মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

অন্যদের প্রাণ রক্ষায় নিজের জীবন দিলেন যে বীর শহীদ

সংগ্রাম ডেস্ক : নাইম রশিদ। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হত্যাযজ্ঞের সময় তিনি নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাননি। হামলাকারী যখন নির্বিচারে মুসল্লিদের গুলী করে হত্যা করছিল পাখির মতো, তখন তিনি দেখিয়েছেন অসীম সাহসিকতা। জাপটে ধরে হামলাকারীর বন্দুক কেড়ে নেয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করেন। ততক্ষণে লাশের সারিতে যোগ হয়েছে তারই ছেলে তালহা (২১)-এর দেহ। 

 সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে, নিজেকে শক্ত করে জীবন বাজি রেখে তিনি লড়াই চালিয়ে যান হামলাকারীর সঙ্গে। তা না হলে নিহতের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি হতে পারতো। যে নাইম রশিদ নিজের জীবন বাজি রাখলেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মুসলিম ভাইদের রক্ষার জন্য, শেষ পর্যন্ত তিনিও বাঁচতে পারলেন না।

তাকে মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাই বিশ্ব মিডিয়া তাকে হিরো বা নায়ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তার ছবি দিয়ে আলাদা রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে।

শুক্রবার জুমার নামায আদায় করতে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ আল নূরে গিয়েছিলেন নাইম রশিদ ও তার ছেলে তালহা। মসজিদ তখন কানায় কানায় পূর্ণ। অকস্মাৎ সেখানে সিনেমার ভিলেনদের মতো এলোপাতাড়ি গুলী শুরু করে সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরেন্ট (২৮)। নাইম রশিদের চোখের সামনে লুটিয়ে পড়তে থাকে মুসল্লি ভাইদের দেহ। রক্তে ভেসে যেতে থাকে মসজিদের মেঝে। চারদিকে আর্ত চিৎকার। দিকভ্রান্ত মানুষ। ছুটাছুটি করছে। তার সামনে লুটিয়ে পড়ছেন মানুষ। তার মধ্যে রয়েছেন তার ২১ বছর বয়সী ছেলে তালহাও। একজন পিতা হিসেবে সেই দৃশ্য তার হৃদয়ে যে কম্পন তোলার কথা, যে ঝড়ে তার ভেঙে পড়ার কথা, তিনি তার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। নিজেকে স্থির করলেন। অস্ট্রেলিয়ান হামলাকারী ব্রেনটন টেরেন্টের কাছ থেকে তার অস্ত্র কেড়ে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। এই ধস্তাধস্তিতে যে সময়টা লেগেছে তার মধ্যে অনেক মুসলিম মসজিদ থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছেন। তা না হলে আরও কি ভয়াবহতা ঘটতে পারতো তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন হিরো।

লন্ডনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ লিখেছে, নামায আদায় করতে যাওয়া ভাইদের রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন রশিদ। তিনি হামলাকারী ব্রেনটনের অস্ত্র কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এতে মারাত্মকভাবে আহত হন রশিদ। এক পর্যায়ে হামলাকারী মসজিদ থেকে বেরিয়ে পালায়। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মুসলিমরা রশিদকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যান হাসপাতালে। কিন্তু যিনি অন্য মুসলিমদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে বাজি ধরলেন, তিনিই বাঁচতে পারলেন না। শুক্রবার রাতের শেষভাগে তিনি মারা যান।

নাইম রশিদের বাড়ি পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে। পাকিস্তানে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেয়ে যান নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে। সেখানে গিয়ে জীবনযাপন শুরু করেন।

পাকিস্তানের এআরওয়াই নিউজকে ড. খুরশিদ আলম নিশ্চিত করেছেন নিহত নাইম রশিদ তার ভাই। তাকে ও তার ভাজিতা তালহাকে শুক্রবারের নৃশংস হামলায় হত্যা করা হয়েছে। এর আগে ওয়েলিংটনে পাকিস্তানের হাই কমিশন নিশ্চিত করেছে, হামলায় ৪ জন পাকিস্তানি আহত হয়েছেন। ৫ জন রয়েছেন নিখোঁজ। ডেইলি মেইল, মিরর ইউকের।

অজানা যুবক

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে হামলার পর দ্বিতীয় হামলাটি হয় লিনউড মসজিদে। ওই মসজিদে হামলার সময় বন্দুকধারীকে জাপটে ধরে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিলেন এক সাহসী তরুণ। তবে অস্ত্র ফেলে রেখে হামলাকারী পালিয়ে যান। সৈয়দ মাজহারউদ্দিন নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই ঘটনা।

গতকাল শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে জুমার নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের ওপর স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে হামলা চালান ব্রেনটন হ্যারিসন টারান্ট নামের এক অস্ট্রেলীয় যুবক। 

গতকাল শনিবার নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের অনলাইন সংস্করণে সৈয়দ মাজহারউদ্দিনের বয়ানে ওই সাহসী তরুণের কথা তুলে ধরা হয়।

মাজহারউদ্দিন বলেন, সাহসী তরুণ নিজের জীবন বিপন্ন করে বন্দুকধারীকে জাপটে ধরেন এবং অস্ত্র কেড়ে নেন।

মাজহারউদ্দিন বলেন, নামাজ আদায়রত অবস্থায় তিনি গুলীর শব্দ শুনতে পান। শব্দ শুনে তিনি বুঝতে পারেন বন্দুকধারী খুব কাছেই অবস্থান করছেন। লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মসজিদটি ছোট। ৬০ থেকে ৭০ জন নামাজ আদায় করতে পারেন। মূল প্রবেশদ্বারে বয়স্ক মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছিলেন। বন্দুকধারী সেদিকে দিয়ে ঢুকেই ওই মুসল্লিদের ওপর গুলী করা শুরু করেন। বন্দুকধারী গুলীবর্ষণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সরঞ্জাম পরেছিলেন। ওই সময় এক তরুণ বন্দুকধারীকে জাপটে ধরেন।

মাজহারউদ্দিন বলেন, ওই তরুণ সাধারণত মসজিদটি দেখভাল করেন। তিনি সুযোগ বুঝে বন্দুকধারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অস্ত্রটি কেড়ে নেন। ওই সাহসী তরুণ বন্দুকধারীর দিকে অস্ত্রটি তাক করার চেষ্টা করেন কিন্তু তিনি ট্রিগার খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এরপর তিনি বন্দুকধারীকে ধরার জন্য তার পেছন পেছন দৌড় দেন। কিন্তু বাইরে একটি গাড়িতে কয়েকজন অপেক্ষমাণ ছিল। ওই গাড়িতে করে পালিয়ে যান হামলাকারী।

মাজহারউদ্দিন জানান, তার পাশে দুই বন্ধুর একজনের বুকে এবং অন্যজনের মাথায় গুলী লাগে।

এর মধ্যে এক বন্ধু ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্যজনের ভয়াবহ রক্তপাত হচ্ছিল। তিনি জরুরি সেবা পেতে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৌড়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর পুলিশ আসে। পুলিশ আমাকে আর ভেতরে যেতে দেয়নি। তাই আমি আমার বন্ধুকে বাঁচাতে পারলাম না। তাঁর অনেক রক্ত ঝরছিল। অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়েছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ