শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ইতিহাসের সর্বাধিক ক্ষতির মুখে ফেসবুক

জাফর ইকবাল : ইতিহাসের সর্বাধিক ক্ষতির মুখে রয়েছে ফেসবুক। গত ১৩ মার্চ (বুধবার) বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীরা ফেসবুক লগ ইন করতে করতে পারেননি। এর আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালে এই মাধ্যমটি একই ধরনের সমস্যায় পড়েছিল। তখন এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির ব্যবহারকাটি ছিল মাসে ১৫০ মিলিয়ন। সেখানে বর্তমানে এই ব্যবহারকারী মাসিক ২.৩ বিলিয়ন। সমস্যা হয় ফেসবুকের মেসেজিং অ্যাপ এবং ছবি শেয়ারিং সাইট ইনস্টগ্রামেও। কি কারণে এই সমস্যা হয়েছে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এক বিবৃতিতে ফেসবুক বলেছে, অনেক ব্যবহারকারীর ফেসবুক অ্যাপে প্রবেশ করতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সচেতন। এই বিষয়টি আমরা যতোটা দ্রুত সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করছি। অন্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটা চাওর হয়েছে ডিভিওস নামে একটি উচ্চ মাত্রার সাইবার আক্রমণের মুখে পড়েছে ফেসবুক। তবে প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের আক্রমণের কথা অস্বীকার করেছে। ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, ইনস্টাগ্রামে নতুন কিছু পোস্ট করা যাচ্ছিল না, এমনকি রিফ্রেশও দেওয়া যাচ্ছিল না। ডেস্কটপ ভার্সনে মেসেঞ্জার কাজ করছিল না। মোবাইল অ্যাপে কিছু বার্তা আদান-প্রদান করা গেলেও ছবির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। ফেসবুকের আরেকটি মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপেও একই সমস্যা হচ্ছিল।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নজর রাখা একটি প্রতিষ্ঠান ডাউন ডিটেক্টর জানায়, সমস্যাটি বৈশ্বিক। ফেসবুকের উপর মানুষের আস্থা কমছে। তাই ফেসবুকের চেয়ে ব্যববহারকারীরা অন্য মাধ্যমের উপর নির্ভর করছে। আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স ভিত্তিক ডিজাইনার রেবেকা বুকার বলেন, এই ধরনের সমস্যার কারণে আমাদের ব্যবসার খুব সমস্যা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ফেসবুক ভাল। কিন্তু যারা ব্যবসায়িক সেবার মতো প্রতিষ্ঠান এই মাধ্যমে চালায়, তাদের ক্ষেত্রে কি হবে? আমি নিউইয়র্কে থাকা আমার টিমের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। ইমেইল ছাড়া ফেসবুকই আমাদের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম।
যুক্তরাজ্যের একজন কর্মকর্তা ২০ বছর চাকরির পর অবসরে যান। তিনি জানান, তার এই ফেয়ার ওয়েল পার্টির ছবি তিনি সমস্যার কারণে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় আইটি প্রতিষ্ঠান বলছে, ফেসবুকের বাজার দ্রুতই ধসে পড়বে। ব্রুকার নামে একজন টুইটারে লিখেছেন, যখন একটি প্রতিষ্ঠান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তখন যা হয়, ফেসবুকের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
সমস্যার কারণে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ফেসবুকের ওয়েব সাইটে লগইন করতে পারছিল না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীরা বুধবার রাত থেকে এ সমস্যায় পড়েন। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়ছেন ব্যবহারকারীরা। বিশেষ করে পোস্ট  আপডেট, শেয়ার ও ট্যাগ করাসহ সেলফি পোস্টের  ক্ষেত্রে  ব্যবহারকারীরা ‘স্যরি, সামথিং ওয়েন্ট রং। উই আর ওয়ার্কিং অন গেটিং দিস ফিক্সড এজ ফাস্ট এজ উই ক্যান।’ বার্তাটি দেখছেন। ফেসবুকের এমন সমস্যায় মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটারে শুরু হয় নানা আলোচনা। দ্রুত ভধপবনড়ড়শফড়হি টুইটারে ট্রেন্ডে চলে আসে।  প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টুইটারে এ হ্যাসট্যাগটি ব্যবহার করা হয়। ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ডাউন ডিটেক্টর ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, লগ-ইন সমস্যায় পড়েন ৩৫ ভাগ ব্যবহারকারী, নিউজফিড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ব্যবহারকারী সমস্যায় পড়েছেন। প্রায় ১২ ঘণ্টা আগে সর্বশেষ করা টুইটারে ফেসবুক নিশ্চিত করেছে, এ কারিগরি সমস্যাটি সাইবার হামলা সংক্রান্ত বা ডিস্ট্রিবিউটেড ডেনিয়েল-অব-সার্ভিস (ডিডিওএস) অ্যাটাক্ট নয়।
বিশ্বে বহুল ব্যবহিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। কিন্তু বেশ কিছু দিন ধরে নানা অভিযোগ আসছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ যেটা, সেটা হলো ফেসবুক তার গ্রাহকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারছে না। তাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জায়গা থেকেই ‘ফেস রিগকনিশান’ বা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চেহারা চিনে ফেলার প্রযুক্তি আনে ফেসবুক। তবে এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন জুকারবার্গ। ব্যক্তির মুখ চিনে ফেলার বিষয়টিকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বলেন ক্যাম্পেইনার বা প্রচারণাকারীরা। সব মিলিয়ে বেশ চাপে পড়ে ফেসবুক। আর সে জন্য এবার নড়েচড়ে বসেছেন মার্ক জুকারবার্গ। সম্প্রতি নিজের একটি ব্লগ পোস্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন তিনি। এ নিয়ে পরিকল্পনাও করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেসবুকে আলাপচারিতাকে আরো বেশি ইনক্রিপশান বা গোপনীয়তার নীতিতে আনতে চাচ্ছেন জুকারবার্গ। তিনি জানান, দুইজন ব্যক্তি যখন ফেসবুকে বার্তা আদান-প্রদান করবেন তখন সেগুলো ভবিষ্যতে এনক্রিপটেড থাকবে।
এদিকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ভয়াবহ হামলা ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার হওয়ার পর থেকে ফেসবুকের ওপর বৈশ্বিক চাপ বাড়ছে। ফেসবুক কীভাবে আপত্তিকর সহিংস কন্টেন্ট তাদের প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ফেসবুকের লাইভস্ট্রিম বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠছে। ফেসবুকের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গুগলের ইউটিউব, টুইটারেও লাখ লাখ কপি ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিও কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু মসজিদে হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচারের জন্য বেছে নেওয়ায় এ প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সরকার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছড়ানো রোধে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে বলেছে। তারা এসব মাধ্যমের ভারসাম্য রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বিশেষ করে ভিডিও লাইভস্ট্রিমের বিষয়টিতে আপত্তি করছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এসব কোম্পানির সমালোচনা হচ্ছে। সেখানকার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এলিজাবেথ ওয়ারেন নির্বাচনে জিতলে ফেসবুক, গুগল ও আমাজনের মতো কোম্পানিগুলোকে ভেঙে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নিউজিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলার ওই ভিডিও পুরোপুরি ফেসবুক থেকে মুছে ফেলা হয়েছে এমন কথা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ফেসবুকের মুখপাত্র। ওই ঘটনার সম্পাদিত ও বিকৃত নানা ফুটেজ ফেসবুকে আপলোড করার চেষ্টা করছেন অনেকেই। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৫ লাখ ভিডিও সরানো হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই আপলোড করার সময় বাধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিন লাখ ভিডিও পোস্ট হয়ে গেছে। ফেসবুক নিউজিল্যান্ডের নীতিমালা বিষয়ক পরিচালক মিয়া গারলিক বলেছেন, নীতিমালা বিরুদ্ধ কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। প্রযুক্তি ও মানুষের সহায়তায় সম্পাদিত ভিডিওগুলোও মুছে ফেলা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ