সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বেকার সমস্যা প্রসঙ্গে

বেকারের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, দেশে বেকার সমস্যা দিন দিন আরো মারাত্মক হচ্ছে। কোনো কোনো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে এমনকি একথা পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে বেকার তথা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটিরও বেশি। শুধু তা-ই নয়, মোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি জানিয়ে এসব রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করে। কিন্তু সাত লাখের বেশি মানুষ কোনো চাকরি বা উপার্জন করার মতো কোনো কাজ পায় না। ফলে প্রতি বছর ১৫ লাখ করে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, একদিকে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাছাড়া আট শতাংশের বেশি হারে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির যে তথ্য শোনানো হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ও সংশয় তো রয়েছেই, পাশাপাশি এ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরির তথা কর্মসংস্থানের সমন্বয় করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ জিডিপির কথিত প্রবৃদ্ধি চাকরির সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না। একই কারণে প্রবৃদ্ধির কথিত হার নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন না যে, সরকার প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সঠিক তথ্য জানাচ্ছে।
তাছাড়া উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার নামে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগই সৃষ্টি হচ্ছে না। তথ্যাভিজ্ঞরা প্রসঙ্গক্রমে ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেলের মতো বিভিন্ন প্রকল্পের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেছেন, এসবের জন্য ব্যয়িত বিপুল অর্থের কিছু অংশও যদি শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে একদিকে অসংখ্য মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হতো, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও উৎপাদনসহ রফতানি আয়ের দিক থেকে দেশও অনেক এগিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার শিল্প-কারখানা স্থাপনে কোনো বিনিয়োগ করছে না। সরকার বরং এমন বিভিন্ন খাতেই বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, যেগুলোর মাধ্যমে স্থায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কমে আসার পরিবর্তে বেকার সমস্যাও ক্রমাগত আরো মারাত্মক হচ্ছে। বেড়ে চলেছে বেকার মানুষের সংখ্যা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে সব মিলিয়েই দেশে বেকার সমস্যা অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর মূল কারণ আসলে বিনিয়োগ না হওয়া। বিনিয়োগ যদি বেড়ে থাকে তাহলে বলা যাবে সংখ্যা যতো কম আর বেশিই হোক না কেন, চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বাস্তব অবস্থা কিন্তু মোটেও আশান্বিত হওয়ার মতো নয়। কারণ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশে মারাত্মক স্থবিরতা বিরাজ করছে। দেশীয় পুঁজিপতি বা শিল্প মালিকরা কোনো কারখানায় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে দিচ্ছেন। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণখেলাপিদের সংখ্যা।
ওদিকে দেশে দেশীয় পুঁজিপতি ও শিল্পপতিরা বিনিয়োগ করছেন না বলে বিদেশিরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। বাস্তবে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না বললেই চলে। স্বল্প সংখ্যক যারা এসেছেন বা বিনিয়োগ করেছেন তাদের সকলকেও জমি কেনা ও জমি রেজিস্ট্রেশন করার এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার মতো প্রতিটি বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়েছে। এখনো তারা নেতিবাচক অবস্থার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। সে কারণে অনেক বিদেশি এমনকি বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন করিয়েও ফিরে গেছেন। তারা বাংলাদেশের জন্য নিয়ে আসা অর্থ দিয়ে প্রতিবেশি ভারতে বা এশিয়ার অন্য কোনো দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছেন। একই কারণে চাকরিও পেয়েছে ভারতসহ ওইসব দেশের লোকজন। অন্যদিকে দেশে বেকারের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে চলেছে।
আমরা মনে করি, লোক দেখানো উন্নয়নের নামে কমিশন বাণিজ্যের পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরিবর্তে সরকারের উচিত এমন সব খাতের বিষয়ে তৎপর হওয়া, যেগুলো দেশে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। পাশাপাশি সৃষ্টি করবে চাকরির সুযোগও। দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়লে এবং উৎপাদনসহ বাধাহীন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পেলেই বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা এগিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা চাই দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ুক, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠুক এবং সেগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম হোক বাধাহীন। সব মিলিয়ে তেমন অবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারের সংখ্যা নিয়েও তখন আর অসত্য যেমন বলতে হবে না তেমনি ভীত ও উদ্বিগ্নও হতে হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ