মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শবে মিরাজের কথা

এইচ এম আব্দুর রহিম : বিশ্ব নবী ও মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা:) জীবনে মিরাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নবুয়ত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১২ বছর কুরাইশদের বাধাবিপত্তির মোকাবেলায় মহান আল্লাহর বিধান প্রচার ও প্রসার ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছালেন চারদিকে অসত্যের ধারক বাহকরা হিংস্রতার চরম আঘাত  হানতে প্রস্তÍুত। সাহায্যকারী মানুষের মধ্য থেকে প্রাণপ্রিয় হযরত খাদিজা (রা:) ও চাচা আবু তালিব লোকান্তরিত হলো। অসত্যের কোপানলে মক্কাভূমি তায়েফ থেকে নিদারুণ আশাহত হয়ে ফিরে এসে মানসিক দিক দিয়ে  চরম বিপর্যস্ত হয়ে এমন এক সঙ্কটকালে পড়লেন বিশ্ব নবী। অবিলন্বে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের বুকে আগত সব মানুষের উপর মহান আল্লাহর বিধান কার্যকরি করার বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সর্বোপরি সময় ও কালের ঊধের্¦ উঠে সব সৃষ্ট বস্তুু তার প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি, সৃষ্টি জগতের গোপন রহস্য অবলোকন ও মনোবল দৃঢ় করার নিমিত্তে মহান আল্লাহর প্রত্যাশা লাভের জন্য রসুল (সা:) হিযরতের এক বছর আগে ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতে সশরীরে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ধন্য হয়েছিলেন জাগতিক হিসেবে রসুলুল্লাহ (সা:) মিরাজ ২৭ বছর সমপরিমাণ সময় ।
সুরা বনি ইসরাঈলে এক ইসরা বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সূরা নাজমের মধ্যে এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ইসরা অকাট্য দলিল হিসাবে অভিহিত করা করা হয়েছে। আল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে তার বান্দাহকে (মহানবী সা.)কে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন এবং তাকে নিজের কিছু নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন অন্তত এতটুকু কথা দ্বিধাহীনচিত্তে নিঃসঙ্কোচে মেনে নেয়া এবং বিশ্বাস করা পবিত্র কুরআন ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসের অনিবার্য দাবি ।
মূল ঘটনা : উম্মুল মুমেনিন হযরত খাদিজা (রা:) এর ইন্তিকালের পরে এবং আকাবার শপথের আগে মিরাজের ঘটনা ঘটে। সুনির্দিষ্ট সালের ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ঘটনাটি হিজরতের এক বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে (২৬ তারিখ দিবাগত রাতে) সংঘটিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম ও ঐতিহাসিকরা একমত। এ মহান রাতে পরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাহ ও রাসুলকে তার একান্ত সান্নিধ্যে নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন, তাকে বেহেশত-দোজখসহ অসংখ্য নিদর্শন দেখালেন, তাঁর সাথে একান্তে কথা বললেন, তাঁর অন্তর নূর প্রজ্ঞা ও হিকমতে ভরে দিলেন, মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে তাঁকে পাচ ওয়াক্ত নামায দিলেন এবং সুরা বাকারার তিন আয়াত হাদিয়া প্রদান করলেন।
ইসরার বিবরণ : মিরাজের ঘটনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন  হযরত জিব্রাইল (আ:) ও মিকাঈল (আ:)। তারা ওই মহান রাতে উম্মেহানির ঘরে গভীর রাতে নিদ্রিত মহানবী (সা.) কে পবিত্র কাবা চত্বরে নিয়ে গেলেন। সেখানে তারা মহানবী (সা.)কে মহাভ্রমণের উপযোগী করার লক্ষ্যে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় সিনা চাক করলেন। এর পর তারা তাকে দ্রুতগামী বাহনে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে গেলেন। সেখানে মহা নবী (সা.)অনেক নবীর নামাযের জামায়াতে ইমামতি করলেন। সবাই কে সালাম করে এবার তিনি বোরাকে বা বিশেষ চলমান সিঁড়িতে আরোহন করে বায়তুল মামুরসহ  ফেরেশতাদের কেবলাসহ অনেক কুদরতের নিদর্শন দেখে  সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হলেন। মহান আল্লাহ তার বান্দাকে যা বলার তা তার বান্দাকে বললেন। যা দেখার তা দেখালেন,যা দেওয়ার তা দিলেন। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ সম্মান,আল্লাহর পরম ভালবাসা. প্রভুর জন্য ত্যাগের অনুভুতি, হিজরতের পর একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের হিম্মৎ ও  যোগ্যতা, বান্দাহদের কল্যাণার্থে পাঁচ ওয়াক্ত নামায এবং উম্মাতি মুহাম্মাদির জন্য মহান আল্লাহর করুণা সংবলিত বাণী সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত নিয়ে মহানবী (সা.)আল্লাহর নির্ধারিত উপায়ে সেই মহান রাতে ফিরে এলেন পৃথিবীতে। মিরাজের ঘটনায় আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলোÑ “তোমার প্রভু হুকুম করেছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ইবাদত করবে না । অর্থাৎ ইবাদত হবে একমাত্র  আল্লাহ তায়ালা আদেশে নিষেধের ভিত্তিতে জীবন কাটানোর নাম হলো ইবাদত” । যিনি আল্লাহ তায়ালা আদেশ নিষেধের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করে তাঁকে আবদ বা আবেদ বলা হয়। শুধু নামায়, রোযা, হজ্জ্ব  ও যাকাত ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক আমল কে ইবাদত বলা হয় না। আর ইবাদত হল জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার নাম। যার কারণে সূর্যোদয়ের সময় নামায পড়লে  সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়। ঈদের দিন রোযা রাখলে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়। ঈদের দিন রোযা রাখলে সওয়াব হয় না । কেননা ঐ সময় নামায রোযার ব্যাপারে আল্লাহতায়ালার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাহলে বুঝা গেল নামায রোযা তখন ইবাদত হবে যখন ও গুলোকে আল্লাহর কথার আলোকে আদায় করা হয়। এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথানত করা,প্রণাম করা,কবর পূজা করা,আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু চাওয়া এবং তার উপর তওয়াক্কুল করা ইবাদতের সম্পূর্ণ বিপরীত । নামায হল মিরাজের অন্যতম উপঢৌকন। নামায হল এমন এক ইবাদত তিনি মিরাজের রাত্রিতে কথোপকথোনের মাধ্যমে এ উম্মতের উপর ফরজ করেছেন। নামায শুধু ইবাদতের নাম নয় বরং ব্যক্তির শারীরিক মানষিক সুস্থতার একমাত্র ফসল । নামাযে অনেক ধরনের ব্যায়াম নিহিত। যারা বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তারা নিয়মিত নামায আদায় করে দেখুন। সুস্থ থাকতে পারেন। যে পরিবারে শান্তি নেই, সে সব পরিবারে নামায আদায়েন মাধ্যমে শান্তি আসতে পারে, ব্যবসায় উন্নতি হবে মান সম্মান,মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। যারা বেকার তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। নামায হল কাফের মুমিনের মধ্যে একমাত্র পার্থক্যকারী। দ্বীনের মধ্যে নামায হল দেহের মাথার মত। মাথা বিহীন মানুষকে যেমন চেনা যায় না নামাযবিহীন মানুষকে রসুলের উম্মত হিসেবে চেনা যায় না । এমন কি নামায বিহীন মানুষকে রসুল (সা.) উম্মত হিসেবে চিনবেন না। নামায হল  বেহেশতের চাবি। সুতারাং নামাযের ব্যাপারে সর্তক অবলন্বন করা অত্যাধিক জরুরী। দ্বিতীয় শিক্ষা পিতা মাতার সাথে সদাচারণ করা। আল্লাহ তায়ালার পরে পিতা মাতার হক। পবিত্র কোরআনের অনেক জায়গায় আল্লাহর ইবাদতের পর পিতা মাতার সাথে সদাচরণ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার ইবাদত আর পিতা মাতার সাথে সদাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পিতা মাতার খেদমত না করে নামায, রোযা হজ্জ্ব যাকাতের মত ইবাদত করে আল্লাহর জান্নাতে যাওয়া যাবে না। যারা পিতা মাতাকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে জান্নাত ক্রয় করতে পারল না রসুল সা. তাদের কে তিরষ্কার করেছেন। পিতা মাতার অসন্তোষ ধ্বংসের জন্য যথেষ্ঠ । কোন সন্তানের উপর পিতা মাতা অসস্তষ্ট থাকলে সে কখনো কামিয়াবী হতে পারে না। ৩নং শিক্ষা: আত্মীয়-স্বজন,মিসকীন,পথিকের হক বুঝিয়ে দেয়া। ৪নং শিক্ষা:- অপব্যয় না করা, অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই। ৫নং শিক্ষা:-অভাবী কে কিছু দিতে না পারলে র্দুব্যবহার না করা। ৬নং শিক্ষা:- দানশীল আল্লাহর নিকটবর্তী,জান্নাতের নিকটবর্তী,মানুষের নিকটবর্তী। ৭নং শিক্ষা দরিদ্রের আশঙ্কায় সন্তান হত্যা না করা। ৮নং শিক্ষা:-যিনা ব্যাভিচার না করা । ৯নং শিক্ষা:-কোন ব্যাক্তি কে হত্যা না করা । ১০নং শিক্ষা:-এতিমের ধন সম্পদ ভক্ষন না করা। ১১নং শিক্ষা:-ওয়াদা পূরণ করা। ১২নং শিক্ষা:-এছাড়া ওজনে কম  না দেওয়া। ১৩নং শিক্ষা:-তোমাদের যে বিষয়ে তোমা জ্ঞান নেই সে বিষয়ে তর্ক না করা। ১৪ নং শিক্ষা:-অহঙ্কারের ভরে জমিনে না চলা। ১৫নং শিক্ষা:-সুদ ঘুষ পরিহার করে চলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ