শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

দুর্ঘটনা ঘটলেই কারখানা গোডাউন বন্ধ সমাধান নয় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত চকবাজার ট্র্যাজেডি ও ফলোআপ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আবুল মকসুদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে নিমতলী ও চকবাজারের ট্রাজেডির মতো ঘটনা এড়ানো যাবে। কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই সাথে সাথে কারখানা গোডাউন বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ। 

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের চক বাজার ট্রাজেডি ও ফলোআপ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’-এর জাতীয় কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর।

এছাড়া প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। সুজন নেতৃবৃন্দের মধ্যে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, সুজন নির্বাহী সদস্য প্রকৌশলী মুসবাহ আলীম, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য রোবায়েত ফেরদৌস উপস্থিত ছিলেন। কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসাইন, চেয়ারম্যান, স্টান্ডিং কমিটি অন ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কেমিক্যালস, এফবিসিসিআই। গোলটেবিল বৈঠকে মতামত ব্যক্ত করেন নগর পরিকল্পনাবিদ রিয়াজ উদ্দিন, বাপার যুগ্ম স¤পাদক মিহির বিশ্বাস, আবুল বাশার হাওলাদার, নাজিম উদ্দিন, সাংবাদিক পাঠান আজহার, ক্যামেলিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর আলম, সেলিনা হাফিজ প্রমুখ।

প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ আরও বলেন, যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে, রাজউক এবং সিটি করপোরেশনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায় তাহলেই ভবিষ্যতে নিমতলী ও চকবাজারের ট্রাজেডির মতো ঘটনা এড়ানো যাবে। কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই সাথে সাথে কারখানা গোডাউন বন্ধ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। পুরান ঢাকা থেকে অবৈধ ব্যবসার অপসারণ এবং নগরকে নিরাপদ করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে সাথে নিয়ে একটি সেল গঠন করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আমাদের রাষ্ট্র নিমতলী ও চকবাজারের ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করছে না। আমি মনে করি, ক্ষতিপূরণের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কিন্তু একইসঙ্গে যারা এসব ঘৃণ্য ও মর্মান্তিক ঘটনার জন্য দায়ী তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। নগরকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার জন্য সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ নাগরিক সমাজকে যুক্ত করতে পারে।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নিমতলী ও চকবাজারের ঘটনার বড় কারণ হলো কর্তৃপক্ষকে দায়বদ্ধ করতে ব্যর্থ হওয়া। এই ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের সকলের, নাগরিক সমাজের, গণমাধ্যমের। আমাদের সংসদীয় কমিটিগুলো যদি নিমতলীর ঘটনার পর নিয়মিত ফলো-আপ করতো তাহলে হয়তো চকবাজারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আমাদের সমাজের জবাবদিহিতা খুবই কম। দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। একইসঙ্গে জবাবদিহিতা তৈরিতে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছে না। কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতার অভাবের কারণে নিমতলী ও চকবাজারের ঘটনা ঘটে এবং এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। 

বৈঠকে বক্তারা বলেন, সরকার স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্যে যে জায়গা নির্ধারণ করেছে তা সরেজমিনে দেখা এবং সেখানে কী কী করণীয় রয়েছে তা সরকারকে জানানো। স্থায়ী পুনর্বাসনের ফলে আশেপাশের লোকালয়, আবাসিক এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে কিনা তা খতিয়ে দেখা। এব্যাপারে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা অবশ্যই নিতে হবে; সিটি কর্পোরেশন কয়েকটি বাড়িকে ‘ঝুকিপূর্ণ’ ঘোষণা করেছে। খুব ভালো উদ্যোগ, সন্দেহ নেই। এব্যাপারে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে বলতে হবে আরো কিছু বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে কিনা। ‘ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি’ সম্পর্কে একশো ভাগ নিশ্চিত হতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িগুলোর মালিক ও বসবাসকারীদের জন্যে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে? তাদের জন্যেও কিছু একটা করতে হবে; নাগরিক সমাজের মূল কাজ হবে মনিটরিং ও পরামর্শ। সরকার বা বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষ যা যা করছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করা ও কোথাও গলদ দেখা দিলে তা জোরগলায় বলা। 

 গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’-এর জাতীয় কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, চকবাজার, চুড়িহাট্টা ও সংলগ্ন এলাকায় যে দুর্ঘটনা ঘটে গেছে তা নজিরবিহীন। কিন্তু পুরোন ঢাকায় শুধু এই এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ তা নয়। সমগ্র পুরোন ঢাকাই বিভিন্নভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ‘নাগরিক সমাজ’ নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, ব্যবসায়ী সমাজ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে ‘পুরোন ঢাকা’র নতুন নকশা প্রণয়ন করতে পারে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করেই হতে হবে এই পরিকল্পনা। বলাবাহুল্য এটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তারচেয়েও বড় কথা এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর গ্রিন সিগন্যাল থাকতে হবে। ঢাকা শহরে কেমিক্যাল গোডাউন সরাতেও ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের’ প্রয়োজন হয়। অন্য কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের গোডাউন সরানোর ক্ষমতা নেই। পুরোন ঢাকার নতুন ডিজাইন করার জন্যে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে আনা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ