বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ওমর খালেদ রুমির “জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প”

কাজী রফিকুল ইসলাম : সুন্দরতা। একটা গুণ। একটা প্রসঙ্গ। বড় ধরনের প্রসঙ্গ। প্রকৃতি আর জীবনের মৌলিক প্রতিচ্ছবি। সুন্দরতা নিয়েই অসংখ্য ছোট গল্প লিখেছেন গল্পকার ওমর খালেদ রুমি। প্রকৃতি আর জীবনের সুন্দরতা নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প’ গ্রন্থটি। এ গ্রন্থের প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৮। মূল্য ২৫০ টাকা। প্রকাশনায় মিজান পাবলিশার্স, ৩৮/৪, বাংলা বাজার, ঢাকা। পরিবেশক একুরেট পাবলিকেশন্স, ঢাকা। প্রচ্ছদ এঁকেছেন হাসানুজ্জামান খান। মুদ্রণে ডিজাইন ঘর, কেসিসি মার্কেট, খুলনা। গল্পকার গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে। জন্মজনক ও শিক্ষকদের প্রতি তার অন্তরের শ্রদ্ধা একান্তভাবে নিবেদিত। গ্রন্থটির নামকরণও করেছেন জন্মজনকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে।

গল্পকার ওমর খালেদ রুমি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ইতিহাস বিশ্লেষক, রাজনীতিক ও দক্ষ অনুবাদক। তার ইংরেজি ভাষার সাহিত্যকর্মে প্রকাশিত গ্রন্থ সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করে। তিনি অসংখ্য গ্রন্থ প্রণেতা। তার উপন্যাস ১০টি, ছোট গল্পের বই ১৫টি, রাজনৈতিক বই ১২টি, কাব্যগ্রন্থ ১৮টি, ১০টি ব্যাংকিং বই, ৩টি অনুবাদ গ্রন্থ, অন্যান্য কয়েকটি গ্রন্থসহ সর্বমোট প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শ’য়ের কাছাকাছি। তার ছোট গল্প বৈচিত্র্যময়। বিচিত্রতায় সমৃদ্ধ। দু একটি ছোট গল্প ছাড়া প্রতিটি লেখায় স্বাতন্ত্র ও সমৃদ্ধি রয়েছে।

জ্যোৎস্না ও জনকের গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় গল্পকার লিখেছেন, “আমি তাহলে ভাগ্যবান। কিন্তু জ্যোতিষ যে বললো, হাতে কিছু নেই। না মান, না সম্মান, না অর্থ, না কিছু। সুন্দরী নারী তো নয়ই। পাথরেও কাজ হবে না। এই হাতে কড়া পড়েছে। রেখাগুলো পথ হারিয়ে দিশেহারা। আয়ও খুব একটা বেশি নয়। এসব তাহলে কেমন করে হচ্ছে।”

“গেলেমান” নামক ছোট গল্পে তিনি লিখেছেন, “গেলেমানকে তো মনে হচ্ছে যে কোনো পুরস্কারের চেয়েও জীবন্ত। হোক না তা নোবেল পুরস্কার।” এটি একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র। জ্যোৎ¯œা ও জনকের গল্প’ নামক ছোট গল্পে এই গেলেমান চরিত্রটি এক অনন্য সৃষ্টি।

সব ছোট গল্পের মধ্যে কিছু কিছু ছোটগল্প অবশ্যই মানোত্তীর্ণ ও কালজয়ী হয়। অনেক গল্পকার এভাবে পাঠকের প্রশংসা অর্জন করেছেন। তারাশংকরের ‘তারিনী মাঝি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোষ্ট মাস্টার’ ছোটগল্প হিসেবে নিঃসন্দেহে কালজয়ী ও সমৃদ্ধ লেখা। ছোটগল্পের ছোট কাহিনী বা খন্ডকাহিনী নির্মানে গল্পকার ওমর খালেদ রুমির পারঙ্গমতা সহজেই চোখে পড়ার মতো। তার ‘জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প’ গ্রন্থের নামকরণ অনুযায়ী গ্রন্থের ২০টি ছোটগল্পের মধ্যে একটির নাম “জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প”। গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প। যা আমার কাছে মনে হয়েছে। 

এই ছোট গল্প শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ চরিত্রটি হলো গেলেমান। গেলেমান একটি রাজনৈতিক চরিত্র। বাংলাদেশের  রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অতীত ইতিহাসের চর্বিতচর্বন নিয়ে গেলেমান চরিত্রটিকে ভাবনার তলানীতে সমাজতন্ত্রী এবং বর্তমান রাজনীতির তলানীতে গণতন্ত্রী হিসেবে দেখাতে গিয়ে গল্পকার ওমর খালেদ রুমি তার চাতুর্যমন্ডিত অভিজ্ঞতায় আশ্চর্যজনকভাবে পরিস্ফুটিত করে তুলেছেন। যা যে কোনো গল্পকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এই চরিত্রটি নির্মাণে গল্পকার ঐ গল্পে সুন্দরতার পরিস্ফুটনে যথার্থই লিখেছেন,

“গেলেমানের সম্পর্কে আমি কিছু জানতাম না। না জানারই কথা। কারণ গেলেমানকে আমি কখনো দেখিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও গেলেমান আমার মস্তিকের ভেতর ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করলো।”

গল্পকার ও ঔপন্যাসিক আবুল মনসুর আহমদের মতো ওমর খালেদ রুমি তার ছোটগল্পে আত্মবাণীতে এভাবে ইতিহাস বিশ্লেষক রাজনীতিক হিসেবে গেলেমান চরিত্রটি সৃষ্টি করে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। পাশাপাশি ‘জ্যোৎ¯œা ও জনকের গল্প’ গ্রন্থে আরো ১৯টি ছোটগল্পে তার লেখনীর শিল্পশৈলী বিদ্যমান। সুন্দরতা সৃষ্টিতে সুন্দরতার আর একটি বৈশিষ্ট্য বা গুণ হলো প্রেম। প্রেমের খন্ড কাহিনী গ্রন্থটির প্রথম ছোট গল্পে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এই ছোট গল্পে সেতারা ও মান্নানের প্রেম আদর্শিকতায় প্রতিভাত হয়েছে। 

ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ বিরোধী গল্পকার ওমর খালেদ রুমি সার্বজনীনতায় বিশ্বাসী। ‘কারিগর’ নামক ছোট গল্পে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনোহর কারিগরের চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে নিগ্রহ নিরসনে বাস্তব সমাজচিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। ‘পারাপার’ নামক ছোটগল্পেও এ ধরনের খন্ড কাহিনীর চরিত্র রয়েছে দাসু ও সুধারাম। এই ছোট গল্পে প্রেম-ভালোবাসা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হতাশা ব্যক্ত হয়েছে। সুন্দরতা ও সৌন্দর্যপ্রিয়তার কথাও বলা হয়েছে উক্ত ছোট গল্পে। মানবজীবনের ক্রমবিকাশে প্রতিটি জীবনের সুন্দরতা বা সৌন্দর্য হারানোর ক্ষেত্রে বয়স ফুরিয়ে যাবার কথা দুঃখ বেদনা ও হতাশার অভিব্যক্তি দিয়ে সত্যিকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘দোলা’ নামক ছোট গল্পে দোলা-মোদাচ্ছেরের প্রেমকাহিনীর বর্ণনা, ছোট ছোট বাক্য নির্মাণের বৈশিষ্ট্য, বড় ধরনের দীর্ঘ দীর্ঘ কাহিনীকে ছোট পরিসরে বর্ণনা করার কৌশল গল্পকারকে প্রতিভা প্রকাশে স্বাতন্ত্র এনে দিয়েছে। প্রেম কাহিনীতে চটকদারিত্ব নেই, অলোভনীয়তা নেই, শরীরী প্রেম রহস্যময়তার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। তবে দেহঘড়ি নামক ছোট গল্পে বিজাতীয় ধরনের ইঙ্গিত রয়েছে। যা বর্তমান অত্যাধুনিক সমাজের নাগরিক জীবনের অধিকাংশ চরিত্রের স্খলন। সব গৃহ পরিসর জীবন-যাপনে এক না বা সবাই এক ধরনের চরিত্রের অধিকারী নয়। সেটাও বলা হয়েছে অন্যভাবে। জমিলার মতো অনেকেই বয়স হারিয়ে, যৌবন হারিয়ে অত্যাচারিত হয়ে যদি জীবনের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বেঁচে থাকে তাতেও অবাক হওয়ার কিছুই নেই।

‘বিবাহ বৈঠক’ ছোট গল্পে অসমবয়সের বিবাহ উৎসব দেখানো হয়েছে। প্রচলিত বিবাহ আইন লংঘনে কোথাও কোনো প্রতিবাদ নেই। কোথাও আইনের প্রয়োগ নেই। একথা বলতে পারার মতো দুঃসাহস আছে গল্পকার ওমর খালেদ রুমির লেখনীতে। তিনি মানবতাবাদী। মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে একান্তভাবে সোচ্চার। বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তিনি এক উচ্চারিত কন্ঠ। তিনি স্পষ্টবাক হয়ে লিখেছেন,

“কাজী সাহেব তার বিয়েটা সাদামাটা ভাবেই সারলেন। এটা তার চতুর্থ বিয়ে। শুধু শুধু কতগুলো পয়সা খরচা করে ধুমধাম করে কি লাভ। মজা তো একই। পাত্রী যেখানে বিশের নিচে, অনুষ্ঠান সেখানে সাদামাটা হলেও ক্ষতি নেই।”

‘জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প’ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘কারবালা-২০১৬’। এই ছোট গল্পের মূল গল্পটি হলো বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরবর্তী ইতিহাস এক রক্তাক্ত ইতিহাস। ২০১৬ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা সুলতান যখন শুনতে পারে তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় মিথ্যে অপপ্রচার চলছে। সে তখন অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে মুক্তিযোদ্ধা নয় এ কথা বলে অপ্রপ্রচার চলতে থাকায় তার জীবনের করুণ পরিণতি আসে। 

ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে। সুলতান চরিত্রটি রহস্যময় হলেও বাস্তবতার নিরিখে মূল কাহিনীটা সত্য কাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তাই এই গল্পের নামকরণ হয়েছে কারবালা-২০১৬।

‘মেঘে ঢাকা চাঁদ’ ছোট গল্পটি গুণ-জাত বিচারে তেমন আকর্ষণীয় না হলেও এর মধ্যে বর্ণনার চাতুর্য রয়েছে। স্বল্প পরিসরে রয়েছে ঘটনার বর্ণনা। ‘তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে’ নামক ছোটগল্পে সাধারণ জীবন-যাত্রা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদির বর্ণনা বিদ্যমান। জীবনের স্বাভাবিকতা ও সাহজিক আচার-আচরণের কথা বলতে গিণ চালাকার সংগ্রহ থেকে উল্লেখ করেছেন-

You have to let people go

Everyone in your life

are meant to be in your journey

but not all of them

are meant to stay till the end.

‘ঘূণপোকার শরীর’, ‘আমার আনন্দ আমার বিষাদ,’ ‘কাদেরের জীবনের শেষ সাত দিন, ‘আযোড়-যোড়ন, ‘রাজাকারের রোজনামচা’, ‘জন্মান্ধ, মোটর সাইকেল ও একটি অপঘাতে মৃত্যুর গল্প’, ‘আড্ডাবাজ’ প্রভৃতি ছোট গল্পে প্রেম-বিরহ, ইতিহাস, ঐতিহ্য সামাজিক বৈষম্য এবং আমাদের জীবনাচরণের বহুমুখী বৈশিষ্ট্য বাস্তবতা নিয়ে পরিস্ফুটিত হয়েছে।

‘আমার আনন্দ আমার বিষাদ’ নামক ছোট গল্পের ভূমিকায় সংগৃহীভাবে উল্লেখ করা হয়েছে,

If life gives you lemons

then sell it...... and buy clothes..

“জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প” নামক গ্রন্থের পর্যালোচনায় গল্পকার ওমর খালেদ রুমির জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে তার মধ্যে কোনো অতিকথন নেই। বাংলা ও ইংরেজি উভয় সাহিত্যে গল্পকারের যে বিদগ্ধতা রয়েছে তা একেবারেই অনস্বীকার্য। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি নিরহংকার। তার রচিত ও প্রকাশিত “জ্যোৎস্না ও জনকের গল্প” নামক গ্রন্থটি পাঠ করে পাঠক বিমুগ্ধ ও আকৃষ্ট হোক এটাই আমার প্রত্যাশা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ