শুক্রবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ

চার প্রকোষ্টের হৃদযন্ত্র বা হার্ট আমাদের দেহের অত্যাবশ্যকীয় কেন্দ্রীয় অর্গ্যান বা অঙ্গ। গুরুত্ব বিবেচনায় মস্তিস্কের পরেই হৃদযন্ত্রের অবস্থান। হৃদযন্ত্র মানব দেহের জন্য অনেকগুলো জরুরী কাজ করে থাকে। যেমন-

১. দেহের প্রতিটি কোষে খাদ্যকণা (গ্লোকোজ, প্রেটিন ও ফ্যাট) পৌঁছে দেয়। ২. ফুসফুস থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন কোষে কোষে পৌঁছে দিতে সাহায্যে করে। ৩. বিশুদ্ধ করণের জন্য কোষ থেকে দূষিত কার্বন-ডাইঅক্সাইড ফুসফুসে পৌঁছে দেয়। ৪. দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ৫. শরীরের মেটাবলিজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ৬. প্রতিটি প্রান্তে ওষুধ পৌঁছে দেয়। ৭. জীবনকে ছন্দময় করে।

দেহের প্রতিটি অংশে খাদ্য প্রদানকারী মহান বন্ধু হৃদযন্ত্র জন্ম থেকে মত্যু পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যায়। ঞযব ঐবধৎঃ হবাবৎ ংষববঢ়ং. হার্ট নিজেই নিজেকে দুইটি রক্তনালীর মাধ্যমে অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে থাকে। এই দু’টি রক্তনালীর কমপক্ষে ১টি আংশিক বা পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলেই সমস্যা হয়। এরই নাম ‘ইসকেমিক হার্ট ডিজিস’ বা হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা।

বুকে ব্যথাই এই রোগের আভাস দেয়। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় বিশ্রাম বা জিহবার নীচে নাইট্রেট স্প্র্রে বা ট্যাবলেট দিলেই বুকের ব্যথ্যা কমে যায়। কিন্তু জটিল পর্যায়ে বিশ্রাম এবং নাইট্রেট জিহবার নীচে ব্যবহার করেও বুকে ব্যথা কমানো যায় না। হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারন করে।

কেন হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা হয় : হৃদযন্ত্রে অক্সিজেনের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য হলেই হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা রোগ হয়।

হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল বন্ধ বা বাধাপ্রাপ্ত হলে। রক্তনালীর সংকোচন বা ব্লক কমপক্ষে ৭০% হলেই হৃদযন্ত্রের মাংশ পেশীতে রক্ত তথা অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। অক্সিজেন স্বল্পতার প্রাথমিক অবস্থা হচ্ছে ইসকেমিয়া/ এ্যানজাইনা আর তীব্র বা প্রকট অবস্থা হচ্ছে ইনফারকশন বা হার্ট এ্যাটাক। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে ষ্ট্রোক হার্টের কোন রোগ নয়। ষ্ট্রোক মাথার অসুখ যখন মাথার রক্তনালী বন্ধ হয় বা ছিড়ে যায়। আর হার্ট এ্যাটাক হৃদযন্ত্রের রোগ। অনেক মানুষ ষ্ট্রোককে হার্ট এ্যাটাক ভেবে রোগীকে ভুল করে হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে যায়। আবার হার্ট এ্যাটাককে ষ্ট্রোক ভেবে মাথার সিটি স্ক্যান করাতে চান। কতিপয় বিশেষ শ্রেণীর মানুষের হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা বেশী হয় ।

যেসব ক্ষেত্রে এই রোগ সম্ভাবনা বেশী থাকে :

১. উচ্চ রক্তচাপ, ২. ডায়াবেটিস মেলাইটাস, ৩. রক্তে অতিরিক্ত চর্বি/ কোলেস্টেরল, ৪. স্থুলতা, ৫. পুরুষ, ৬. বার্ধক্য, ৭. কায়িক শ্রমহীনতা, ৮. খাদ্যে শাক সবজি কম থাকা, ৯. এ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা, ১০. খাদ্যে অনিয়ম, ১১. পারিবারিক ইতিহাস, ১২. বেশি টিপটপ জীবন যাপন, ১৩. অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অত্যাধিক চর্বি, পরিশ্রমহীনতা, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি।

হৃদযন্ত্রে রক্ত স্বল্পতার রোগী বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ, বুক ভারীলাগা- এ সব লক্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসতে পারেন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে অতিদ্রুত হাসপাতালে জরুরী বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। সন্নিকটে হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল থাকলে সেখানে নিয়ে যাওয়াই উত্তম। চিকিৎসকের পরামর্শ মত ধারাবাহিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

হাসপাতালে পৌঁছার আগে বাসায় বা কর্মস্থলে বা রাস্তায় যা করতে হবে:

১. পর্যাপ্ত আলো বাতাস নিশ্চিত করতে হবে, ২. জিহবার নীচে নাইট্রেট সেপ্র দুই চাপ দিতে হবে বা একটি নাইট্রেট ট্যাবলেট দিতে হবে। ৩. দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছার ব্যবস্থা করতে হবে।

হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ অধিক সহজ ও নিরাপদ। হৃদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা খুব কঠিন নয়। এ জন্য করণীয় : ১. আদর্শ জীবন যাপন করা। ২. প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করা। ৩. বেশী শাক-সবজি খাওয়া। ৪. ধূমপান, গিলা, কলিজা, মাথা, জর্দা ও গরুর মাংশ বর্জন করা। ৫. তৈল, চর্বি, মিষ্টি কম খাওয়া, ৬. পরিমিত বিশ্রাম ও ঘুম, ৭. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, বা কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসা গ্রহণ করা, ৮. উত্তেজনা প্রশমন করা, ৯. আলগা লবণ বর্জন করা, ১০. দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন যাপন করা।

- ডা. লিয়াকত হোসেন তপন

অধ্যক্ষ, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ, গোপালগঞ্জ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ