শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেলের ভোট বর্জন ॥ বিক্ষোভ ॥ আজ ধর্মঘট

ডাকসু নির্বাচনে গতকাল সোমবার কুয়েত মৈত্রী ও রোকেয়া হল হতে বিপুল পরিমাণ পূরণ করা/সিলমারা ব্যালট উদ্ধার করে শিক্ষার্থীরা -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যাপক অনিয়ম ও অভিনব কারচুপির মধ্য দিয়ে ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তা ভর্তি সিল মারা ব্যালট পাওয়া প্রাধ্যক্ষ অপসারণ, কোটা আন্দোলনের প্রার্থীর ওপর হামলা, রোকেয়া হলে ব্যালট বাক্স আলাদা করে রাখা, কৃত্রিম লাইন দেখিয়ে ভোটারদের ভোট দানে বাধা দেয়া, গণমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেয়ার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে নানা অভিযোগ এনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া সবক’টি প্যানেল ভোট বর্জন করেছে। একইসঙ্গে অবিলম্বে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তারা। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে আজ মঙ্গলবার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে তারা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি জানিয়েছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে। ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু’র নির্বাচন যতটা আশান্বিত করেছিল, ভোট শুরুর মুহূর্ত থেকে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগে ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ ও ‘কলঙ্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করে সংম্লিষ্টরা।
গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু’র নির্বাচনে সকাল থেকে ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ, এরপর দুপুরে ভোট বর্জন করেন ছাত্রলীগ ছাড়া সবক’টি প্যানেলের প্রার্থীরা। একইসঙ্গে তারা ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এসময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ভিসির বাসভবনের সামনে গিয়ে সেখানে অবস্থান নেন। এসময় তারা ভিসির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তারা বলেন, প্রহসনের নির্বাচন ছাত্রসমাজ মানে না। এসো ভাই এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন, যে ভিসি ছাত্রলীগের সেই ভিসি চাই না। ডাকসু নির্বাচনে প্রগতিশীল জোট ও স্বতন্ত্র জোটের নেতাকর্মীরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল নিয়ে প্রদক্ষিণ করে।
এর আগে বামজোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী, কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও ভিপি প্রার্থী নূরুল হক নুরু ও স্বতন্ত্র জোটের ভিপি পার্থী অরণি সেমন্তি খান তাদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেন। এ ছাড়া, রোকেয়া হল ও মুহসিন হলেও হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে কুয়েক মৈত্রী হল, সূর্যসেন হল ও রোকেয়া হলে কয়েক ঘণ্টার জন্য ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়।
এদিকে, নূরুল হক নুরু, অনিক ও লিটন নন্দীর প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সমর্থিত জিএস প্রার্থী ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তিনি অভিযোগ করেন, ওরা প্রশাসনকে জিম্মি করে এবং ব্যালট পেপার ছিনতাই করে তা ছড়িয়ে দেয়। এ কারণে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করে মামলা করা হোক।
আজ ধর্মঘট: গতকাল বেলা ১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রথমে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী চারটি প্যানেলের পক্ষে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। পরে পৃথক সাংবাদিক সম্মেলনে একই ঘোষণা দেন ছাত্রদল। এদিকে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে তারা।
লিটন নন্দী বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলে বস্তা ভর্তি সিল মারা ব্যালট পাওয়া গেছে। এস এম হলে ছাত্রলীগের ছাড়া অন্য কোনো দলের লিফলেটিং করতে দেয়া হয়নি।
রোকেয়া হলে ১ ঘণ্টা পর ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। রোকেয়া হলে ৩টা ব্যালট বাক্স আলাদা করে রাখা হয়। সেখানে বাক্স দেখতে চাইলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হন। তাদের উপস্থিতিতে ভিপি প্রার্থী নূরুল হক নুরুর ওপর আক্রমণ হয়। জিয়া হলে ভোট দিয়ে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। দুই-তিন ঘণ্টা হবার পরেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারছে না। মহসীন হলে আমরা ঢুকতে গেলে আমরা ঢুকতে পারি নাই।
এসব কারণে প্রশাসনের প্রতি ঘৃণা জানিয়ে আমরা ভোট বর্জন করছি। বর্জন করা প্যানেলের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, স্বাধীকার স্বতন্ত্র পরিষদ ও স্বতন্ত্র জোট।
পরে আলাদা সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্রদলও একই ঘোষণা দেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ভোট ডাকাতির এই নির্বাচন আমরা বর্জন করলাম।
কুয়েত মৈত্রী হলে সিল মারা ব্যালটের বস্তা, প্রাধ্যক্ষ পরিবর্তন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কুয়েত মৈত্রী হলে ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর হলের প্রাধ্যক্ষকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বেলা ১১টা ১০ মিনিট থেকে নতুন করে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। এ হলে ভোটগ্রহণ চলে বিকেল ৫টা ১০ মিনিট পর্যন্ত।
কুয়েত মৈত্রী হলে সিল মারা বস্তাভর্তি ব্যালট পাওয়া যায়। এ সব ব্যালটে ছাত্রলীগের হল সংসদের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেওয়া ছিল। এরপর এই হলের ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
কুয়েত মৈত্রী হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, গতকাল সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর কথা থাকলেও ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই অন্যান্য হলের মতো এখানেও ছাত্রীদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। সাড়ে সাতটার দিকে নির্বাচনে প্রার্থীরা হল প্রভোস্টের কাছে তাঁদের সামনে ব্যালট বক্স খোলার দাবি করেন। তবে তাঁদের সামনে বাক্স খোলা হয়নি। সকাল ৭ টা ৫০ মিনিটের দিকে হলে প্রক্টর আসেন। এরপর প্রক্টর ও হল প্রভোস্ট মিলে ব্যালট বাক্স হলের রিডিংরুমে নিয়ে যান। এরপর ছাত্রীরা গিয়ে রিডিংরুম থেকে বস্তাভর্তি ব্যালট পান। প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেছেন, সিল মারা ব্যালটের সত্যতার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।
এ ঘটনার পরই কুয়েত মৈত্রী হলে প্রাধ্যক্ষ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি মুহাম্মদ সামাদ। তিনি বলেন, কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহানকে অপসারিত করা হয়েছে। অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রাধ্যক্ষ করা হয়েছে। মুহাম্মদ সামাদ বলেন, যে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
বস্তাভর্তি ব্যালটে ছাত্রলীগ প্রার্থীদের নামের পাশে সিল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল থেকে বস্তাভর্তি সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করেন শিক্ষার্থীরা। ব্যালটে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল দেয়া ছিল বলে দাবি করেন তারা।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, সিটি ও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের নামের পাশে নির্ধারিত প্রতীকে সিল মেরে ভোট দেয়ার নিয়ম থাকলেও ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের নামের পাশে ক্রস চিহ্ন (ী) দিয়ে ভোট দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যালটে দেখা গেছে, ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের নামের পাশে ‘ক্রস’ দেয়া আছে।
এসব প্রার্থী হলেন, হল সংসদের সহ-সভাপতি পদের প্রার্থী রাজিয়া সুলতানা কথা, সাধারণ সম্পাদক শাওলিন জাহান সেঁজুতি, সহ-সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল হাওয়া আঁখি, সাহিত্য সম্পাদক সাবিকুন্নাহার মুন, সংস্কৃতি সম্পাদক কবিতা রায়, পাঠকক্ষ সম্পাদক তামান্না তাসনিন তমা, অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া সম্পাদক মেহের আফরোজ সুরভী, বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, সমাজসেবা সম্পাদক কোহিনুর খাতুন। এ ছাড়া ব্যালট পেপারে হল সংসদের চারটি সদস্য পদের প্রার্থীদের নামের পাশেও ক্রস চিহ্ন দেয়া রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ঢাবির উন্নয়ন ও অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মালিহা নওশিন খান বলেন, যেসব নামের পাশে ভোট দেয়া আছে, তারা সবাই ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত।
তবে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ছাত্রলীগ সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা। ছাত্রলীগ কখনও এ ধরনের কাজ সমর্থন করে না।
কুয়েত মৈত্রী হলের কিছু ছাত্রী অভিযোগ করেন, ব্যালটবাক্স আগে থেকেই জালভোট দিয়ে ভরা হয়েছিল। পরে ব্যালটবাক্স দেখতে চাইলে সেই জালভোট দেয়া ব্যালট পেপার বস্তায় ভরে অন্যত্র সরানোর অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রীরা।
মৈত্রী হলের ছাত্রীরা ভোটকেন্দ্রের সামনে জালভোট দেয়া ব্যালট পেপার নিয়ে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করছেন, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে কখনই সুষ্ঠু ভোট হওয়া সম্ভব নয়।
এক ছাত্রী বলেন, ব্যালটবাক্স স্টিলের তৈরি হওয়ার কারণে আমরা সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেটি চেক করে দেখতে চাই। কিন্তু হলের প্রভোস্ট শবনম জাহান আমাদের সেটি দেখতে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ রকম কোনো নিয়ম নেই। পরে অন্যান্য হলে দেখানো হচ্ছে জানালে তিনি বলেন, প্রক্টর এলে সেটি দেখানো হবে।
পরে প্রক্টরিয়াল বডি এলে ভোটকেন্দ্রের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, আর আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন কথা বলে ব্যস্ত রাখা হয়।
এভাবে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে আমরা কয়েকজন অনেকটা জোর করেই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করি। ভোটকেন্দ্রে একটি প্রধান দরজা আর পেছন দিকে আরেকটি দরজা ছিল। যার মাধ্যমে বাইরের দিক থেকে আসা-যাওয়া করা যেত।
আমরা ওই দরজা বন্ধ করার আবেদন জানালে প্রভোস্ট শবনম জাহান আমাদের নিজেদেরই সেটি বন্ধ করে দিতে বলেন। পরে আমরা একটি বড় তালা এনে সেটি বন্ধ করে দিই এবং চাবি আমাদের কাছে রাখি। কিন্তু আমরা যখন ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করি, তখন দেখি ওই তালাবদ্ধ দরজাটি খোলা। কিন্তু চাবি আমাদের কাছেই আছে। ওই দরজা দিয়ে দেখি জালভোট ভর্তি একটি বস্তা। আরও সামনে এগিয়ে বাথরুমে গিয়ে দেখি আরও কয়েকটি জালভোট ভর্তি বস্তা। পরে ছাত্রীরা হলগেটে দাঁড়িয়ে জাল ব্যালট মাটিতে বিছিয়ে প্রতিবাদ জানান। এরপর ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
পরে মৈত্রী হলের প্রভোস্ট শবনম জাহানকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীনকে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ভারপ্রাপ্ত প্রাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
সাতসকালে দীর্ঘ লাইন: সকাল আটটায় ভোট শুরু হয়েছে। একটানা বেলা দুইটা পর্যন্ত চলে। সকাল আটটায় বিজয় একাত্তর হলে গিয়ে দেখা যায় ভোটারদের লম্বা লাইন। ঠিক আটটার দিকে ভোটকক্ষে উপস্থিত প্রার্থীদের সামনে ব্যালট বাক্স খুলে দেখান নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা।
খালি ব্যালট বাক্স সবাইকে দেখানোর পর তা সিলগালা করা হয়।
বিজয় একাত্তর হল সংসদের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও হল প্রাধ্যক্ষ এ জে এম শফিউল আলমবলেন, প্রার্থীদের সামনেই ব্যালট বাক্সগুলো খুলে দেখানো হয়েছে। কেউ যেন এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করতে না পারে। ভোট গ্রহণ শেষে আবার সবার সামনে সেটি খোলা হবে। তিনি বলেন, এর স্বচ্ছতা নিয়ে আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ নেই।
এরপরই শুরু হয় বহু প্রতীক্ষার ভোট। নিয়ম অনুযায়ী, আবাসিক হলগুলোয় এই ভোট গ্রহণ হয়।
বিজয় একাত্তর হলে ভোট দিয়ে বের হয়ে এসে এস এম লতিফুল খাবির নামের এক প্রার্থী বলেন, ভোট নিয়ে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সমস্যা দেখেননি। তিনি এই হল সংসদে প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের ব্যানার থেকে সংস্কৃতি সম্পাদক পদে নির্বাচন করছেন। তবে ৩৮টি (ডাকসু ও হল সংসদ মিলে) ভোট দিতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগছে বলে তিনি জানান। এ কারণে বেলা দুইটার মধ্যে সব ভোটারের ভোট নেওয়া শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি।
এই নির্বাচনে প্রচার পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও শেষ মুহূর্তে অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে (স্টিলের বক্স) ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত জানানো, ভোটকক্ষে প্রার্থীদের এজেন্ট না রাখাসহ বেশ কিছু অভিযোগের কারণে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য প্রায় সব প্রার্থী সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ভিপি প্রার্থী নুরের ওপর ছাত্রলীগের হামলা: ডাকসুর সহ-সভাপতি প্রার্থী নুরুল হক নুরের ওপর হামলা হয়েছে। তিনি সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে নির্বাচন করেন।
পরিষদের একাধিক ছাত্র অভিযোগ করেন, দুপুরে রোকেয়া হলের একটি কক্ষে সিলগালা করা তিনটি ব্যালট বাক্স গোপনভাবে রাখা হয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নুরুল হক এবং পরিষদের কয়েকজন সদস্য হল প্রভোস্টের কাছে যান। তাঁরা ওই কক্ষের ভেতরে কী আছে, তা দেখতে চান। সেখানে থাকা পরিষদের সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী আকরাম হোসেন অভিযোগ করেন, হল প্রভোস্ট তাঁকে ওই কক্ষে যেতে বাধা দিয়েছেন। প্রক্টর ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার না আসা পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
এর একটু পরে প্রক্টর গোলাম রাব্বানী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার মফিদুর রহমান, প্রভোস্ট জিনাত হুদা, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এরপর তাঁদের সামনেই তাঁরা ওই ঘরে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে নুরুল হক বাইরে এসে সেখানে কী আলোচনা হয়েছিল, সেটা বলতে গেলে তাঁর ওপর হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলছেন, ছাত্রলীগের নারী কর্মীরা নুরুল হকের ওপর হামলা করেন। এ সময় তাঁকে মাটিতে ফেলে আঘাত করা হয়। হামলার পর নুরুল হককে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। গণমাধ্যমের একটি গাড়িতে করে বেসরকারি একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেন, নুরুকেই জিজ্ঞেস করেন তিনি কেন ছাত্রীদের হলে গিয়েছিলেন। একটি চক্র এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
রোকেয়া হলে বাক্সে সিল ব্যালট: রোকেয়া হলের ছাত্রীরা অভিযোগ করেন, হলে মোট নয়টি ব্যালট বাক্সে ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার সময় ছয়টি ব্যালট বাক্স দেখানো হয়। এ নিয়ে শুরু থেকেই তাঁদের মধ্যে সন্দেহ করছিল, বাকি তিন ব্যালট বাক্স গেল কোথায়। এ নিয়ে ছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। পরে তাঁরা জানতে পারেন, পাশের একটি কক্ষে ওই তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হয়েছে। পরে ছাত্রীরা কক্ষটির দরজা ভেঙে ওই তিনটি ব্যালট বাক্স বের করে বাইরে নিয়ে আসেন। পরে তাঁরা ওই ব্যালট বাক্সগুলোর তালা ভেঙে দেখেন, সেগুলোয় ব্যালট পেপার ভরা। তবে সেগুলোয় ভোট দেওয়া ছিল না। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, এত ব্যালট পেপার কেন? সেগুলো লুকিয়েই বা রাখা হবে কেন?
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে ভোট গ্রহণ স্থগিত হয়। এর আগে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে রোকেয়া হলে আসেন ছাত্রলীগ, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার আন্দোলনের প্রার্থীসহ আরও বেশ কয়েকজন প্রার্থী। পরে সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার আন্দোলনের ভিপি প্রার্থী নুরুল হককে মারধর করেন ওই হলের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
এখন হলের ভেতরে ছাত্রীরা এ ঘটনার পর থেকে বিক্ষোভ করে। রোকেয়া হলের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা হলের হাউস টিউটর দিলারা জাহান বলেন, রোকেয়া হলে মোট ভোটার ৪ হাজার ৬০০। এর মধ্যে দুই হাজার বেশি ব্যালট ভোট কক্ষে আনা হয়। বাকিগুলো পাশে রাখা হয়েছিল। এগুলো শেষ হলে পরে সেগুলো নিয়ে আসা হতো। কিন্তু সেগুলো কে বা কারা ভেঙে ছিনতাই করল।
নূরের ওপর হামলাকে ‘নাটক’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নূরের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস প্রার্থী) গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, ‘সে (নুরুল) সেই পুরনো কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন- যে গুজব হইছে। প্রোপাগান্ডা। সেটারই আরও একটা নাটক চলতাছে এইখানে।’
গতকাল সোমবার রোকেয়া হলের সামনে সাংবাদিকদের রাব্বানী বলেন, কোটার যারা আছে, ছাত্রদল, শিবিরের তিনজন আছেই, বাম- এসব মিলে ছাত্রলীগকে ঠেকানোর জন্য ছেলেদের কোনো হলে যেহেতু কিছু করতে পারে নাই ষড়যন্ত্র করে। আমাদের বোনদের বিভ্রান্ত করার জন্য এখানে যখন ভিতরে গেল, এত নাটক করে।
অথরিটি নাই। ভিতরে যখন গিয়েছে, তিনটা বক্স খুলেছে। কিছুই পায় নাই সেখানে। সো, সে বাইরে এসে সে এটা বলতে পারতো যে, “আমি কিছু পাই নাই।” কিন্তু সে এমন একটা অভিনয় করল, সবাইকে বিভ্রান্ত করল আবার।’
ভোট বন্ধ কিনা এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একদম প্ল্যান করে কাজগুলো করতাছে। আর মিডিয়াগুলা ওইখানে থাকার কারণে কিন্তু তারা আরও উসকাচ্ছে।’ এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা চলে আসলে কিন্তু এই প্রবলেমগুলো হতো না।’
ভোট দেননি ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ‘ব্যাপক অনিয়মের’ অভিযোগ তুলে ভোট দেননি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান।
বেলা পৌনে ১২টার দিকে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি প্রহসনের নির্বাচন হচ্ছে। গোটা নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে। ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জালভোট, রাতেই ভোটদান, হামলা যা করা দরকার সবই তারা করছেন। এ কারণে এর প্রতিবাদে এখনও ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছি। অন্যান্য হল পরিদর্শন করে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নেব।
ছাত্রদল ভোট বর্জন করবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দুপুরের মধ্যে সব হলের প্রার্থীদের নিয়ে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব ভোট বর্জন করব কিনা।
ছাত্রদলের এ প্রার্থীর অভিযোগ, সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রদলের প্রার্থী ও ভোটারদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। শুনেছি রাতেই সুফিয়া হলে ব্যালটভর্তি করে রাখা হয়েছে। সেই অভিযোগ পেয়ে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম।
সূর্যসেন হলের অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘সূর্যসেন হলের প্রাধ্যক্ষ প্রফেসর মাকসুদ কামাল নিজে ছাত্রদলের প্রার্থীদের বের করে দিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে যেসব অনিয়মের কথা শুনতে পাচ্ছি, তাতে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভোট না দেয়ার।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এ ছাত্রনেতা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি পবিত্র জায়গায় শিক্ষকরা বিবেকহীনভাবে নির্লজ্জের মতো সরকারের নির্দেশে ছাত্রলীগের হয়ে কাজ করছেন। কুয়েত মৈত্রী হলে উদ্ধার হওয়া বস্তাভর্তি জালভোট তার প্রমাণ।
এর আগে সকালে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগ করেন মোস্তাফিজুর। এফ রহমান হল ও হাজী মোহাম্মদ মুহসীন হলের ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ দেখে তিনি এ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে। হলের ফটকে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকরা অবস্থান নিয়ে আছে। ছাত্রদলের প্রার্থীদের কেন্দ্রে ঢুকতে দিচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল- ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ গেটের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টো। আমরা দেখছি গোটা নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে।
ভোটকেন্দ্রে কৃত্রিম লাইন তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে ছাত্রদলের এ ভিপি প্রার্থী বলেন, ভোটকেন্দ্রে কৃত্রিম একটি লাইন তৈরি করে রাখা হয়েছে। লাইনে যারা দাঁড়িয়েছেন তারা সাধারণ ভোটারদের প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না।
দুইটা বাজতেই লাইন উধাও: নির্বাচনের সময় শেষ হওয়ার পূর্বেই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ছাত্রলীগের মিছিল বের হয়। মিছিলটি হয় দুপুর দেড়টার দিকে। এসময় নির্বাচনে ভোট দিতে আসা ভোটাররা বাধার সম্মুখীন হন। মিছিলের জন্য ভোট গ্রহণ বন্ধ থকে প্রায় ২০ মিনিট। এছাড়া কেন্দ্রের বাইরে কয়েকশ লোকের লাইন থাকলেও দুইটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে তা উধাও হয়ে যায়। এ সময় হলের প্রাধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান পাশে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন যা হওয়ার তাই হয়েছে। এখন মিছিল বন্ধ করো।
নির্বাচনী সময় শেষ হওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট পূর্বে ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থী ও হল নেতারা পূর্বের ন্যায় ছাত্রলীগ কর্মী ও শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে দেয়। এরপর সময় শেষ হওয়ার আগেই গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের অধিকাংশের আগে ভোট দেয়া হয়ে গেছে।
এরমধ্যে সাধারণ ভোটার নেই বলে জানান লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ভোটার।
মহসীন হল ছাত্রলীগের ‘নিয়ন্ত্রণে’: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলে ভোটারদের লাইন ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভোটাররা।
তাদের অভিযোগ, মহসীন হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানির নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ভোটারদের লাইন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করায় অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভোটার বলেন, ছাত্রলীগের অবস্থানের ভয়ে অনেকেই ভোট দিতে আসছে না। ছাত্রলীগ হলের প্রবেশমুখ থেকে ভোটার লাইন নিয়ন্ত্রণ করছে।
এ বিষয়ে হলের রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ জানাতে এসে ছাত্রলীগের ধাওয়ার মুখে পড়েন প্রগতিশীল ছাত্র জোটের ভিপি পদপ্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী ।
তার অভিযোগ, মহসীন হলের গেইট দিয়ে ঢুকে হলের আবাসিক শিক্ষকদের বাসভবন এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ‘হামলার শিকার’ হন।
লিটন নন্দী বলেন, হলের কেন্দ্র ছাত্রলীগ দখল করে আছে। আমি অভিযোগ জানাতে গেলে তারা আমার ওপর হামলা চালায়। আমরা পরে অন্যভাবে আমাদের অভিযোগ জানিয়েছি। তবে মনে হয় না কোনো ব্যবস্থা নেবে। এক ধরনের প্রহসনের নির্বাচন আয়োজনের সব ব্যবস্থা তারা সম্পন্ন করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে হলের প্রাধ্যক্ষ নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ভোটারদের লাইন মেহেদী হাসান সানি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। দেখি কী করা যায়!
তবে ছাত্রলীগ নেতা সানি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কোনো নিয়ন্ত্রণ করছি না আমরা। হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরাই প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে আছে।
ছাত্রলীগকে জিতিয়ে দিতেই আচরণবিধি লঙ্ঘন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ আচরণবিধি লঙ্ঘন করে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রদল, বাম ও স্বতন্ত্র জোট প্যানেলের প্রার্থীরা। গতকাল সকাল থেকে ভোট চলাকালে হলে হলে (ভোটকেন্দ্রের ভেতরেসহ) ছাত্রলীগ কর্মীদের অবস্থান, হলের সামনে দফায় দফায় মোটরসাইকেলের মহড়া, ভোটারদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন তারা।
ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগকে জিতিয়ে দিতে আচরণবিধি লঙ্ঘণ করে যা ইচ্ছে তাই করা হলেও প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
স্বতন্ত্র জোট প্যানেলের ভিপি প্রার্থী অরণী সেমন্তি খান বলেন, দখলদারিত্ব দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, হলে সামনে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
ছাত্রলীগের প্রার্থী সমর্থক ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠন ও জোটের প্রার্থীদের অভিযোগ, সকাল থেকে ছাত্রলীগের কর্মীরা হলের সামনে কয়েক দফা মোটরসাইকেলে করে মহড়া দেয়। ভোট শুরুর আগে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভোটারদের প্রভাবিত করতে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর মধ্যদিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘণ শুরু করে। ফুল দিয়ে বরণ করার বিষয়ে হোম ইকোনমিক্স কলেজের ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কানিজ ফাতেমা সোনিয়া বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে শাহবাগ মোড়ে ভোটারদের ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছি। আমরা শোভন-রাব্বানী-সাদ্দাম পরিষদের ভোট চাইছি ভোটারদের কাছে।’
সাধারণ ছাত্ররা জানান, রোকেয়া হলের ভোটকেন্দ্রেও ভোটারদের ফুল দেওয়া হয়েছে। যদিও ব্যালট স্লিপ ছাড়া ভোটারদের অন্যকিছু দেয়া নির্বাচনিবিধির লঙ্ঘন। সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর আগে এবং ভোট চলাকালে ছাত্রলীগের প্রার্থী ও সমর্থকরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। ভোটের লাইনে ঢুকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ‘ছাত্রলীগকে ভোট না দিলে খবর আছে’ বলেও হুমকি দেয়া হয়।
ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র লীগের সভাপতি সঞ্জিব চন্দ্র দাস বলেন, ‘কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।’
তবে ছাত্রদলের ভিপি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনে যে আচরণবিধি রয়েছে, ছাত্রলীগের কর্মকা- দেখে তা মনে হচ্ছে না। যখন যা খুশি তারা তা-ই করছে। প্রশাসন সুনিশ্চিতভাবে ছাত্রলীগকে জিতিয়ে দেয়ার জন্য তাদের আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রভাব খাটানোটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, ব্যবস্থাও নিচ্ছে না।’
স্বতন্ত্র জোট প্যানেলের ভিপি প্রার্থী অরণী সেমন্তি খান বলেন, ‘প্রতিটি হলে ছাত্রলীগ দখলদারিত্ব দেখানোর চেষ্টা করছে। হলের সামনে অবস্থান নিয়েছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।’
 সকাল সোয়া ৯টার দিকে রোকেয়া হলের সামনে তিন ছাত্রীকে ফুল দিয়ে ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রে আমন্ত্রণ জানাতে দেখা যায়। তিন মেয়ে শিক্ষার্থী ভোটারদের হাতে ফুল দিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর প্রচারপত্র বিলি করেন।
স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী আসিফুর রহমান বলেন, ভোটারদের লাইনে ঢুকে ফুল দেয়া নির্বাচনের আচারণবিধি লঙ্ঘন। এটা কেউ করতে পারে না। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি।
তোপের মুখে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা: নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়ম হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমান। পরে তিনজন শিক্ষার্থী তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
গতকাল দুপুর পৌনে ২টার দিকে রোকেয়া হল থেকে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা বের হওয়ার সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পরপরই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করে স্বতন্ত্র ও বামজোটের বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা। বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল থেকে একবস্তা সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করা হয়। শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের প্রতিবাদের মুখে প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। এরপর পুনরায় বেলা ১১টা ১০ মিনিটে ভোট শুরু হয়। এছাড়াও রোকেয়া হল, সূর্য সেন হলসহ আরও কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ আনে সাধারণ শিক্ষার্থী, বামজোট প্যানেল ও কোটা আন্দোলনের প্যানেল। অনিয়ম এনে দুপুরে তারা ভোট বর্জন করার ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ করে। এসময় রোকেয়া হল থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যালট নিয়ে প্রতিবাদ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এতে ওই হলেও ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক এস এম মাহফুজুর রহমান আসেন। তিনি কেন্দ্রের অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় তিনি তোপের মুখে পরেন।
প্রোভিসির গাড়ি ঢেকে গেল ‘লজ্জার ব্যালটে’: ছাত্রলীগ প্যানেলের প্রার্থীদের পক্ষে সিল মারা এক বস্তা ব্যালট পেপার উদ্ধারের ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হল। ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই রাতের আঁধারে জাল ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ও প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানিকে অবরোধ করা হয়েছে।
বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা প্রোভিসির প্রাইভেটকারটি জাল ভোটের ব্যালট দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। তারা বলছে- এ ভোট লজ্জার ভোট। প্রাধ্যক্ষ শবনম জাহানকেও হলে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকারীরা জানান, সকালে খালি বাক্স দেখাতে বললে- গড়িমসি করায় তাদের সন্দেহ হয়। পরে রিডিং রুম থেকে ছাত্রলীগ প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট দেয়া ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়।
প্রোভিসি ও প্রক্টর দুজনেই আগাম জাল ভোটের সতত্যা পাওয়া গেছে বলে স্বীকার করেছেন। তারা বিষয়টিকে অনাকাক্সিক্ষত উল্লেখ করে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন। একই সঙ্গে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিতেরও ঘোষণা দেন।
প্রসঙ্গত ২৮ বছর পর অনুষ্ঠেয় ডাকসু নির্বাচন সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে। মোট ভোটার এতে ৪৩ হাজার ২৫৬ জন। ভোটারের মধ্যে ছাত্র ২৬ হাজার ৯৪৪ এবং ছাত্রী ১৬ হাজার ৩১২ জন।
ডাকসুতে ২৫ পদে নির্বাচন হয়েছে। বিভিন্ন পদের মধ্যে আছে ভিপি, জিএস, এজিএস একটি করে ৩টি। আরও আছে- সম্পাদকীয় ৯টি এবং ১৩টি সদস্যপদ। এসব পদের জন্য বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্রসহ প্রার্থী ২২৯ জন। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্রসহ ভিপি ২১, জিএস ১৪ জন।
ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ১৩টি প্যানেল। অন্যদিকে প্রত্যেক হল সংসদে ১৩টি পদে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ভিপি, জিএস, এজিএস একটি করে তিনটি। আরও আছে সম্পাদকীয় ৬, সদস্য ৪টি। হল সংসদ (১৮টি হল, ২৩৪ পদে) প্রার্থী ৫০৯ জন। হল সংসদ ও ডাকসু মিলিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গড়ে ৩৮টি করে ভোট দিতে হবে। সুষ্ঠুভাবে ভোটের কাজ শেষ করতে রিটার্নিং অফিসারসহ (আরও) ৪২ জন কাজ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ