শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ইতিহাস

ভারতের পুলওয়ামায় একটি সেনা বহরে জঙ্গি হামলার ঘটনার জবাব দিতে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কয়েকটি স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে ভারত। এরপর দুই দেশের সীমান্ত রেখা বরাবর পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে পাকিস্তানও।
তবে প্রতিবেশী বৈরী এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।  তবে এই দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা উত্তেজনা এবারই প্রথম নয়। দেশ বিভাগের পর থেকেই এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে, যার বড় কারণ কাশ্মীর।
অক্টোবর ১৯৪৭ : ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয় দেশবিভাগের মাত্র দুই মাসের মাথায়, যে যুদ্ধের কারণ ছিল কাশ্মীর।
অগাস্ট ১৯৬৫ : কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরণের যুদ্ধ হয় এবার।
ডিসেম্বর ১৯৭১ : পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধে সহায়তা করতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ভারত। পাকিস্তানের ভেতরে বোমা নিক্ষেপ করে ভারতীয় বিমান বাহিনী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে যুদ্ধটি শেষ হয়।
১৯৮৯: ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীর উপত্যকায় সশস্ত্র লড়াই শুরু হয়।
ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একটি বাসে করে পাকিস্তানের লাহোরে যান, যেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তার একটি শান্তি চুক্তি হয়।
জুলাই ১৯৯৯ : পাকিস্তানী সেনা এবং জঙ্গিরা কার্গিল পর্বতে ভারতের একটি সামরিক চৌকি দখল করে নেয়। ভারত বিমান এবং সেনা অভিযান শুরু করার পর দখলকারীরা পিছু হটে যায়।
মে ২০০১ : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর সঙ্গে ভারতের আগ্রায় মিলিত হন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। তবে তারা কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন।
অক্টোবর ২০০১ : শ্রীনগরে কাশ্মীর বিধানসভায় একটি ভয়াবহ হামলায় ৩৮ জন নিহত হন।
১৩ই ডিসেম্বর ২০০১ : দিল্লীতে ভারতের সংসদ ভবনে সশস্ত্র হামলায় ১৪ জন নিহত হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০০৭ : ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলাচলকারী সমঝোতা এক্সপ্রেস ট্রেনে বোমা হামলায় ৬৮ জন নিহত হন।
২৬শে নভেম্বর ২০০৮ : মুম্বাইয়ের প্রধান রেলওয়ে স্টেশন, বিলাসবহুল একটি হোটেল এবং একটি ইহুদি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা জঙ্গি হামলায় ১৬৬ জন নিহত হন। ভারতের অভিযোগ, ওই হামলার পেছনে রয়েছে পাকিস্তানী গ্রুপ লস্কর-ই-তাইবা।
জানুয়ারি ২০১৬ : পাঠানকোটে ভারতের বিমান ঘাটিতে চারদিন ধরে চলা হামলায় সাতজন ভারতীয় সেনা এবং ছয়জন জঙ্গি নিহত হয়।
১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ : ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উরি সেনা ঘাটিতে জঙ্গি হামলায় ১৯ জন সেনা সদস্য নিহত হয়।
৩০শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ : ভারত জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের কাশ্মীরের জঙ্গিদের ওপর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে। যদিও এরকম কোন হামলার কথা নাকচ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ।
১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯: কাশ্মীরের পুলওয়ামায় একটি সামরিক কনভয়ে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৩৪ জন সেনা সদস্য নিহত। পাকিস্তান-ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জৈশ-এ মোহাম্মদ এই হামলার দায় স্বীকার করে।
২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯: ভারত জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাটিতে বিমান হামলা করেছে এবং জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দিয়েছে।
কাশ্মীর নিয়ে কেন এই বিরোধ
পরমাণু অস্ত্রধারী দুই দেশ ভারত এবং পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে কথিত জঙ্গী আস্তানায় ভারতীয় বিমান হামলার ঘটনার পর পাকিস্তান এর জবাব দেয়ার কথাও বলেছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ভারত অপ্রয়োজনীয় আগ্রাসন চালিয়েছে। পাকিস্তান তার সুবিধাজনক সময়ে এর জবাব দেবে। এদিকে ভারতও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ফলে কাশ্মীর নিয়ে দেশ দু’টির সংকট একটা চরম অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
ভারত-পাকিস্তান আগে ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালে দু’বার যুদ্ধে জড়িয়েছিল কাশ্মীর নিয়ে।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন । কারণ দুই দেশের কাছেই পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।
কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে দেশ দু’টির মধ্যে বিরোধ কেন?
ব্রিটেন থেকে ভারত পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে যখন স্বাধীনতা পায়, তখনই দুই দেশই কাশ্মীরকে পাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিল।
ভারত পাকিস্তান ভাগ করার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাশ্মীর দুই দেশ থেকেই মুক্ত ছিল।
তবে তৎকালীন কাশ্মীরের স্থানীয় শাসক বা রাজা হরি সিং ভারতকে বেছে নিয়েছিলেন।
তিনি একটি চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরকে ভারতের সাথে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।
ইতিহাসবিদরা বলেন, ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু যে শর্তে তা হয়েছিল, সেই শর্ত থেকে ভারত অনেকটা সরে এসেছে।
পাকিস্তানও অনেকটা জোর করে এই ব্যবস্থায় ঢুকেছে এবং সেই থেকে সংকট জটিল থেকে আরও জটিল হচ্ছে।
ভারত শাসিত কাশ্মীর কেন সবসময় অস্থিতিশীল থাকছে?
এই অংশের অনেক মানুষ ভারতের শাসনে থাকতে চায় না। তারা পাকিস্তানের সাথে ইউনিয়ন করে যুক্ত হতে অথবা নিজেরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চায়।
কারণ ভারত শাসিত জম্মু কাশ্মীরে ৬০ শতাংশের বেশি মুসলিম।
ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে এই একটি রাজ্য, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এছাড়া কাশ্মীরে কর্মসংস্থানের অভাব এবং  বৈষ্যমের অনেক অভিযোগ রয়েছে।
কাশ্মীরে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধেও নির্যাতন চালানো অনেক অভিযোগ রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনও দিন দিন সহিংস হয়ে উঠছে।
এই সহিংসতায় গত বছরেই সাধারণ নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৫০০ জনের মতো নিহত হয়েছে।
কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে আশা তৈরি হয়েছিল
বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে ভারত এবং পাকিস্তান দুই দেশই যুদ্ধ বিরতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল ২০০৩ সালে।
পাকিস্তান পরে ভারত শাসিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সহায়তা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
২০১৪ সালে ভারতে নতুন সরকার এসেছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু ভারতের সেই সরকারও পাকিস্তানের সাথে শান্তি আলোচনা করার আগ্রহ দেখায়। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দিল্লী গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।
এর এক বছর পরই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়।
দুই দেশ কি আবারও চরম শত্রুর জায়গায় ফিরে যাচ্ছে?
২০১৬ সাল থেকে ভারত শাসিত কাশ্মীরে দেশটির সামরিক ঘাঁটিত বেশ কয়েকটি আক্রমণ হয়েছে।
কিন্তু গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি যে আত্মঘাতি হামলা হয়েছে, তাতে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
এই হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয়  সৈন্য নিহত হয়েছে। এই ঘটনা দুই দেশকে আবারও মুখোমুখি করেছে। -বিবিসি বাংলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ