বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সভ্যতার ভিতে লেগেছে কাঁপন

১৫ মার্চ শুক্রবার, এক সপ্তাহ আগের এই দিনটি ছিল নিউজিল্যান্ডবাসীসহ বিশ্ববাসীর জন্য এক ঘোরতর অন্ধকার দিন। এক সপ্তাহ পর সেই শুক্রবার দিনটিই আবার সমবেদনা ও সংহতি প্রকাশের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্ন এবং দেশটির শান্তিপ্রিয় জনগণ। ১৫ মার্চ পবিত্র জুমার নামাযের সময় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর ও লিনউড মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন ৫০ জন মুসল্লি। তাদের মধ্যে ২৬ জনকে দাফন করা হয়েছে ২২ মার্চ শুক্রবার। শোকাবহ সেই ঘটনার স্মরণে ২২ মার্চ আল নূর মসজিদকে ঘিরে সমবেত হয়েছিলেন ২০ হাজার মানুষ। এরমধ্যে ছিলেন  পাঁচ হাজার মুসলিম: অন্যরা নানা ধর্মের, জাতের ও বর্ণের। দেশজুড়ে ওড়নায় মাথা ঢেকে মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানান বিভিন্ন ধর্মের নারীরা। হতাহতদের জন্য শোক-সমবেদনা আর সম্মান জানিয়ে পালন করা হয় দুই মিনিটের নীরবতা। আর সবকিছু ছাপিয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্নের ঘোষণায়, ‘নিউজিল্যান্ড আপনাদের সঙ্গে শোকাহত, আমরা অভিন্ন।’
২২ মার্চ শুক্রবারের জুমার নামাযকে সামনে রেখে আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতেই নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ আলনূর মসজিদকে নামাযের জন্য প্রস্তুত করে। আলনূর মসজিদের সামনে জুমার নামাযের আগে প্রায় ২০ মিনিট বক্তৃতা করেন ইমাম গামাল ফাওদা। তিনি বলেন, ‘বন্দুকধারী বিশে^র কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে। আজ একই জায়গা থেকে তাকিয়ে মানুষের ভালবাসা ও সহানুভূতি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের হৃদয় ভেঙেছে, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি। আমরা বেঁচে আছি, আমরা একসঙ্গে আছি। কাউকে আমাদের মধ্যে বিভক্তি আনতে দেব না।’ আর মুসলিমদের প্রতি সংহতির যে দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী আহডার্ন স্থাপন করেছেন, তার প্রশংসা করে ইমাম বলেন, ‘এটি বিশ্ব নেতাদের জন্য একটি শিক্ষা।’
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং সাধারণ মানুষ মুসলমানদের প্রতি যে সহমর্মিতা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন তা আসলেই বিশ্বনেতাদের জন্য শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মসজিদে হামলাকারী সন্ত্রাসী ব্রেনটন টারান্ট এখন রিমান্ডে আছেন। আর ঘটনার পর দেশটিতে সব ধরনের আধাস্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমান সভ্যতার যারা শাসক তাদের অনেকের আচরণই ন্যায়ভিত্তিক কিংবা মানবিক নয়। তাদের দাম্ভিক ও আগ্রাসী আচরণ বর্তমান সভ্যতা সম্পর্কে মানুষের মনে সৃষ্টি করেছে সংশয় ও হতাশা। ওইসব নেতাদের ভুল বার্তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী আহডার্ন-এর বক্তব্য ও আচরণকে আমরা ইতিবাচক ও ব্যতিক্রম বলে মনে করি। বিশ্বনেতারা এ পথের অভিযাত্রী হলেই পৃথিবীর মঙ্গল।
অনুতপ্ত এক শ্বেতাঙ্গ তরুণীর হাতে ব্যানার ‘Muslims are NOT terrorists’. নিউজিল্যান্ডে জুমার দিনে মসজিদে বর্বর সন্ত্রাসী হামলার পর বর্তমান সভ্যতার ভিতে যেন কাঁপন লেগেছে। অনেকেই এখন ন্যায় ও সত্যের পতাকা তুলে ধরতে চাইছেন। চাতুর্য ও মিথ্যার বিজয় মানুষ আর কতকাল চেয়ে চেয়ে দেখবে? মানুষের অন্তরাত্মা বলে তো একটা বিষয় আছে। তাকে তো এক সময় জেগে উঠতেই হয়। মানুষের অন্তরাত্মা জেগে উঠলে মানুষ মানবিক হবে এবং তা হলে আমাদের সমাজ ও সভ্যতা বেঁচে যাবে। তখন আমরা বলতে পারবো, আমাদের সমাজ ও সভ্যতা মানুষের বসবাস উপযোগী হয়ে  উঠছে।
বর্তমান সভ্যতার বড় সংকট ঘৃণা, বিভক্তি ও ইসলামভীতি। গত ২২ মার্চ শুক্রবার তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। জরুরি এই সম্মেলন থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর ইসলামভীতি ছড়ানোর বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসলামভীতি ছড়ানোর জন্য সম্মেলন থেকে দায়ী পশ্চিমা দেশগুলোর নিন্দাও করা হয়। সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ বলেন, পশ্চিমা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকে অবশ্যই নিউজিল্যান্ড হত্যাকান্ডের দায় নিতে হবে। এই হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, পশ্চিমা বিশ্বে বিপজ্জনক একটি জোয়ার বইছে, আর তা হলো ইসলামভীতি ছড়ানো। এছাড়া পাশ্চাত্যের কোনো কোনো কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান নীরবতা পালন করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধমূলক তৎপরতা চালাতে সহায়তা করে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ করে জাওয়াদ জারিফ বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশে প্রবেশে মুসলমানদের বাধা দিচ্ছেন। আর ইসলামী প্রতীক ব্যবহারে বাধা দেওয়ার জন্য তিনি দায়ী করেন ইউরোপকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব ব্যক্তি বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে তারা মুসলমানদের বাকস্বাধীনতা দমন করছে এবং বাকস্বাধীনতার নামে মুসলমানদের সব উপায়ে অপমান-অপদস্ত করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ওপর হামলা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জারিফ।
সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ইসলামভীতি ছড়ানোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মুসলমানরা বর্বর হত্যাকান্ড বরদাশত করতে পারে না। এরদোগান বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমরা ইসলামভীতি ও মুসলিম-বিদ্বেষের মুখে রয়েছি। দায়েশের বিরুদ্ধে যেভাবে লড়াই হয়েছে, ঠিক সেভাবেই উগ্র নাজিবাদীদের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে।’ আমরা মনে করি- সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মবিদ্বেষ সবই মানবতাবিরোধী অপরাধ। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে মানবজাতিকে লড়তে হবে একসাথে।
চাতুর্য ও ছলাকলা দিয়ে প্রকৃত সত্যকে বেশিদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না। ফলে বিশ্ববাসী এখন স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারছে যে, সন্ত্রাস, বর্ণবাদ ও ধর্মবিদ্বেষ বর্তমান সভ্যতার মূল সংকট। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সভ্যতার শাসকদের ফিরে আসতে হবে সত্য, ন্যায় ও মানবতাবাদের পথে। কিন্তু তেমন লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছে না। ন্যায়ের পথে থাকলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন কেমন করে? গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে ২৫ মার্চ সোমবার নথিতে সই করার কথা ছিলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। ওয়াশিংটনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের সময়ই তিনি আগ্রাসী ওই নথিতে সই করেছেন। গত ২৪ মার্চ একথা জানিয়েছেন ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইয়েল কাৎজ। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর সঙ্গে ছয় দিন স্থায়ী এক যুদ্ধের পর ইসরাইল পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি ভূমি ছাড়াও সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত গোলান মালভূমি নিজ দখলে নিয়ে আসে।
এদিকে গত ২৩ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি চিফ ফেডেরিকা মগেরিনির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইইউ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলায় ১৯৬৭ সাল  থেকে দখলকৃত গোলানসহ অঞ্চলটির ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেয় না এবং এর কোনোটিকেই ইসরাইলের অংশ বলে মনে করে না ইইউ।’ উল্লেখ্য যে, ইসরাইল ১৯৮১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গোলানে তাদের বসতি বিস্তৃত করলেও তাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলেনি। মিত্র দেশ আমেরিকাও এ বিষয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তবে গত বছর তেলআবিব থেকে জেরুসালেমে দূতাবাস সরিয়ে আনা ট্রাম্প-প্রশাসনই শেষ পর্যন্ত গোলানে ইসরাইলি দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার পদক্ষেপ নিল।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া, তুরস্কসহ অনেক দেশ। সিরিয়া নিন্দা জানিয়ে বলে, এ অবস্থানের মধ্য দিয়ে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অন্ধ পক্ষপাতিত্ব’ আবারো প্রকাশ পেয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, ‘গোলান সিরিয়ার। এটি আবরদের ভূণ্ড ছিল এবং থাকবে। এ বাস্তবতার কখনোই পরিবর্তন ঘটবে না। সম্ভাব্য সব উপায়ে গোলানের পবিত্র ভূমিকে দখলমুক্ত করার ব্যাপারে সিরিয়া এখন আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ ফলে প্রশ্ন জাগে, ট্রাম্প প্রশাসন পৃথিবীকে কোন দিকে নিয়ে যেতে চায়?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ