মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

চুনোপুঁটি নয় রাঘববোয়ালদের ধরতে দুদকের প্রতি সম্পাদকদের আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার : হুন্ডির মাধ্যমে নয় ওভার ইনভয়েসিংয়ের কারণে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। গতকাল সোমবার দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশনের কৌশলপত্র ২০১৯ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।
সভায় সারাবাংলাডট.নেট ও গাজী টিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াজ রেজা, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক নারায়ণ চন্দ্র শীল, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, দীপ্ত টিভির এমডি জাহিদুল হাসান, বিটিভির মহাপরিচালক হারুনর রশীদ, আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিকসহ প্রমুখ উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। হুন্ডির মাধ্যমে কখনো লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়নি। দুদক তদন্ত করে দেখেছে টাকা পাচার হয়েছে শুধু ওভার ইনভয়েসিংয়ের কারণে। আর এনবিআর গত ১ মাসে কতোগুলো ফাইল করেছে। সেই রিপোর্ট আমরা এখনো পাইনি। আমি সরকারকে বলতে চাই, এনবিআরকে বলতে চাই, অর্থমন্ত্রণালয়কে বলতে চাই আপনারা যাদের বিরুদ্ধে ফাইল করেছেন তারাই আমার কাছে মূলত পাচারকারী। আজ এনবিআরকে একটি চিঠি পাঠানো হবে এর পরও যদি আমরা তালিকা না পাই তাহলে আইনানুগভাবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মাইন্ড সেট চেঞ্জ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মাইন্ড সেট চেঞ্জ না হলে দুর্নীতি দমন বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে সরকার, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন মিলে যদি এক নৌকায় না উঠি তাহলে এই সমুদ্র পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। টিআইবি শুধু সমালোচনা করে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। তারা যেভাবে বলে সেটা সবাই পারে। আমরা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর অভিযোগ চাই। সমালোচনা করবেন কিন্তু নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর করবেন না সেটা হবে না।
জাহালমের বিষয় তুলে ধরে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমরা যখন জাহালমের বিষয়টি জানতে পারলাম সঙ্গে সঙ্গে ৪টি মামলায় জামিন করিয়েছি। আমরা তো ছাড়তে পারি না। কারণ ছাড়ার মালিক তো আদালত। আর বাকি ২২টি মামলার কার্যক্রম চলছিলো। অন্যদিকে, জাহালমের বিষয়টি আসলে কি সেটি জানার জন্য আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটি আরও ১০ দিন বেশি সময় চেয়েছে। আশা করছি, ২০-২২ তারিখে আমরা তদন্ত রিপোর্ট পেয়ে যাব। তবে, এটা সত্য জাহালমের কেস নিয়ে পাবলিকলি আমাদের ট্রাস্টের পরিমাণ কমে গেছে। এমনকি গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে এমন কোনো কেস হয়নি। এটা আসলে দুঃখজনক। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি দেখছি।
সভায় বিটিভির মহাপরিচালক হারুনর রশীদ বলেন, ‘ছোট ছোট দুর্নীতি থেকেই বড় বড় দুর্নীতির জন্ম হয়। তাই ছোট দুর্নীতি রুখতে না পারলে বড় দুর্নীতি থামানো যায় না। মাত্রাতিরিক্ত ভোগ ও অপ্রয়োজনীয় খরচ দুর্নীতির দিকে ধাবিত করে। সরকারি সব কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব দুদকের রাখা উচিত। দুর্নীতি রোধ করা না গেলে দেশের উন্নতির সম্ভব নয়।’
সারাবাংলাডটনেট ও গাজী টিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াজ রেজা বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্র ব্যর্থ হতে চলেছে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সেটা দুদক পাচ্ছে কিনা? সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ার আগে এবং পরের দুর্নীতির কোনো চিত্র আছে কিনা? তাই আমার মনে হয় বড়দের ধরতে না পাইলে ছোট মশা-মাছি ধরে দুদকের ভাবমূর্তির বড় কোনো পরিবর্তন হবে না।’তিনি আরও বলেন, ‘দুদক সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে দুদক অনেক কাজ করছে সেটা মধ্যম ও ছোট পর্যায়ে। তারা কিন্তু বড়দের ধরছে না। আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের দেশে কেউ বলবে না সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঠিক মতো সেবা পেয়েছেন। হয়তো তাকে পয়সা দিতে হয়েছে নয়তো তাকে অন্যকোনো কানেকশনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ফলে এই বাস্তবতার মধ্যে আমি দুদকের কাছে বিরাট প্রত্যাশা করি না। তবে একটা-দুইটা বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে হয়তো মানুষের আবার আস্থা ফিরে আসবে।’
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘মেডিকেল বা জাহালমের মতো ঘটনা ঘটলে আমরা উদ্বিগ্ন হই। বিমান ও ব্যাংকিংখাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। উপজেলায় ডাক্তার না থাকলে সিভিল সার্জনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারে দুদককে আরও শক্তিশালী হতে হবে। কর্মকর্তাদের আরও বেশি বেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘শিক্ষাখাতের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ছোট ছোট কর্মকর্তাদের শুধু ধরলে হবে না বড়দেরও ধরতে হবে। ভূমি ও বিচারখাতে দুর্নীতি সীমাহীন। দুদককে সেজন্য এই খাতে আরও বেশি কাজ করতে হবে।’
ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ‘রাষ্ট্রের মধ্য থেকে পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বড়বড় দুর্নীতিবাজ পার পেয়ে যাচ্ছে। এজন্য দুদকের কার্যক্রম সাধারণ মানুষ সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। কিন্তু একটি বিষয় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বেড়েছে তবে দুর্নীতি কি কমেছে? জাহালমের বিষয়ে দুদক তার দায় এড়াতে পারে না। এতে দুদকের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ