শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

সময় ও জীবনের বিনিময় জান্নাত

মাওলানা আবুল কাসেম সিকদার : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ঈমানদারদের কে পুনরায় ঈমান আনার জন্য বলার তাৎপর্য হলো মুখে মুখে শুধু ঈমানের দাবিকেই যথেষ্ঠ মনে করা ঠিক হবে না মূল পুঁজি হলো ‘ঈমান ও জিহাদ’ তাই দুর্বল ঈমান নিয়ে আল্লাহর ঘোষিত ব্যবসা করা কোন মুসলমানের পক্ষেই সম্ভব নয়। অতএব মজবুত ঈমান আনার শর্ত আরোপ করেছেন। কারণ যে জিনিস আল্লাহর কেনা এবং আমাদের কাছে মাত্র ‘আমানত’ হিসেবে রক্ষিত চাওয়া মাত্রই তাঁর পথে ব্যয় করতে টালবাহানা করা কোন মামুলী অপরাধ নয় এবং নিকৃষ্ট ধরনের খেয়ানত ও দুস্কৃতির শামিল। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো: এক ব্যক্তির ওপর আল্লাহ তায়ারা কতিপয় আমানত ন্যস্ত রেখেছেন, যাতে করে তাঁর আনুগত্যের পথে কোন বাধার সৃষ্টি হলে সম্ভাব্য সফল উপায়ে সে তা দূর করতে পারে। কিন্তু বাধার সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও লোকটি উক্ত ‘আমানত’ প্রয়োগ করে তাকে দূর করার পরিবর্তে বাধার অজুহাত তুলে সেই নির্দেশ থেকেই নিজেকে দায়মুক্ত বলে ঘোষণা করছে এবং পরম নিশ্চিন্ততার সাথে উক্ত ‘আমানত’গুলোকে বলপূর্বক আপন প্রবৃত্তির সেবায় নিয়োজিত করছে। এমন ব্যক্তি নিজের প্রতি কত বড় জুলুম করে চলছে কল্পনাও করা যায় না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে এই কেনা বেচার চুক্তি সম্পাদন করে সে মুমিন। ঈমান আসলে এই কেনা-বেচার অপর নাম। আর যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে অথবা অঙ্গীকার করার পরও এমন আচরণ করবে যাতে চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায় সে কাফের। আসলে এই চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে চলার নামই কুফরী। যেদিন থেকে সে ঈমানের স্বীকৃতি ঘোষণা করছে, সেদিনই সে এই জিনিসগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির বিনিময়ে তাঁর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
বাইয়াত: অনন্ত জীবন লাভের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন: ‘বায়আত’ ‘বায়উন’ শব্দ তেকে উদ্ভুত, যার অর্থ বিক্রয় করা আর শরীয়তের পরিভাষায় নিজের সত্ত্বাকে জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালার হাতে সোর্পদ করাকে বায়আত বলে। এখানে নিজের সত্তা হলো পণ্য আর জান্নাত হলো এর মূল্য। মানুষ বিক্রেতা এবং আল্লাহ তায়ালা ক্রেতা। সমস্ত জ্ঞানীদের নিকট এটা গ্রহণযোগ্য যে, বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর বিক্রয়কৃত মাল বিক্রেতার অধিকার থেকে ক্রেতার অধিকারে চলে যায়। ক্রেতাই এর সমস্ত ভোগের অধিকার লাভ করে। অনরূপভাবে মুমিন ‘বায়আত’ করার পর আপন আত্মার নিজের মালিক থাকে না। এ জন্যে মুমিনের উচিত যে, নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজের জীবনের কোন কিছুই অপব্যয় না করা। কিন্তু এ লেনদেন সরাসরি আল্লাহ তায়ালার সাথে হয় না, বরং নবী (আ.) সাহাবায়ে কিরাম (রা.) যখন নবী করীম (স.) এর হাতে বায়আত হন, তখন প্রকৃত বায়আত আল্লাহ তায়ালার সাথে হয়েছে; আর রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন উভয়ের মধ্যে উকিল ও মধ্যস্থতাকারী যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যারা তোমার হাতে বায়আত করে। তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।’ (সূরা ফাতহ : ১০)
সহীহ বুখারীতে হযরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কে আছো, যে তার দু’চোয়ালের মধ্যবর্তী ও দু’পায়ের মধ্যবর্তী স্থানের যিম্মাদার হবে, অর্থাৎ জিহবা ও লজ্জা স্থানের হিফাযতের যিম্মা নেবে, আমি হবো তার জান্নাতের যিম্মাদার।” এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেকে মূল্য অর্থাৎ জান্নাতের যামিনদার আখ্যায়িত করেছেন যে, যদি ঈমানদার গণ ঐ সবের যামিন ও যিম্মাদারী নেয়, জিহব্বা ও লজ্জাস্থানের কোন ব্যয় আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার বিরুদ্ধে না করে, যা আমাদের বিক্রয়কৃত পণ্য, তাহলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিনিময় অর্থাৎ মূল্য জান্নাত নিয়ে দেয়ার তত্ত্বাবধায়ক ও যামিন দার হবেন। এ হাদীসে ‘ইয়াদ্বমানু’ এবং ‘আদ্বমানু’ শব্দ দ্বারা এ বিক্রির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে এ জন্যে যে যামিন এবং তত্ত্বাবধান তো বিক্রির ক্ষেত্রেই হয়’ বিক্রিকৃত দ্রব্যে যদি কোন দোষ বের হয়, তাহলে এ দোষের কারণে ক্রেতা ওই দ্রব্যে ক্রয়ের চুক্তি বাতিল করার অধিকারী হয়ে যায়। কিন্তু ক্রেতা যদি বিক্রেয় দ্রব্যের দোষ দেখেও বলে, আমি ক্রয়ে সম্মত আছি, তখন তার বাতিল করার অধিকার নষ্ট হয়ে যায় এবং বিক্রি পূর্ণ হয়ে যায়। ক্রেতার পক্ষ থেকে ক্রয় বাতিল করার সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট থাকে না। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) যখন বৃক্ষের নীচে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্র হাতে বায়আত করলেন, তখন আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করলেন ‘আল্লাহ বলেন, ‘লাক্বদ রাদিয়াল্লাহু আনিলমু’মিনীন ইজ ইউবায়িউনাকা তাহতাশ্ শাজারাতি’ অর্থ: ‘আল্লাহ তো মুমিনগনের উপর সন্তুষ্ট হলেন যখন তারা বৃক্ষের তলে তোমার কাছে বায়আত গ্রহণ করল...।’ (সূরা ফাতহ : ১৮) এতে আল্লাহ তায়ালা তার ক্রয় বাতিলের অধিকার নাকচ করে দিরেন। এবং এটা প্রকাশ করে দিলেন যে, আসহাবগণ আল্লাহর সাথে যে বিক্রির কারবার করেছেন, তা কখনো বাতিল হবে না।
আল্লাহ তায়ালা তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর ক্রয় বাতিলের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিলেন কিন্তু সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ও ‘আমরা ও আল্লাহতে সন্তুষ্ট’ বলে নিজেদের ইচ্ছাকেও বাতিল করে দিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট।’ (সূরা বাইয়্যেনাহ:৮) যদিও আল্লাহ তায়ারার পক্ষ থেকে কোন দোষের সম্ভাবনা নেই। তবুও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) আমরা সন্তুষ্ট বলে বাতিলের ক্ষীন সম্ভাবনাকেও দূর করে দিলেন; উদ্দেশ্য এই যে উভয় পক্ষ আপন আপন সন্তুষ্টি ও আগ্রহ প্রকাশ করে স্বস্ব ইচ্ছাকে নাকচ করে দেন, ফলে বিক্রি পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেল, সাহাবায়ে কিরাম (রা.) নিজেদের আত্মাকে আল্লাহ তায়ালার হাওলায় সোর্পদ করে দেন।
আল্লাহর ওয়াদার প্রেক্ষিতে তাদের আত্মার মুল্য (জান্নাত) আল্লাহ কর্তৃক প্রদান আবশ্যিক হয়ে গেল। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) ছাড়া আর সবার লেনদেন বিপদের মধ্যে আছে। জানা নেই যে, কার কার বিক্রয়কৃত মালে দোষের ভিত্তিতে ক্রয় বাতিল করে দেয়া হয়। আর অনেক লোক তো পৃথিবীতেই আল্লাহ তায়ালা থেকে মাল ফেরত নিয়ে বসেছে যেমন জনৈক বেদুইন রাসূলুল্লাহ (সা.) কে এসে বলল, ‘আক্বিল্লানী বায়আতী’ আমার বায়আত ফিরিয়ে নিন’। ফকীহগণের দৃষ্টিতে বিক্রয়ে অস্বীকৃতি (ক্রেতা-বিক্রেতা) উভয় পক্ষের জন্য নতুন বিক্রি হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে যখন কোন দুর্ভাগা আল্লাহ তায়ালার সাথে বিক্রয়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে, তখন তারও আল্লাহর মধ্যকার চুক্তি তো বাতিল হয়ে যায় এবং তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ শয়তানের জন্য তা নতুন বিক্রি হয়। ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর সিদ্ধান্ত হলো ‘লা রিবা বাইনাল মাওলা ওয়া আবাদিহি’ ‘দাস এবং প্রবুর মধ্যে সুদ নেই’। এ জন্যে যে, দাসের নিকট যা কিছু আছে, এর সব কিছুই তো মালিকেরই অধিকারভুক্ত। আমরা যেহেতু দাসানুদাস, শেষ পর্যন্ত ঐ মহা মহীম আল্লাহ তায়ালারই দাস, আর এমনই দাস যে কোনক্রমেই তার থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভবই নয়। আর না আলহামদুলিল্লাহ, তার দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাই। এ জন্যে মহামহীম আল্রাহ তায়ালা আমাদের একটা নেকীতে কমপক্ষে দ্বিগুণ লাভ দিয়ে থাকেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭৬) আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ হচ্ছে আল্লাহর সাথে ব্যবসা। ব্যবসায় যেমন দিন রাত ২৪ ঘণ্টা মনোনিবেশ থাকে তেমনি এ ব্যবসার মধ্যে মানুষ ডুবে থাকবে ‘উলিল আমর’ আদেশ দিবে ও পালন করবে। আদেশ মানা ফরয, উপদেশ না মানলে সমস্যা নেই।
“তিনি মুমিনদের জান ও মাল খরিদ করে নিয়েছেন,’ বাইআত মানে মুমিনদের সময়ও সম্পদ ‘আল্লাহর মর্জিমত কাজে লাগাবার এবং নিজেদের খেয়াল খুশীমত ব্যবহার না করার ‘চুক্তিপত্র’। সূরা তাওয়াবায় ১১১ ও ১১২ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে টেন্ডার/ বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত আরোপ করেছেন, শর্তাবলী : (১) মালিককে মালিক হিসেবে মর্যাদা দেয়া (৭:১৭২), (২) নগদ পাওয়ার ইচ্ছা না থাকা। (৬২:১০), (৩) ইসলামের নামে তরীকা/ প্রথা চালু না করা। (৪৫:১৮), (৪) সকল মুমিন একই চুক্তির অধীন। (৯:১১১) এ চুক্তিতে আমরা বিশাল ও অনন্ত জান্নাতের উত্তরাধিকারী হওয়ার কন্ট্রাকটর বা ঠিকাদার। দুনিয়ার কোন কাজে ঠিকাদারীতে শর্ত না মেনে ড্রপিং করলে যেমন বিল পাওয়া যায় না তেমনি আল্লাহর সাথে দেয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে কাক্সিক্ষত জান্নাত পাওয়া যাবে না। তাই আমরা কখনোই অঙ্গীকার/ শপথ ভঙ্গ করব না। এ জন্য আমাদের আনন্দ করা উচিত যে এ পৃথিবীতে আমরা বিশাল অট্টালিকা জান্নাত নির্মাণের কন্ট্রাকটর। আর জান্নাতের আয়তন হলো দশ-বিশটি পৃথিবীর সমান, এর চেয়েও বিস্তৃত। যার একটি ইট স্বর্ণের এবং একটি ইট রৌপ্যের চিকমিক ও ঝিমমিক করবে, যার গাঁথুনী হবে মেশক আম্বর, জাফরান ও কস্তুরী। তাই তো ‘মুমিনগণ দুনিয়ার সুখ সুবিধা আখিরাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে’। (সূরা নিসা : ৭৪) ‘মাথানত করে আত্মসর্ম্পণের মাধ্যমে বিক্রয় পণ্য পেশ করতে হবে।’ (সূরা যুমার: ৫৪) ‘বিক্রয় পণ্য দিতে গড়িমসি করলে নিজ আত্মার উপর আক্ষেপ ও দুঃশাসনের কবলে পড়তে হবে’। (সূরা যুমার : ৪৬)। কারণ সঠিক সময়ের মধ্যেই আমলনামা বন্ধ বা টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হবে। (সূরা যুমার : ৫৮)
পরিশেষে, সকল প্রশংসা আল্লাহ পাকের জন্য, যিনি মুমিন বান্দাদের জান ও মাল লাভ করার জন্য ক্রয় করেন নি। বরং এই বায়আতের উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে তার বান্দাদের থেকে সাহসিকতাও দানশীলতা প্রকাশ পায় এবং মূল্য ও পণ্য উভয়টিই ফেরত দেয়া যায়। সেই মহান আল্লাহ অতীব পবিত্র, যার দয়ার সাগর এত বিশাল যে, সৃষ্টির জ্ঞান দ্বারা তা উপলব্ধি করা অসম্ভব। তিনি মুমিন বান্দার পণ্য তাকেই ফেরত দেন, মূল্যও ফেরত দেন, চুক্তি পরিপূর্ণ করার তাওফিকও দেন, পণ্যের দোষ থাকলে কিনে নেন, এবং ভালোভাবে মূল্য পরিশোধ করেন। বান্দার নাফসকে নিজের মালের বিনিময়ে ক্রয় করেন অতপর পণ্য ও মূল্য উভয়টিই ফেরত দিয়ে বান্দার এবং চুক্তিপত্রের প্রশংসা করেন অথচ তাঁর তাওফিকও ইচ্ছাতেই চুক্তি অনুযায়ী বান্দার আমল সংঘটিত হয়। আল্লাহ তায়ালা এবং জান্নাতের দিকে আহ্বানকারী মুহাম্মাদ (সা.) গর্বিত আত্মাসমূহ এবং উচ্চ আকাক্সক্ষা পোষণকারীদের কে সজাগ করেছেন। ঈমানের আহ্বানকারী মুহাম্মাদ (সা.) উন্মুক্ত কর্ণের এবং জীবন্ত প্রাণের অধিকারীদেরকে শুনিয়ে দিয়েছেন। এই শ্রবণ থেকেই সৎকর্মশীলদের মঞ্জিলের দিকে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। দারুল কারার তথা জান্নাত তাদের একমাত্র ঠিকানা সেখানে না পৌঁছা পর্যন্ত তাদের সফর চলতেই থাকবে। ইনশাআল্লাহ, আমিন। (সমাপ্ত)
 লেখক : খতিব, বিনাপাড়া জামে মসজিদ, সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় মুফাসসির পরিষদ, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক, ঝালকাঠি, জেলা শাখা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ