বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খেলাপিদের বড় সুযোগ দানের উদ্যোগ মন্ত্রণালয়ের

স্টাফ রিপোর্টার: খেলাপি ঋণে ডুবছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। নানা কৌশল অবলম্বন করেও রিকভারি করা যাচ্ছে না। মুখে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও ঋণখেলাপিদের জন্য আবারও বড় সুযোগ  দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে শিথিল হচ্ছে নীতিমালা। অবস্থা এমন যে মুখে গরম ভিতরে নরম। বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠিত ঋণও যাতে নতুন করে পুনঃতফসিল সুবিধা পায়, তার আয়োজন চলছে। খেলাপি ঋণের হিসাবায়নে শিথিলতা এবং পুনঃতফসিলে ডাউন পেমেন্ট কমানোর প্রস্তাবও বিবেচনা করা হচ্ছে। 

জানা গেছে সরকার ব্যাংক খাতে ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করতে চায়। আর এ কারণেই এভাবে গরম হয়ে নয়। বিছুটা নরম হয়ে কৌশলে এ ঋণ আদায় করতে চায়। এর আগে ঋণ আদায়ে নানাভাবে কঠোর এমনকি একের এক মামলা করেও কোন কাজে আসেনি। এতে উল্টো সরকারের আরও ব্যয় বেড়ে যায়। ব্যাংকগুলোতে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আইনী লড়ায়ে ব্যয় করতে হচ্ছে। বছরের পর বছর আইনী লড়ায়ে এ টাকা ব্যয় করলেও কোন সুফল পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।

আর এ কারণেই এভাবে কৌশলে কিছুটা নমনীয় হয়ে চায় অর্থমন্ত্রণায়ল। এর আগে নানান ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করা হলেও খেলাপি ঋণ আদায় তেমন হয়নি, বরং বেড়েছে। নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে ঋণখেলাপিদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ কমাতে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখতের নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে শিগগিরই এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। জায়েদ বখত কমিটির সুপারিশের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত নিয়েছে বলে জানা গেছে। 

তবে ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে কোনো নির্দেশনা দেবে, নাকি সামগ্রিক ব্যাংক খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিতে বলা হবে, তা এখনও আলোচনার পর্যায়ে। আর এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ঋণখেলাপিরা সমাজ এবং সরকারে একটা শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। এখন তাদের ঠেকানো বেশ কঠিন। এসব খেলাপি অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করে সুবিধা নেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে। এ অবস্থায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে, পুনর্গঠিত ঋণ ১৫ বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি প্রস্তাব  তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ইব্রাহীম খালেদ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, এর মানে ঋণখেলাপিদের আমৃত্যু ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে হবে না।

 ব্যাংকিং খাতে খেলাপির পরিমান বাড়ছেই। দেশের ৫৮ ব্যাংকের মধ্যে ৫৭ ব্যাংকে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেই বেড়েছে তার চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জনতা ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। আর অন্য ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১৩১ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা যা ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জনতা ব্যাংকে খেলাপি বেড়েছে ১০ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ব্যাংক খাতে যে শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি রয়েছে তার এক-চতুর্থাংশই জনতা ব্যাংকের। খেলাপি ঋণের মধ্যে কেবল দু’টি গ্রুপের কাছেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ। ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এরই মধ্যে ব্যাংকটির পুরনো ঢাকার ইমামগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর করপোরেট শাখার বৈদেশিক ব্যবসার লাইসেন্স (এডি লাইসেন্স) বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই দুটি শাখায় এলসি (ঋণপত্র) খোলাসহ বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির ওপরে।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা বেড়েছে ৩১টি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা ছিল ৫৭টি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮টিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, নতুন বছরের শুরু থেকেই আন্তঃব্যাংক মুদ্র্রবাজার থেকে ধার বাড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। কলমানি (আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার) থেকে এখন প্রতিদিনই ব্যাংকটিকে ধার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জনতা ব্যাংক। অথচ সেই জনতা ব্যাংকে এখন সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ। ব্যাংকটিতে দীর্ঘদিন সুশাসন না থাকার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ