বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ বর্জন

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : স্বাধীন হিসাবে একজন মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে যদি তার সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রেরিত জীবনবিধানের আলোকে আলোকিত করতে না পারে তবে অন্য স্বাধীনতার মূল্য তেমন থাকতে পারে বলে মনে হয় না। কারণ তাকে তৈরী করা হয়েছে বা এই বিশ্বে প্রেরণের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে তার সৃষ্টিকর্তার বিধি বিধান তার জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। অন্যথায় মানব রচিত বা অন্য মানুষের বাতলানো পথে যদি সে চলে বা জীবন যাপন করে তবে তাকে বিশাল বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। তার জীবনটাই তখন চরম ভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য হবে। তাই মানুষ তো স্বাধীন হচ্ছে স্বাধীনতার স্বাদ সর্বাংশে নির্বিচারে ভোগ ব্যবহার করছে। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত সাধ কি তার পূরণ হচ্ছে? যদি না হয় সবেই গোল্লায় যাওয়ার উপক্রম হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ একজন মানুষকে তার পার্থিব এই জীবনের সকল কর্মকান্ডের হিসেব নিকেশ একদিন দিতেই হবে। এর থেকে বাঁচার অন্য কোন পথ উন্মুক্ত নেই। আমরা যারা পরকালীন জীবন সংঘটিত হবার সম্ভাব্যতায় প্রগাঢ়ভাবে বিশ্বাসী তাদের সম্মুখে শুধু মহা সংকট অপেক্ষা করে আছে।
কারণ কেয়ামতের দিনে প্রথমে প্রত্যেক মানুষকেই পাঁচটি বিশেষ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হবে।
১। মানুষকে একটা মূল্যবান জীবন দেয়া হয়েছে। সেই জীবনটাকে সে কিভাবে ভোগ ব্যবহার করেছে?
২। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কালটা হচ্ছে যৌবন কাল- সেই যৌবনটাকেই সে কি ভাবে ব্যয় করেছে।
৩। মানুষকে যে আকল বা বিবেক বুদ্ধি প্রদান করা হয়েছে সেটা সে কি কর্মে ব্যবহার করেছে?
৪। কিভাবে সে আয় করেছে?
৫। কিভাবে এবং কোথায় ব্যয় করেছে?
এমন মৌলিক জিজ্ঞাসার সঠিক জবাব নির্ভর করে তার এই পার্থিব জীবনে তার প্রভুর জীবন বিধান প্রয়োগের  স্বাধীনতা কতটুকু ভোগ ব্যবহার করেছে  তার উপর।
সুতরাং পার্থিব এই জীবনে স্বাধীনভাবে বাধা বিপত্তি ব্যতিরেকে তার সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধ তার জীবনে প্রয়োগ ও ব্যবহার কতটুকু করেছে সে সব ব্যপার সেপার যে কতোবড় আকারে সেইদিন দেখা দিবে-তা ভাবলেও গা শিউরে উঠে।
অথচ সে স্বাধীনতা থাক বহুদূরে সেই অধিকারইতো স্বীকার করা হচ্ছে না। বরং ওসবকে ‘সেকেলে’ এবং ‘মৌলবাদী’ ধ্যান ধারণা বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। এবং মানুষকে বাধ্য করা হয় বাতিল শক্তির বাতলানো পথ ও মত গ্রহন করে ফূর্তি ফার্তির জীবন উপভোগ করবার উপদেশ প্রদান নয় শুধু রীতিমত বাধ্য করার হয়। এবং এই বাধ্য বাধকতার মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে মানুষের গোটা জীবনকেই। এভাবেই বাধ্য বাধকতার নাম দেওয়া হচ্ছে স্বাধীনতার সাধ এবং স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের নির্ভেজাল কার্যকরি পদক্ষেপ বলে। এভাবেই যদি মানুষের জীবনকেই বাধ্যবাধকতার শৃংখলে বেধে ফেলা হয়- তবে মানুষের জীবনের স্বাধীনতা আর বাকী থাকলো কোথায়? অপ্রকৃত স্বাধীনতাতো মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাড়াচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
অথচ সে কিংভুতকিমাকার স্বাধীনতাই মানুষ গ্রহন করতে বাধ্য হচ্ছে এবং বাধ্য করা হচ্ছে। সমস্ত জগৎ যেনো এ পথেই অগ্রসরমান এবং এভাবেই সমগ্র বিশ্ব এক জোটে একীভূত হয়ে সকল মিথ্যামেকীর মহাগুরু ইবলিসের সাগরেদ হতে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। হায় মানুষ, মানবতা এবং স্বাধীনতা কোথায় তোমার দেশ, তোমার এইকী বলার শেষ? স্বাধীনতা স্বাধীনতা- এই স্বাধীনতার জন্য মানুষ তার জীবন ও জীবিকা উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে না। টনে টনে রক্ত ঝরে এ স্বাধীনতার কারনে। অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরে মানুষ স্বাধীনতা লাভ করেছেÑ বিশ্বের নানা অঞ্চল ও দেশ মহাদেশে। কিন্তু শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য এত বিসর্জন। এত আত্মাহুতি- তারপরেও নৈতিক ও আদর্শিক স্বাধীনতা যদি না আসে তবে এই দুঃখের কি শেষ আছে?
যদি স্বাধীন দেশের মানুষ তাদের জীবনের জন্য নির্ধারিত সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত জীবন বিধানের ভিত্তিতে জীবন গড়ে তুলতে না পারে-তবে সকল দুঃখ ও না পাওয়ার মর্মজ্বালা কোটি কোটি বুলেট বেয়নেট দিয়ে হত্যার চেয়ে কঠিন কষ্টের শিকার হতে হয় ভুক্ত ভোগীকে। এরচেয়ে কঠোর নিষ্ঠুরতা বোধহয় এই বিশ্বে মেলা ভার। কারণ একজন আল্লাহভক্ত মানুষ যদি তার জীবনকে আল্লাহর দেয়া বিধানের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে না পারল-তবে তার মানব জন্ম যে ব্যর্থ ও অসফল হয়ে যাবে, এতে তো সন্দেহ নেই বিন্দু মাত্র। শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েও তার জীবন রয়ে যায় যদি গরু-ছাগলের ন্যায়- খায় দায় এবং ফূর্তি করে জীবন ব্যয় করে তবে তার মানব জন্ম মহাসংকটে পতিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর কোথায়?
মহান আল্লাহ মানুষকে এ বলে স্বাধীনতা প্রদান করেছে: তোমাদের সামনে দুটো পথই খোলা রাখা হয়েছে- এর একটা হলো আল্লাহর পথ আর অন্যটি হলো শয়তান বা ইবলিসের পথ। একটা সহজ সরল পথ আর অন্যটি হলো গরল বা বাঁকা পথ, যেটা মানুষকে হাতছানী দিয়ে ডাকছে- এসো এ পথে, যেখানে রয়েছে আনন্দ আর আনন্দ।
জীবন তো একটাই, এ জীবনে ভোগ বিলাস আনন্দ ফূর্তিতে মেতে না উঠলে জীবন  তো সার্থক হবে না। মনুষ্যজীবন আনন্দ উল্লাসে ভরতে না পারলে- পার্থিব পাওয়া তো কিছু হলো না,  মানবজীবন তো অপূর্ণই থেকে যাবে।

‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও
বাকির খাতায় শূন্য থাক
দূরের বাদ্য শুনতে মধুর
মধ্যে যেতার বেজায় ফাঁক।’

আর অন্যদিকে রয়েছে সত্যের একমাত্র পথ- যেটা সৃষ্টিকর্তার পথ। যে পথের ডাক দিতেন নবী-রাসূল নামের একদল মহান মহৎ মানুষ- যারা সত্য দীন সহ এ বিশ্বে আগমন করেছেন যুগেযুগে। এ পথেই রয়েছে মানুষের পরম পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, সত্য সঠিক সহজ সরল সুন্দরতম জান্নাতের পথ। আর এটা না গ্রহণ করলে রয়েছে জাহান্নামের পথ।
মহাসংকট ও মহাদুঃখ কষ্টের পথ। যে কোন একটা গ্রহণ বা বর্জন করতে হয়- এ তার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা মানুষকে দেয়া হয়েছে। এভাবেই সমগ্র বিশ্বের মানুষ দু ভাগে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন সত্তা নিয়ে জীবন যাপন করছে। সেখানে বাধা ও বাধ্যবাধকতার সুযোগ নেই। নিজ ইচ্ছায় সজ্ঞানে সচেতন ভাবে যে যেটা পছন্দ সে পথের পথিক হবে। এখানে জোর জবরদস্তীর কোন সুযোগ নেই।
আল্লাহ বলেন: ইসলামের জোর জবরদস্তির মওকা নেই। সুতরাং ইসলাম হচ্ছে একটি অপার স্বাধীনতার জীবন বিধান যার ইচ্ছে একে গ্রহন করুক।এতে কারো কিছু বলার প্রয়োজন পড়েনা। বলার বা মন্তব্য করার  সুযোগ রাখা হয়নি, কেনোনা সবাইকেই একদিন মরণকে বরণ করতে হবে-এবং মহাপ্রভুর সম্মুখে সকলকেই সমবেত হতে হবে।
সকল কর্মকান্ডেরই হিসেব নিকেশ নেয়ার কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকার ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। কারণ এ বিশ্বে দুটো পথের একটিকে গ্রহন এবং অপরটিকে বর্জনের সুযোগ ও স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।
সুতরাং এতো সুবর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের পরেও আর কোনো স্বাধীনতা পাওয়া চাওয়ার কি কোনো যুক্তি অবশিষ্ট থাকে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ