সারাদেশের মানুষকেই ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে। এর কারণ, এটা মোটেই সাধারণ মৃত্যু নয়। গত ২৭ মার্চ আলিম (এইচএসসি) পর্যায়ের পরীক্ষা দিতে গেলে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ দৌলা তার কক্ষে নিয়ে জোর করে শ্লীলতাহানি করেছিল নুসরাত জাহানের। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল নুসরাত এবং তার পরিবার। নুসরাতের মা বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। পুলিশ ওই ধর্ষক প্রিন্সিপালকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিয়েছিল। 

অন্যদিকে  নুসরাত এবং তার পরিবারের ওপর শুরু হয়েছিল মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ। আগে থেকে ক্ষমতাবান প্রিন্সিপালের পক্ষে ক্ষমতাসীন দলের নেতাসহ একটি রাজনৈতিক চক্র তৎপর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাদের প্রচন্ড- চাপের কাছেও নতি স্বীকার করেনি নুসরাতের পরিবার। এরই প্রতিশোধ নিয়েছে প্রিন্সিপালের লোকজন। ৬ এপ্রিল আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দেয়ার জন্য সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে যাওয়ার পর মিথ্যা কথা বলে নুসরাতকে মাদরাসা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করতে থাকা চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত শেষবারের মতো মামলা প্রত্যাহার করতে বলে। কিন্তু আবারও অস্বীকৃতি জানিয়েছে নুসরাত। এরপরই দুর্বৃত্তরা নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছে নুসরাত। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেয়া হলেও নুসরাতের শরীরের ৮৫ ভাগ পুড়ে গেছে। 

পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকরাও চেষ্টা করেছেন যথেষ্ট। কিন্তু শরীর এত বেশি মারাত্মকভাবে পুড়ে ঝলসে গিয়েছিল যে নুসরাতকে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিলেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য নুসরাতকে সিঙ্গাপুরের কোনো হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যালেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী চিকিৎসাও চালানো হচ্ছিল। কিন্তু বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি। নুসরাতের মৃত্যু ঘটেছে বুধবার রাতে। পাঁচদিন ধরে অনেক কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করার পর হেরে গেছে নুসরাত। অনাকাক্সিক্ষত ও অতি বেদনাদায়ক অবসান ঘটেছে এক মাদরাসা ছাত্রীর অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জীবনের। 

নুসরাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করার পাশাপাশি আমরা তীব্র নিন্দাও জানাই। কারণ, কোনো বিচারেই একে স্বাভাবিক মৃত্যু বলার সুযোগ নেই। নুসরাতকে আসলে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর সবকিছুর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ দৌলা। বাস্তবে ভয়ংকর এবং অমার্জনীয় অপরাধ করেছে শিক্ষক নামের এই জঘন্য ব্যক্তিটি। কোরআন ও হাদিসসহ ইসলামী শিক্ষার প্রতিষ্ঠান মাদরাসার ভেতরে প্রথমে সে আলিম পর্যায়ের একজন ছাত্রীকে নিজের কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেছে এবং তারপর মামলা প্রত্যাহার করার জন্য নুসরাতের পরিবার সদস্যদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। নুসরাত এবং তার পরিবার সদস্যরা সম্মত না হওয়ায় সবশেষে ওই প্রিন্সিপাল তার পোষা দুর্বৃত্তদের দিয়ে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়েছে। এর ফলেই মৃত্যু ঘটেছে নুসরাতের। মৃত্যুর আগে তাকে যে কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

আমরা মনে করি, ধর্ষক ও ঘাতক প্রিন্সিপালকে এবং তার সহযোগী প্রতিটি দুর্বৃত্তকে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি দেয়া দরকার। সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ কতিপয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রিন্সিপালের পক্ষে ভূমিকা পালনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বলেই এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে এবং তৎপর থাকতে হবে, যাতে চার্জশিট দায়ের থেকে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করা ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই প্রধান আসামী প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ দৌলাসহ অভিযুক্তদের কেউই আইনের ফাঁক গলিয়ে পার না পেতে পারে। আমরা আশা করতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই মামলার বিষয়ে লক্ষ্য রাখবেন। আমাদের মতে বিচার শেষ হওয়া দরকার দ্রুততার সঙ্গে এবং অপরাধীদের প্রত্যেককে এমন কঠোর শাস্তি দেয়া দরকার, যাতে আর কোনো মানুষের পক্ষে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘৃণ্য ও ভয়ংকর অপরাধে জড়িত হওয়ার কথা কল্পনা করাই সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ