বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সৌদি আরবের সঙ্গে দুই চুক্তি  চার সমঝোতা স্বাক্ষর

স্টাফ রিপোর্টার: বিদ্যুৎ ও জনশক্তিসহ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সংক্রান্ত দুইটি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সৌদি-বাংলাদেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে। সেই কমিটির নাম হবে সৌদি-বাংলাদেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি ফর ইনভেস্টমেন্ট। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ-সৌদি বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল’ গঠনেরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তার কার্যালয়ে সৌদি প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব চুক্তি ও সমঝোতায় সই করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থার প্রতিনিধিরা। এর আগে  রাজধানীর একটি হোটেলে সফররত সৌদি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বৈঠকে বসে। আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোতে সৌদি আরবকে বিনিয়োগের আহবান জানানো হয়। সৌদি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার প্রদেয় বিভিন্ন সুবিধা, প্রণোদনা, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও এর প্রতিকার বিষয়ে মতবিনিময় করেন। 

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলামসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। আর সৌদি আরবের এ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব রয়েছেন দেশটির অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মেদ আল তোয়াইজরি এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক মন্ত্রী ড. মাজিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসাবিসহ দেশটির উচ্চপর্যায়ের ছয়জন ওই প্রতিনিধি। এছাড়াও দলটিতে সৌদি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা, দেশটির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি কোম্পানির প্রতিনিধিসহ প্রায় ৩৫ জন রয়েছেন।

পরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, সৌদি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তারা আমাদের চাহিদা জানতে চেয়েছে। আমরা বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কথা বলেছি। এরমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম- কক্সবাজার ট্রেন, ঢাকা-বরিশাল ট্রেন লাইনসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প। আমরা তাদের কাছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা বলেছি। তারা সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে একটি কমিটি করার প্রস্তাব করলেন। সৌদির অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী থাকবেন সেই কমিটির প্রধান। নাম হবে সৌদি-বাংলাদেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি ফর ইনভেস্টমেন্ট। এ কমিটিতে আমাদের পক্ষ থেকে কয়েকজন মন্ত্রী থাকবেন। তারা দ্রুত আমাদের প্রজেক্টগুলো নিয়ে স্টাডি করবেন এবং তাদের মতামত আমাদের জানাবেন। আমি আশ্বস্ত যে দ্রুত আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবো। যার কাছে ফান্ড তিনি যেহেতু এই কমিটির প্রধান সেহেতু আমারা দ্রুততার সাথে এগিয়ে যেতে পারবো। 

একইসাথে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সরকারি প্রতিনিধি দলকে রিয়াদের একটি কনফারেন্সে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে সৌদি আরবের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক মন্ত্রী ড. মাজিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসাবি বলেছেন, আমরা বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ-সৌদি বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল’ সৃষ্টি করতে পারি।

আবদুল্লাহ আল কাসাবি বলেন, আমাদের বাংলাদেশি ভাইরা গত এক দশকে সৌদি আরবের উন্নয়নে সহায়তা করেছে। প্রায় দুই মিলিয়ন বাংলাদেশি সৌদি আরবে আছেন। যারা নতুন সৌদি আরব গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। দুই দেশের ব্যবসায়ীক সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-সৌদি আরব বাণিজ্যিক লেনদেন বেশ কম। উভয় দেশের মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ১.৪ বিলিয়ন ডলার, যা সন্তোষজনক নয়। আমি আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি আমরা সহায়তা, কাজ ও সুযোগের সন্ধানে এখানে এসেছি। আশা করি এই বৈঠক ফলপ্রসু হবে। আমরা নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঠিক করতে পারব। এ সময় ‘বি টু বি’ (ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়ীর), ‘জি টু জি’ (সরকারের সঙ্গে সরকারের) এবং ‘বি টু জি’ (ব্যবসায়ীর সঙ্গে সরকারের) অংশীদারিত্ব মূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে রিয়াদে একটি উন্মুক্ত সংলাপে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।

আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১১ থেকে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হবে। যা আগামী পাঁচ বছরের দুই অংকের হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত হবে। আমাদের আশা ২০৩০ সালের মধ্যে ৩১তম এবং ২০৪১ সালে ২০তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হওয়া।

চুক্তি ও সমঝোতা: চুক্তির মধ্যে একটি হলো- ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র (সোলার আইপিপি) নির্মাণে সৌদি আরবের আলফানার কোম্পানির (অষভধহধৎ ঈড়সঢ়ধহু) সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (ইজিসিবি)। ইজিসিবির পক্ষে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুণ কুমার সাহা এবং আলফানার কোম্পানির পক্ষে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট খালিদ বিন কাবেল আল সুলামি এ চুক্তিতে সই করেন।

অন্যটি হলো- ট্রান্সফর্মার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সৌদি কোম্পানি ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইমেনশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফেকচারিং কোম্পানি লিমিটেড। জেনারেল ইলেকট্রিকের পক্ষে ব্যবস্থানা পরিচালক সুলতান আহমেদ ভূইয়া এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইমেনশনের পক্ষে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিন নাজিব আল হাজি চুক্তিতে সই করেন।

এছাড়া সমঝোতা  স্মারকগুলো হলো- এক. বাংলাদেশ সরকারের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণব্যুরো (বিএমইটি) এবং সৌদি আরবের আল মাম ট্রেডিং এস্টেটের মধ্যে জনশক্তি রফতানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিএমইটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক এসকে রফিকুল ইসলাম এবং আল মামের চেয়ারম্যান ইউসুফ আবদুল্লাহ আল মুশির এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন।

দুই. ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ প্ল্যান্ট নির্মাণে সৌদি আরবের ইউসুফ আল রাজি কনস্ট্রাকশন এস্টেটের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল হালিম এবং বিনিয়োগকারী কোম্পানির ইউসুফ বিন আব্দুল্লাহ আল রাজি এই সমঝোতায় সই করেন।

তিন. সৌদি-বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব বায়ো-মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সৌদি আরবের আল আফালিক গ্রুপ (এএইচ গ্রুপ) এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুল হালিম এবং এএইচ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এস আলফালেক এতে সই করেন।

চার. বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) এবং রিয়াদ কেবলস গ্রুপ অব কোম্পানির মধ্যে তার উৎপাদনের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে। শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম এবং রিয়াদ কেবলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মুস্তাফা মোহাম্মদ রাফিয়া এই এমওইউতে সই করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই সৌদি মন্ত্রীর বৈঠকের বিষয়ে প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বলেন, তারা সৌদি বাদশাহ ও ক্রাউন প্রিন্সের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তারা বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। এবং তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী তাদের স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন বলে জানান প্রেস সচিব। লালমনিরহাটে এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে আইন পাস করা হয়েছে। 

এর আগে সৌদি আরবের ৩৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে গত বুধবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান দেশটির দুই মন্ত্রী। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, সৌদি প্রতিনিধি দলের এই সফরে অন্তত ১৬টি প্রকল্পে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আসবে বলে আমরা আশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ