মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সেনাবাহিনী প্রয়োজনে মক্কা-মদীনার নিরাপত্তা দেবে, তবে যুদ্ধে অংশ নেবে না -সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সৌদি আরব সহযোগিতা চাওয়ায় তাদের সাথে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা হয়েছে। সেখানে স্থল সীমার মধ্যে অবিস্ফোরিত মাইন সরানোর কাজে সহযোগিতা দেয়া হবে। আর পবিত্র মক্কা-মদীনায় নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যাবে। তবে কোন দেশের সাথে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী যুদ্ধে অংশ নেবে না। শুধুমাত্র জাতিসংঘের অধীনে শান্তি রক্ষায় কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাব ও সংসদের সমাপনী ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে দু’জন সদস্য কিছু কথা বলেছেন। এ বিষয়ে বলতে চাই, প্রথমত সৌদি আরবের সাথে এটা কোন চুক্তি নয়, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছে। এ ধরনের সমঝোতা মানে এমওইউ বিশ্বের বহু দেশের সাথে আছে। প্রতিরক্ষার চুক্তিও অনেক দেশের সাথে আছে। বামপন্থী রাজনীতি যেসব দেশের আদর্শকে ধারন করে চলতেন, সেসব দেশেও আছে। বিশ^ এখন গ্লোবাল ভিলেজ সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের দেশের উন্নয়ন করতে চাই।
তিনি বরেন, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে স্বশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজন। স্বশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হলে স্বাভাবিকভাবে এটা আসে আমাদের অস্ত্রশস্ত্র কিনতে হবে, কাজ করতে হবে, স্বশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ যখন গড়ে তুলছিলেন তখনই নৌবাহিনী, সেনা বাহিনী ও বিমানবাহিনী গড়ে তুলেন। সে সময়ই তিনি একটি প্রতিরক্ষা নীতিমালা করে যান। আর সেই প্রতিরক্ষা নীতিমালার আলোকেই আমরা ইতোমধ্যে ফোর্সেস গোল প্রয়নয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। স্বশস্ত্র বাহিনী এখন শুধু আমাদের দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, জাতিসংঘের অধীনের বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত পূর্ণ দেশে শান্তিরক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরে কুয়েতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলবার জন্য আমাদের স্বশস্ত্র বাহিনী সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছে এবং তারা সেখানে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বিভিন্ন দেশের সাথে সমঝোতা স্বারকের কথা উল্লেখ করে বলেন, অনেক দেশের সাথে এমওইউ সই হয়েছে। চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভারত, কুয়েত, দক্ষিন কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্ত রাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, কানাডা, কম্বোডিয়া, ইটালি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আরো বিভিন্ন দেশের সাথে এমওইউ আছে। আর সৌদি আরবের সাথে এমওইউ স্বাক্ষর করেছি। তারা সহযোগিতা চেয়েছে। প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা স্বারকটি হচ্ছে অবকাঠামো নির্মান, কারিগরি সহায়তা, মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং, কোঅপারেশন ফিল্ড অব কনস্ট্রাকশন, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। সৌদি আরবের স্থল সীমানার মধ্যে অবিস্ফোরিত মাইন সরানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পারদর্শী, এ জন্য কুয়েতের মতো এটাতে সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়াও সামরিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষায় সহায়তা দেয়া হবে। প্রতিরক্ষা তথ্য আদান প্রদান, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রক্ষা ও জলদস্যু দমন বিষয়ক।
তিনি বলেন, পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, কোন দেশের সাথে যুদ্ধ করলে আমাদের সেনাবাহিনী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে না। জাতিসংঘের অধিনে শান্তি রক্ষায় যাবে, কোন যুদ্ধ করতে যাবে না। আর আমাদের পবিত্র মক্কা-মদীনার নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে সেখানে আমাদের সেনাবাহিনী যাবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবার সাথে বন্ধুত্ব-কারো সাথে শত্রুতা নয়।
দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতি দূর করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। দুর্নীতি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে বলেই উন্নয়ন দৃশ্যমান হচ্ছে। আর আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। এ প্রযুক্তির কারণেই টেন্ডার বাক্স ছিনতাইর ঘটনা শোনা যায় না। এভাবেই আমরা মানুষের ভেতরেও দুর্নীতি না করার জন্য চেতনা জাগ্রত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। সৎ ভাবে নূন ভাতও খাওয়া ভালো অসৎভাবে বিরিয়ানী খাওয়ার থেকে। আমরা এটাই মনে করি।
কওমী মাদরাসা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, এ ভূখ-ে মুসলিমদের শিক্ষা শুরু হয় মাদরাসা থেকে। প্রায় বিশ লাখের কাছাকাছি ছাত্ররা কওমী মাদরাসায় পড়ালেখা করছে। এ মাদরাসা আছে বলেই এতিম বাচ্চারা সেখানে পড়তে পারছে। সেখানে আশ্রয় পাচ্ছে, খাদ্য পাচ্ছে। সুতরাং মাদরাসাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। শিক্ষানীতিতে সকলকে নিয়ে শিক্ষার কথা বলা আছে। কওমী মাদরাসার বোর্ডগুলো ৫ ভাগে বিভক্ত। বহুদিন ধরে চেষ্টা করেছিলাম তাদের সাথে বসতে। তারা কি কারিকুলাম পড়াচ্ছে। তাদের কোন সনদ নেই। তাদের কারিকুলাম ঠিক করে, সনদের ব্যবস্থা করা। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা যাতে হয়। এ চেষ্টা থেকে একটি সমঝোতায় নিয়ে আসি, তাদেরকে দেওবন্দের কারিকুলাম ঠিক করেছে। আর দেওবন্দ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে সৃষ্টি। আর তাদেও দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে দিচ্ছি। তাতে কোন অপরাধ করিনি।
তিনি বলেন, কেউ কেউ বলবেন, মাদরাসা জঙ্গী গোষ্ঠী, এটা কিন্তু ঠিক নয়। হলিআর্টিজানের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীরা ইংরেজি মিডিয়াম ও প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্ররা। শুধু মাদরাসার ছাত্রদের দোষ দিলে হবে না। আমরা যে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছি, তা সংসদে আইন করে স্বীকৃতি দিয়েছি। এ বিষয় নিয়ে আরো কোন কথা বলা উচিত নয়।
তিনি বিএনপি সর্ম্পকে বলেন, এবারের নির্বাচনে তাদের পছন্দ মতো সিট পাননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। তখন ২৯টি সিট পেয়েছি বিএনপি জামায়াত জোট। এবার ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু এত কম সিট পাওয়ায় তারা। তাদের চেয়ারপার্সন দুর্নীতির মামরা সাজাপ্রাপ্ত আবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন দেশান্তরী, তিনিও সাজাপ্রাপ্ত। জনগন তাদেরকে কেন ভোট দেবে। কারা দেশ চালাবে। জনগন কাউকে পায়নি, এজন্য তারা আমাদেরকে বেছে নিয়েছে। আর নমিনেশন নিয়ে তারা প্রথমে একজনকে দিয়েছে, পরে বাতিল হওয়ায়, আবার অন্যজনকে দিয়েছে। মানুষ কিভাবে ভোট দিবে। তাদের যে ভোট ব্যাংক সেগুলোও পায়নি। আর তাদের প্রার্থী যাদের ধরে নিয়েছে জিতবেনই, তাদেরকে যদি লন্ডন থেকে ফোন দেয়া হয়, তাহলে নমিনেশন দেয়া হয়নি। যারা জিততে পারতো তাদেরকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। কিভাবে সিট পাবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত যারা হয়েছেন, তারা সংসদে আসুক, এসে যা বলার বলুক। আমরা বাধা দেব না।
সমাপনী বক্তব্যে সুশান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সংসদেও বিরোধী দলের উপনেতা জিএম কাদের বলেন, আইনের শাসন ও সুশাসন না থাকলে বৈষম্য বাড়ে, অনাচার অত্যাচার বাড়ে। ন্যয় বিচাররভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ কঠিন হয়ে যাবে। তাই সুশাসন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। আইন ও শালিস কেন্দ্রের হিসেব অনুযায়ী দেশে গত এক বছরে ৪১৮ জনকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে। তিনি সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, সড়ক নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। গত এক বছরে ২৫ হাজারের বেশি লোক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। এর জন্য ৯০ ভাগ চালক দায়ি। চালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিনা লাইসেন্সে কেউ চালক হতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
জিএম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টির নিজস্ব প্রতিক এবং নীতি রয়েছে। জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনা করেছে। বিরোধীদলেও ছিলো। সত্যিকারের বিরোধীদল হতে চাইলে কেনো বলা হবে এটা পাতানো খেলা। তিনি বলেন, সংসদকে প্রানবন্ত করতে চাইলে আমাদের কথা বলতে দিতে হবে। কথা বলতে পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। আমাদের সমালোচনাকে শত্রুতা ভাবা যাবেনা। আমাদেরকে সহায়ক শক্তি হিসেবে ভাবতে হবে। আমাদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলে তা গ্রহণ করতে হবে। আর তা হলে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থাকতোনা।
জাতীয় পার্টি সংসদে সম্পূর্ণ মেকি বা কৃত্তিম বিরোধী দল নয় বলে দাবি করে জিএম কাদের বলেন, বর্তমান বিরোধী দল কৃত্তিমভাবে তৈরি-এটা কিছুটা হতে পারে, কারণ জাপা সরকারি জোটভুক্ত হয়ে নির্বাচন করেছে। তবে সম্পূর্ণ কৃত্তিম বিরোধী দল নয়। জিএম কাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে জনমনে সৃষ্ট প্রশ্ন সম্পর্কে এই জবাব দেন। বিরোধী দলীয় নেতা এইচএম এরশাদের অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলের পক্ষে মূল বক্তব্য রাখেন তিনি। জিএম কাদের বলেন, অনেকে বলেন সবকিছু পাতানো খেলা। জাতীয় পার্টি সরকারি জোটে থেকে নির্বাচন করেছে, এজন্য তারা মনে করছেন এখন হয়তো বিরোধী দলে থেকেও জাপা কার্যত সরকারের পক্ষ হয়েই কাজ করবে। বর্তমান যে সংসদীয় ব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, তাতে এখানে যারাই বিরোধী দলে থাকুক না কেন ফল কী হবে সবাই জানে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ