শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

দেশেই তৈরি হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির মাদারবোর্ড

মুহাম্মদ নূরে আলম: মাদারবোর্ড কি? মাদারবোর্ডে কি থাকে ও কিভাবে কাজ করে? আসুন আমরা জেনে নেই অতি সহজেই। মাদারবোর্ড একটি প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড যা কম্পিউটারের মূল ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ করে। এটি কম্পিউটার চ্যাসিসের নিচে কিংবা ব্যাক সাইডে থাকে। মাদারবোর্ড কম্পিউটারের অন্যান্য ডিভাইসে পাওয়ার সাপ্লাই দেয় এবং সিপিইউ, র‍্যাম ও অন্যান্য হার্ডওয়্যারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। মাদারবোর্ডের আরো অন্যান্য অনেক নাম রয়েছে যেমন, এমবি, বেস বোর্ড, মোবো, মেইন বোর্ড, মেইন সার্কিট বোর্ড, এম-বোর্ড, সিস্টেম বোর্ড, প্ল্যানার বোর্ড, লজিক বোর্ড ইত্যাদি।
কম্পিউটারের জগতে প্রথম মাদারবোর্ড: ১৯৮১ সালে রিলিজ হওয়া আইবিএম পারসোনাল কম্পিউটারের মাদারবোর্ডটিকেই কম্পিউটার জগতের প্রথম মাদারবোর্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তখন অবশ্য আইবিএম কোম্পানি এটার নাম দিয়েছিল প্লানার। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেটে কি মাদারবোর্ড আছে? হ্যাঁ, ডেস্কটপ কম্পিউটার ছাড়াও ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও স্মার্টফোনেও মাদারবোর্ড আছ্ েযা মূলত লজিক বোর্ড হিসেবেই বেশি পরিচিত। লজিক বোর্ড দেখতে অনেকটা মাদারবোর্ডের মতই যা একই রকমভাবে কাজ করে। তবে কম্পিউটারের মাদারবোর্ডে যত কম্পোনেন্ট থাকে, এ উল্লেখিত ডিভাইসগুলোতে অত বেশি কম্পোনেন্ট থাকে না। মাদারবোর্ডে কি কি থাকে? মাদারবোর্ডে অনেক কিছু থাকে, নিচে প্রধান প্রধান কম্পোনেন্টগুলোর লিস্ট দেয়া হল- এক্সপেনশন স্লটস্ (পিসিআই এক্সপ্রেস, এজিপি), মেমোরি স্লট, ব্যাক পেন কানেক্টর, ফোর পিন পাওয়ার কানেক্টর, থ্রি পিন কেস পেন কানেক্টর, ফ্লপি কানেকশন, সিস্টেম প্যানেল কানেক্টর, ২৪ পিন এটিএক্স পাওয়ার সাপ্লাই কানেক্টর, এটিএ/ আইডিই ডিস্ক ড্রাইভ প্রাইমারি কানেকশন, ইনডাক্টর, হিট সিংক, ক্যাপাসিটর, নর্থব্রিজ, সাউথব্রিজ, স্ক্রু হোল, সিপিইউ সকেট, ইউএসবি হেডার, রেইড, এফডব্লিউএইচ, সিডি-ইন, জাম্পারস্, সিরিয়াল পোর্ট কানেক্টর, ইত্যাদি।
দেশেই তৈরী হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির মাদারবোর্ড : ডিজিটাল ডিভাইসের অপরিহার্য অনুষঙ্গ মাদারবোর্ড এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে টু লেয়ারের মাদারবোর্ড তৈরি হলেও শিগগিরই মাল্টিলেয়ারের মাদারবোর্ড দেশেই তৈরি হবে। একাধিক প্রতিষ্ঠান দেশেই মাদারবোর্ড তৈরি করবে। এরই মধ্যে ওয়ালটন মাদারবোর্ড উৎপাদন শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রসঙ্গত, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের মূল উপকরণ হলো সার্কিট বোর্ড বা পিসিবি। মাদারবোর্ডকে কখনও কখনও মেইনবোর্ড বা সিস্টেম বোর্ডও বলা হয়। তবে ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারের বেলায় এটিকে লজিকবোর্ড বলা হয়ে থাকে। মাদারবোর্ডের মাধ্যমে কম্পিউটারের সব যন্ত্রাংশকে একে-অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ডিজিটাল ডিভাইসের বাজার দখল করতে হলে মাদারবোর্ড তৈরির কোনও বিকল্প নেই। বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এবং দেশের প্রযুক্তি বাজার নিজেদের দখলে রাখতে হলে মাদারবোর্ড উৎপাদনে যেতে হবে। মাদারবোর্ড দেশে তৈরি করা গেলে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ডিভাইসের দামও কমবে। এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে দেশে মাদারবোর্ড (মাল্টিলেয়ার) তৈরি হবে। গত চার মাসে দেশে ছয়টি কারখানা উদ্বোধন করা হয়েছে। এসবের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল ডিভাইসের বাজারও বাংলাদেশের দখলে থাকবে। তিনি বলেন, অনেকে বিশ্বাস করেনি যে, আমরা ল্যাপটপ বানাবো, মোবাইল ফোন বানাবো। এসব তো ক্রস করেই ফেলছি, আমরা এখন মাদারবোর্ড বানানোর যুগে পৌঁছে গেছি। তিনি জানান, শিগগিরই মাদারবোর্ড বানানোর জন্য যেসব উপাদান (কম্পোনেন্ট) রয়েছে সেগুলোর জন্য এক শতাংশ শুল্কর স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) জারি হয়ে যাবে। ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ জানান, ওয়ালটনের কারখানায় ইতোমধ্যে টু-লেয়ারের মাদারবোর্ড উৎপাদন হচ্ছে যা টেলিভিশন, রিমোট কন্ট্রোল যন্ত্র, মোবাইল ফোন, চার্জার ইত্যাদিতে ব্যবহার হচ্ছে। খুব শিগগিরই মাল্টিলেয়ার মাদারবোর্ড উৎপাদনে যাবে ওয়ালটন। এজন্য ওয়ালটনের রয়েছে সারফেস মাউন্টিং টেকনোলজি, যার মাধ্যমে প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড বা পিসিবি বোর্ডের ওপর অতি নিখুঁতভাবে সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম পিন বসিয়ে উচ্চমান ক্ষমতা সম্পন্ন মাদারবোর্ড তৈরি করা হবে। জানা গেছে, সরকার দেশের পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে ল্যাপটপ তুলে দিতে চায়। এত ল্যাপটপ দেশে তৈরি করা গেলে নিজেদের সক্ষমতাও প্রকাশ করা যাবে। এ কারণে সরকার স্থানীয় প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দেওয়ার জন্য দোয়েল ল্যাপটপ প্রকল্প থেকেও ল্যাপটপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে দেশে মাদারবোর্ড তৈরি করলে যেমন সাশ্রয়ী হবে, তেমনি একটি হার্ডওয়্যার শিল্পও দাঁড়িয়ে যাবে। দেশের ডিজিটাল ডিভাইসের ৮০ ভাগ চাহিদা বাংলাদেশে তৈরি ডিভাইসে মেটাতে চায় সরকার। এদিকে প্রযুক্তি পণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে হার্ডওয়্যার শিল্পের বিকাশে দেশি-বিদেশি কোনও প্রতিষ্ঠান হাইটেক পার্ক ও হাইটেক পার্কের বাইরে ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন করলে ১০ শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনা পাবে বলে সরকার আগেই ঘোষণা দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশে স্যামসাং মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফেয়ার গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এখন মাদারবোর্ড আমদানি করছি। ভবিষ্যতে মাদারবোর্ড দেশেই তৈরি করতে চাই। তবে তার আগে দেশে মাদারবোর্ড তৈরির মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে হবে। এই অনুকূল পরিবেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কয়েকটি ল্যাপটপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কারখানা নির্মাণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ দেশে কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি পণ্য সংযোজন, বিপণন, রফতানিসহ আরও কী সুবিধা দেওয়া যায় সে বিষয়ে প্রস্তাবনা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় রয়েছে স্যামসাং, হুয়াওয়ে, ডেল, এইচপি ও লেনোভোর মতো পাঁচটি কোম্পানি। চীনের প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে এরই মধ্যে কারখানা স্থাপনের জন্য গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে ৭ একর জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে। অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় নরসিংদীর শিবপুরে স্থাপন করা হয়েছে স্যামসাংয়ের কারখানা। এই কারখানায় বর্তমানে ফোর-জি স্মার্টফোন তৈরি হলেও ভবিষ্যতে ল্যাপটপ তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্যামসাংয়ের এই কারখানায় অন্যান্য ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ তৈরি করা হতে পারে এমন আয়োজনও থাকছে। দেশের প্রযুক্তি পণ্য ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিসিএস-এর সভাপতি সুব্রত সরকার বলেন, আমরা পাঁচটি ব্র্যান্ডকে এ দেশে কারখানা স্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবো। প্রস্তাবনা তৈরি হচ্ছে। এদের মধ্যে কয়েকটির কাছ থেকে আগেই ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ