সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

বাঘাইছড়িতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তদের ব্রাশফায়ারে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও দুই নারী আনসার সদস্যসহ ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। গুলীবিদ্ধ হয়েছে আরো অন্তত ১৫ জন, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর। দৈনিক সংগ্রামসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট বাক্স এবং অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে সাজেক এলাকার কংলাক সরকারি প্রাথমিক স্কুল কেন্দ্র থেকে রাঙামাটি ফেরার পথে বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা সড়কের নয় মাইল এলাকায় দুর্বৃত্তরা দুটি গাড়ির ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন শিক্ষক নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আনসারের দু’জন নারী সদস্যের সঙ্গে একজন গাড়ি চালকের মৃত্যু ঘটে। পরে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যায় আরো দু’জন। বাকি আহতদের হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও একজনের মৃত্যু ঘটেছে বলে কোনো কোনো খবরে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক খবরে দুর্বৃত্তদের প্রকৃত পরিচিতি সম্পর্কে জানা না গেলেও তথ্যাভিজ্ঞরা দুটি অনুমানের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন কোনো প্রার্থীর পক্ষের লোকজন এই হামলা ও হত্যাকা- ঘটিয়ে থাকতে পারে, যার হয়তো জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ওই প্রার্থীর হয়তো ফলাফল নস্যাৎ করাই উদ্দেশ্য ছিল। এমন কোনো অনুমানকে অবশ্য বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হচ্ছে না। কারণ, ফলাফল নস্যাৎ করা উদ্দেশ্য হলে হামলা শুধু একটি এলাকায় চালানো হতো না। উপজেলার আরো কয়েকটি এলাকায়ও হামলা চালানো এবং গোলযোগ করতো ওই প্রার্থী বা কয়েকজন প্রার্থীর লোকজন।
কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি বলেই পাহাড়ে তৎপর সশস্ত্র বিভিন্ন গ্রুপের দিকে আঙুল তুলেছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। তারা বিশেষ করে ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এবং মৃত পাহাড়ী নেতা এম এন লারমার নাম ব্যবহারকারী সংগঠন জনসংহতি সমিতির কথা বলেছেন।  আঞ্চলিক এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো একদিকে সরকারের তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ চালাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের যুদ্ধ ও সংঘাতে বিগত মাত্র ১৫ মাসেই অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যাদের মধ্যে সাধারণ মানুষও রয়েছে। বলা হচ্ছে, উপজেলা নির্বাচনকে একটি উপলক্ষ হিসেবে বেছে নিয়ে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যকার এক বা একাধিক গ্রুপ সোমবারের হামলা ও হত্যাকান্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে।
আমরা মনে করি, নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী কিংবা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে যে বা যারাই হত্যাকা- ঘটিয়ে থাকুক না কেন, তাদের খুঁজে বের করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কারণ, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাধীনতার পর থেকেই নানা নামের বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন হত্যাকা-ের ভয়াবহ অভিযান চালিয়ে আসছে। একটা সময় পর্যন্ত এসব গ্রুপের প্রধান নেতা ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এম এন লারমা। তার মৃত্যুর এবং ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর বেশ কিছুদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকাংশে শান্ত ছিল। কিন্তু এম এন লারমার অনুসারী নামের কিছু ব্যক্তি ২০১০ সালে জনসংহতি সমিতি নাম নিয়ে পৃথক একটি দল গঠন করার পর থেকেই নতুন পর্যায়ে আবারও মুক্তিযুদ্ধের নামে খুনোখুনি শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, সোমবারের হামলা ও হত্যাকা- উল্লেখিত তিনটি গ্রুপেরই কোনো একটি কিংবা একাধিক গ্রুপ ঘটিয়ে থাকতে পারে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ধরনের নৃসংশ হত্যাকান্ডকে কোনোক্রমেই প্রশ্রয় দেয়ার সুযোগ নেই। এর ফলে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি তো অকার্যকর হয়ে পড়বেই, একই সঙ্গে অনিশ্চিত হতে থাকবে সাধারণ মানুষের জীবনও। আমরা তাই ঘাতকদের চিহ্নিত করে খুঁজে বের করার এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ