মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ফ্রাঙ্কো-জার্মান চুক্তিতে গুরুত্ব পায়নি শরণার্থী ইস্যু

‘এলিসি চুক্তি’কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল ফ্রান্স ও জার্মানি। নতুন যে চুক্তি হয়েছে, তাতে ইইউ নীতি সংস্কার, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও স্থান পায়নি শরণার্থী ইস্যু।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল মঙ্গলবার আখেনে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দুই দেশের নাগরিকদের জীবনমানের আরো উন্নয়ন সাধিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে ‘এলিসি চুক্তির’ ৫৬তম বর্ষপূর্তিতে এই চুক্তি নবায়ন করা হলো। গত কয়েক দশক ধরেই ফ্রান্স এই চুক্তি নবায়নের পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ম্যার্কেল বলেন, “এর মাধ্যমে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তি রচিত হবে। এর দ্বারা আমরা নিজেদের প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবো, যা আমাদের সবধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে। আমরা হাতে হাত রেখে সব কঠিন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করবো।”
মাক্রোঁ বলেন, “এই চুক্তি সম্পর্কে যারা মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়াচ্ছে, তারা মূলতঃ অতীত অপরাধের পুনরাবৃত্তি করতে চাইছে।”
এলিসি চুক্তি হয়েছিল  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ১৮ বছর পর। ১৯৬৩ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল এবং জার্মান চ্যান্সেলর কনরাড আডেনাওয়ের ঐতিহাসিক এলিসি চুক্তি সই করেছিলেন। ঐ চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন, সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। ঐ চুক্তির কারণে সেই সময় থেকে এ পর্যন্ত ৮৪ লাখ জার্মান ও ফরাসি তরুণ ‘বিনিময় কর্মসূচি’তে অংশ নিয়ে দুই দেশ সফর করেছেন।
১৬ পৃষ্ঠার নতুন এই চুক্তিতে ম্যার্কেল এবং মাক্রোঁ নতুন অনেক দিক সংযুক্ত করেছেন। এগুলোর মধ্যে তরুণ সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিসহ আছে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশ ও জলবায়ু নীতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে শরণার্থী ইস্যু তেমন গুরুত্ব পায়নি এতে।
এছাড়া ফ্রাঙ্কো-জার্মান পার্লামেন্টারি চুক্তির আওতায় দুই পার্লামেন্টের মধ্যেও তথ্য বিনিময়ের অঙ্গীকার হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়টিতে জোর দেয়া হয়েছে।
দুই দেশের আইনপ্রণেতারা ‘ডিজিটাল ইউনিয়নের’ উপর জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ, মার্কিন জায়ান্ট অ্যাপল, গুগল ও অ্যামাজনের দৌরাত্ম্য কমাতে দুই দেশ ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের’ ব্যাপারে একে অপরকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো এর আওতাভুক্ত হতে পারে।
এ ইউরোপ সে ইউরোপ নয়
গরিব দেশ থেকে যে সব মানুষ ধনি দেশে আসার চেষ্টা করেন, তারা মরিয়া। চরম হতাশার হাত থেকে তারা পালিয়ে বাঁচতে চান। কিন্তু যে স্বর্গে তারা পৌঁছাবেন বলে মনে করছেন, সেই স্বর্গ যদি ইতিমধ্যে বদলে গিয়ে থাকে?
১৯৭৯ সালে প্রথম জার্মানিতে আসি। তখন ভারতে খালিস্তান আন্দোলনের ফলে শিখ ধর্মালম্বীরা জার্মানিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে শুরু করেছেন। পরে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধের সময় তামিলরা আসতে শুরু করেন। তখনো পর্যন্ত যেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগটাই বেশি ছিল।
আজ যদি বলি যে, রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতির তাড়নাই মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, তাহলে স্বভাবতই অনেকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা সোমালিয়ার মতো দেশের দৃষ্টান্ত দেবেন-এবং তাতে ভুলেরও কিছু নেই। ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যেতে পারে: রাজনীতির বিপত্তি এড়াতে মানুষ যখন অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবে, তখন সেই ভিনদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনেতিক সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা, সে কথাটাও তারা ভেবে দেখে বৈকি।
উদ্বাস্তু সংকট, অভিবাসন, দেশ ছাড়া, এ সবের পিছনে হাজারটা মানবিক কাহিনি, সহ¯্র মানবিক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে রয়েছে। আর রয়েছে মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি: নিজের এবং নিজের পরিবারের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর প্রচেষ্টা। ইউরোপের সব দেশই ভিয়েনা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী, ইউরোপের সব দেশেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করা যায়। তবুও জার্মানি কিংবা সুইডেনে যেতে পারা একটা আলাদা ব্যাপার।
ইউরোপ চলো!
‘পলিটিক্যাল করেক্টনেস’ মাথায় রেখে যদি ভাই-বেরাদারদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়, তাহলে বলতে হয় যে, ইউরোপে আসব বললেই তো আর ইউরোপে আসা যায় না। অমুক ভাই বাড়িঘর, জমিজেরাত বেচে, কোন এক দালালকে টাকা দিয়ে, তুর্কি হয়ে, রাবারের ডিঙিতে সাগর পেরিয়ে গ্রিসের লেসবসে পৌঁছে - সেখানেই ফেঁসে গেছেন - বা গিয়েছিলেন। এবার নাকি তাকে ডাঙার রাস্তা ধরে উত্তরে নিয়ে যাচ্ছে আরেক সম্বন্ধি, তিনিও কিছু কম নেন না।
তমুক ভাই তো গ্রিসের পথ না ধরে, মিশর হয়ে লিবিয়া গিয়ে, সেখান থেকে ইটালিতে পৌঁছেছেন। সেখানকার ভাইরা জার্মানের খবর জানেন - তারা বলছেন, এহানেই থাইক্যা যান। জার্মানি তো আর সে জার্মানি নাই, ইউরোপও আর সে ইউরোপ নাই। যেখানে কাজকর্ম আছে, মাথা গোঁজার জায়গা আছে, সেখানে যাহোক করে দিন কাটিয়ে দেন। দেখবেন ইটালিতে আমাগো দ্যাশের লোক আফ্রিকার মানুষজনের চেয়ে বেশি কদর পায়, তাড়াতাড়ি কাম পায়, কি দোকানপাট কিছু একটা খুলে বসে। এ দেশে আইন কিছুটা ঢিলেঢালা। জার্মানিতে অ্যাসাইলামদের দেয় বেশি, তবে নজরও রাখে বেশি। আর শুনেছেন তো, অদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি এবার সেন্টার খুইল্যা সেখানে ডিপোর্টেশনের কেসগুলিকে রাখব। কাগজ না থাকলে নাকি যে দেশের লোক, সে দেশের কাছে কাগজ তলব করব, কাগজ না দিলে উন্নয়ন সাহায্য কমাইয়া দিব।
এ সব কিছুর খানিকটা শোনা, খানিকটা জানা, বাকিটা কল্পনা - কিন্তু পুরোটাই কেমন যেন সত্য। উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসীদের চেয়ে বাস্তববাদী আর কেউ নেই। দেশ ছেড়ে বিদেশে যেতেই যেখানে বুকের পাটা লাগে, সেখানে রবাহুত, অনাহুত হিসেবে বিদেশে যাওয়া, ভিসা ছাড়া পরের দেশে ঢোকা, ধৈর্য্যে বুক বেঁধে সুদিনের অপেক্ষা করার জন্য কতোটা বুকের পাটা লাগে, একবার ভেবে দেখুন।
স্বর্গ হতে বিদায়
তাই আমার এই সাহসী ভাইদের আমি শুধু বিচার করে দেখতে বলব: ইউরোপে হাওয়া যে বদলাচ্ছে, খোদ ইউরোপ যে বদলাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্রেক্সিট, গোটা ইউরোপ জুড়ে দক্ষিণপন্থি, জাতীয়তাবাদী পপুলিস্টদের পালে হাওয়া, এ সব ভালো লক্ষণ নয়- কিন্তু স্বাভাবিক, যেমন জোয়ারের পর ভাটা। আমার মন বলছে, ইউরোপ এবার ঘরে আগল দেবে; ইউরোপ আর আগের মতো বিদেশি-বহিরাগতদের সাদরে, সস্নেহে স্বাগত জানাতে দ্বিধা করবে, ইউরোপের মনে যেন কোথায় শঙ্কা ঢুকে গেছে।
বদান্যতা কোনো মানুষ কিংবা জাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, তা আসে অবস্থা ও পরিস্থিতি থেকে। ঔপনিবেশিক ইউরোপের মতোই উদার ইউরোপ, দরাজ ইউরোপের দিন যেতে বসেছে। এ অবস্থায় যারা দেশঘর ছেড়ে এ মুলুকে আসবেন, তাদের মনে রাখতে হবে, এককালে ইউরোপ আসাটা ছিল বুড়ি ছোঁয়ার মতো, একবার পৌঁছতে পারলেই নিশ্চিন্দি। এখন কিন্তু জার্মানিতে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি হলো ‘র্যুকফ্যুহরুং’, যার অর্থ প্রত্যাবর্তন বা ফেরত পাঠানো।
স্বর্গে আসা খুবই কষ্টের, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে আসতে হয়। তবে তার চেয়েও বেশি কষ্ট কীসে জানেন? স্বর্গ থেকে বিদায় নেওয়া। ঈশ্বর করুন তা যেন কারো ভাগ্যে না জোটে। -ডিডব্লিউ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ