বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ধর্মের ঢাক বাজতে শুরু করেছে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু হা-হতোস্মি! নির্বাচনের মাঝপথেই দেখা গেল সে নির্বাচনে কি হাল! চালিয়াতি, জালিয়াতি, মামলা-হামলা, আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, প্রার্থীদের ওপর শারীরিক হামলা, তাদের পুলিশ ও আওয়ামী গুন্ডাদের দিয়ে নিজ ঘরে আবদ্ধ রাখা, জালভোট দিতে পোলিং অফিসারদের বাধ্য করা, ভোট কেন্দ্রের বাইরে ভুয়া লাইন দিয়ে প্রকৃত ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়া, ভোটারদের পুলিশ ও আওয়ামী মাস্তানদের সামনেই ভোট দিতে বাধ্য করা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ওই নির্বাচনে খুব কমসংখ্যক ভোটারই ভোট দিতে পেরেছেন। অধিকাংশই ভোট না দিতে পেরে ফিরে গেছেন। সরকারও তাই চেয়েছিল। দলবাজ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন মিলে সরকারের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলেছে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে ও সুষ্ঠু হয়েছে। তখন এই লোককে বিরোধী দলের অভিযোগ সম্পর্কে বলতে শুনলাম যে, নির্বাচনে যারা হেরে যায়, তারা সব সময় বলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি।
নির্বাচন কমিশন দেখিয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ ভাগের ওপরে ভোট পড়েছে। যার ৮৮ শতাংশ পেয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। আর জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২ আসনই তারা পেয়েছে। বাকি ৮ টি আসন পেয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। অর্থাৎ সরকার, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকে আর নির্বাচন কমিশন মিলে যখন এই রেজাল্ট দিলো, তখন  হতবাক হয়ে গেল সারাবিশ্ব। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় নির্বাচনের আগে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এক জরিপ পরিচালনা করেন। তিনি তার জরিপের ফলাফলে বলেছিলেন যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগ ১৬০ থেকে ২২০টি আসন পাবে। কিন্তু চালিয়াতরা তার জরিপকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ২৯২ টি আসন। এর চেয়ে বড় কৌতুক আর কিছু নেই। নির্বাচন শেষে পুলিশকে নানা রঙ্গ করতে আমরা দেখেছি। বলা হয়েছে, ওই নির্বাচনকে সফল করতে পুলিশকে ‘বিনিদ্র রজনী’ যাপন করতে হয়েছে। অনেক ধকল গেছে তাদের ওপর দিয়ে। তাই পুনরায় পুলিশের মধ্যে উৎসাহ তৈরির জন্য ব্যারাকে ব্যারাকে পুলিশ ভূরিভোজের আয়োজন করেছিল।
প্রথম থেকেই এই নির্বাচন নিয়ে বিবেকের তাড়া অনুভব করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক (পরবর্তীতে আমলা) লেখক মাহবুব তালুকদার। সরকারের ইচ্ছা বাস্তবায়নকারী বিবেকহীন, মেরুদ-হীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা বলেছেন যে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় তিনি খুব খুশি। কিন্তু মাহবুব তালুকদার বললেন, অংশগ্রহণমূলক হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়নি, সে কথা বিরোধী দলের বাইরে প্রথম বলেছে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ। তারা  সরকারের শরিক এবং আওয়ামী লীগের নৈাকা প্রতীক নিয়ে তাদের মইনুদ্দিন খান বাদল মহাজোটের এমপি। তারা বলেছেন, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করা হয়েছে। কিছু অতিউৎসাহী লোক এই কাজ করেছে, যা নির্বাচনি ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলেছে। দলের দুই দিনের কাউন্সিল অধিবেশন শেষে তারা এই অতিউৎসাহী লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। আবার ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননও আগের রাতে ভোটের কথা স্বীকার করেছেন। জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তাহলে রাজনৈতিক ফল কেবল নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। এটা যেমন আমাদের জন্য প্রযোজ্য, তেমনি সরকারি দলের জন্যও তা প্রযোজ্য। নির্বাচনকে তাই যথাযথ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে’। এই সত্যোপলব্ধির জন্য তিনি ধন্যবাদ পেতে পারেন।
৩০ ডিসেম্বর যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছে, তা যে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, সেটা ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করতে শুরু করেন নির্বাচন কমিশনাররা। এরপর একে একে কবিতা খানম, রফিকুল ইসলাম, সাহাদাত হোসেন- সকল কমিশনারই স্বীকার করে নেন যে, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সীল মেরে বাক্স ভরাট করা হয়েছে। তারা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদাও স্বীকার করেছেন যে, নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরাট করে রাখা হয়েছিল। তিনি একথাও বলেছেন যে, গত ১০ মার্চ যে উপজেলা নির্বাচন হয়ে গেল, তাতেও আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। তবে এই আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে রাখার ব্যাপারে তিনি তার চরম অসহায়ত্বও প্রকাশ করেছেন। হুদা সাহেব বলেছেন, ওই আগের রাতে ভোটের জন্য ‘কারা দায়ী, তাদের কি করা যাবে- সেই দীক্ষা-শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা-যোগ্যতা আমাদের নেই। এবং সেভাবে বলারও সুযোগ নেই, কী কারণে হচ্ছে, কাদের জন্য হচ্ছে, কারা দায়ী’। এ কথার অর্থ হচ্ছে, যারা এই কাজটি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন না সিইসি। অথচ দেশের সংবিধান সে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তাদের প্রভূত ক্ষমতা দিয়েছে। তিনি সে ক্ষমতা প্রয়োগেও অপারগ।
এ রকম একটি সময়ে গত ১৩ মার্চ মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৮ প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গত ১৩ মার্চ রিপোর্টটি প্রকাশ করেন। তাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে ৫০ পৃষ্ঠার বর্ণনা দেয়া হয়ছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইনবহির্ভূত বা খেয়াল-খুশিমতো হত্যাকা- ঘটে বাংলাদেশে। এখানে জোরপূর্বক গুম করা হয়। নির্যাতন করা হয়। সরকার বা সরকারের পক্ষে খেয়াল-খুশিমতো বা বেআইনিভাবে নাগরিকদের আটক রাখা হয়। জেলখানাতেও কঠোর বা জীবনের প্রতি হুমকি- এমন পরিবেশ বিরাজমান। আছেন রাজনৈতিক বন্দি। বাংলাদেশে খেয়াল-খুশিমতো বা বেআইনিভাবে মানুষের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা হয়। আরোপ করা হয় সেন্সরশিপ। বন্ধ করে দেয়া হয় ওয়েবসাইট। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জনসভার স্বাধীনতার অধিকারেও রয়েছে অযাচিত হস্তক্ষেপ। আছে বেসরকারি সংগঠন এনজিওবিষয়ক অতিমাত্রায় বিধিনিষেধমূলক কঠোর আইন। আছে তাদের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ। নির্বাচনগুলো কোনোভাবেই খাঁটি অবাধ ও সুষ্ঠু নয়। নিরপেক্ষ ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিকদের অধিকারে আছে বিধিনিষেধ। এছাড়া শিশুশ্রমের সবচেয়ে বাজে কর্মটি ব্যবহার করা হয় বাংলাদেশে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে সরকারের সংসদীয় কাঠামোর কথা উল্লেখ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ একাধারে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসেছে। কিন্তু এই নির্বাচন কোনো বিবেচনাতেই অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। একই সঙ্গে ভোটার ও বিরোধী দলকে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের মতো নানা অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে। যা বিরোধী দল ও তার সমর্থকদের স্বাধীনভাবে প্রচারণা ও সমাবেশে বাধা সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও সঠিক সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশের ভিসা পায়নি। শুধুমাত্র ২২ টি সংস্থা অভ্যন্তরীণভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার ও কারাদন্ড দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। এতে বলা হয় রাজনৈতিক পরিচয়ও অনেক সময় গ্রেফতারের সরস হিসেবে দেখানো হয়। বিএনপি দাবি করেছে, গত বছর তাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির দায়ে পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তাঁকে অভিযুক্ত করার জন্য প্রমাণের অভাব ছিল। তাঁকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এ রায় দেয়া হয়েছে বলে তারা জানান। এরপর তাঁকে আরো একটি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার রায়ের সময় প্রায় ১,৭৮৬ বিএনপি কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। বিএনপির একজন মুখপাত্র হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন যে, তাদের ও জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতায় বাধা দেয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, সাংবাদিকরা হয়রানির ভয়ে সেলফ-সেন্সরশীপের দিকে ঝুঁকছে।  আইনে বলা আছে, ঘৃণামূলক বক্তব্য অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু এর দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। যেসব গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা করে থাকে, তারা নানাভাবে সরকারের নেতিবাচক চাপের মুখে পড়ে। তাছাড়া সাংবাদিকরা নানাভাবে আক্রান্তও হয়। রিপোর্টার উদাউট অর্ডারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছিলেন।
মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আইনের শাসন পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর কার্যকরি নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষায় সরকারের রয়েছে নানা ব্যর্থতা। এর মধ্যে আছে হত্যা, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন, সরকার কর্তৃক অযথা গ্রেফতার, আইন বহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশ, বাক-স্বাধীনতা হরণ, সমকামীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা। বছরজুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সন্ত্রাসবাদ থামাতে নানা অভিযান পরিচালনা করেছে। কিছু কিছু অভিযানে সন্দেহভাজনরা নিহত ও গ্রেফতার হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই এ ধরনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সন্দেহভাজনদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার কথা বলে থাকে। সেখানে তার সতীর্থদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহত হন। সরকার এই ঘটনাগুলোকে বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টার বলে আখ্যায়িত করে থাকে। মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো দাবি করেছে যে, বন্দুকযুদ্ধের অনেক ঘটনাই আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-। দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্টার্স সোসাইটি জানিয়েছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৪০০ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে ৪১৫টি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। প্রতিবেদন দেখা যায়, এর আগের বছরের তুলনায় বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রায় ২৩০ জন মাদক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে আরো ১৭,০০০ জনকে। মানবাধিকার সংস্থা ও সুশীল সমাজ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের দাবি এদের মধ্যে অনেকেই নিরপরাধ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতার অপব্যবহার করে সন্দেহভাজনদের আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন চালায়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার খুব কম পদক্ষেপই গ্রহণ করেছে। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশের কারাগারের ভেতরে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের চিত্রও তুলে ধরা হয়। এখানে নানাবিধ নির্যাতন ও অমানবিক পরিবেশের কারণে গত বছর কারাগারে ৭৪ বন্দির মৃত্যু হয়। মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে আরো বলা হয় যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নামমাত্র স্বাধীন। স্বাধীন বিচারের জন্যই আইন। কিন্তু দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করে। বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে থাকবেÑ ২০১৪ সালে এ সংক্রান্ত সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী পাস করে সংসদ। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট একে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। এতে সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে দ্বন্দ্বে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে পদত্যাগ করতে হয়। এই সরকারের ব্যাপক দুর্নীতিও বিশ্বে কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনে দুর্নীতির দায়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকার ঐ আইনের কার্যকর প্রয়োগ করছে না। ফলে সরকারি কর্মকর্তারা অব্যাহতভাবে দুর্নীতি করছে। এতে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। টিআইবি’র ২০১৮ সালের জরিপ অনুসারে সরকারের ১৮টি বিভাগের মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। এছাড়া অন্য দুর্নীতিগ্রস্ত বিভাগ হলো ইমিগ্রেশন ও পাসপের্ট বিভাগ, বিআরটিএ, বিচার বিভাগ, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, কর ও শুল্ক বিভাগ। গত বছরের ২০ আগস্ট সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি আইন পাস করেছে মন্ত্রিসভা। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সমালোচনা করায় ব্যবসায়ী, সংবাদপত্রের মালিক, বিরোধী দলীয় কর্মী ও সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে দুদককে দিয়ে তদন্ত করানো বা তদন্তের ভয় দেখানো হচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন উদ্দেশ্যপূর্ণ কর্মকান্ড চালানোয় ২০১৭ সালের সুপ্রীম কোর্ট দুদককে তিরস্কার করে।
মার্কিন মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র খানিকটা উন্মোচিত হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার সপ্তাহখানেক নীরবই ছিল। এইচ টি ইমাম বা গওহর রিজভীদের মতো উপদেষ্টারা এখনও চুপ করেই  আছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবুল মোমেন গত সোমবার বলেছেন যে, ঐ রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো ফাইন্ডিংস নেই। অন্যের  বরাতে তৈরি। তাই রিপোর্টটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। রিপোর্টটি বাংলাদেশের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন খুবই ভাল হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন সময় এ কথা বললেন, যখন নির্বাচন কমিশন সচিব ঘোষণা করেছেন যে, আগামী পৌরসভা নির্বাচনে যাতে আগের রাতে সীল মারা না যায়, সে জন্য কেন্দ্রে ব্যালট ও বাক্স পাঠানো হবে সকালে। আর ভোটগ্রহণ হবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। তার কথায়ও প্রমাণ হয় যে, আগের রাতে কী মহামারি আকারে ব্যালট বাক্সে সীল মারা হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ