বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আল মাহমুদ : প্রিয় কবি প্রিয় মুখ

শরীফ আবদুল গোফরান : বর্ষাকাল। চারদিকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। পড়ন্ত বিকেলে ট্রেনে বাড়ি রওয়ানা করেছি। অনেক পথ। ট্রেন এক সময় লাকসাম জংশন অতিক্রম করে লাঙ্গলকোট রেলস্টেশন এসে থামলো। বৃষ্টিও কিছুটা থেমেছে। প্লাটফরম পার হয়ে হরিপুরের রাস্তায় মাথায় এসে দাঁড়ালাম। রিকশা খুঁজছি। কারণ, আমাকে চার পাঁচ মাইল পথ যেতে হবে। অন্ধকার রাত। পাশেই এক দোকানদার বললো, ভাই রিকশা পাবেন না। অগত্যা পায়ে হেঁটে রওয়ানা করলাম। দাউদপুর গ্রামের ভেতর ঢুকতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি এলো। রাস্তার পাশেই একটি কুড়েঘর। ভেতর থেকে পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে মিটমিট করে আলো বের হচ্ছে। ঘরের ভেতর একটি ছোট শিশুর কান্নাজড়িত কণ্ঠ ভেসে আসছিল।

মনে হচ্ছিল শিশুটি কেঁদে কেঁদে কি যেন পড়ছে। কান দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম, তার মা ধমক দিয়ে বলছে-পড়-

‘পাঠে আমার মন বসে না

কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’

আবার শিশুটি কেঁদে কেঁদে পড়তে লাগলো-

‘পাতে আমাল মন বতে না

কাঁতাল চাকাল গন্ধে।’

সুদূর গ্রামে আধা বৃষ্টি ভেজ্ াঅবস্থায় অন্ধকার রাতে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটি শিশুর কচি মুখে কবিতার লাইনগুলো শুনছিলাম।

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা

আব্বা বলেন, মন দে;

পাঠে আমার মন বসে না

কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’

মন ঘরে গেল আমার। বৃষ্টি ভেজা কষ্টের কথা যেন ভুলে গেলাম। বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো আমার প্রিয় কবি আল মাহমুদের ছবি। যে মা তার শিশুকে ধমক দিয়ে পড়াচ্ছিল, সে কি জানতো এই কবিতা যিনি লিখেছেন সেই কবির একজন ভক্ত বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছোট শিশুটির কবিতা পড়া উপভোগ করছে। জানবে কি করে? সে তো কখনো কবিকে দেখেনি। ছোটবেলায় আমার মনে যেমন কবিকে দেখার কৌতুহল জেগেছিল, তাদের মনেও হয়তো এমনি কৌতুহল জেগে আছে। 

এক সময় বৃষ্টি থেমে গেলে চার পাঁচ মাইল রাস্তা অন্ধকারের মধ্যে পার হয়ে গেলাম। আমার কাছে কষ্ট ভয় কোনটাই লাগলো না। যেতে যেতে কবিতা পড়তে পড়তে এক সময় বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম। তখন আর আমাকে একা মনে হয়নি। কবি আল মাহমুদের কবিতাই যেন আমার সাথী হয়ে গেল।

কবি আল মাহমুদ অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি প্রধান কবি। তাঁর কবিতায় আছে ছন্দ, শিল্প সুষমা, ভাবে সুবাস বিন্যাস আর উপমা-উৎপ্রেক্ষার এক নিখুঁত নিটোল কারুকাজ। সুর এবং ছন্দ সচেতন বলেই তার কবিতা পেয়েছে নিটোল, অনবদ্য শিল্পরূপ।তার রচিত প্রতিটি কবিতায় ধ্বনিত হয় একটি সুন্দর উপমা, উপদেশ। যার মাধ্যমে একজন বড় মাপের কবি এবং একজন বড় মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়। ফলে আল মাহমুদ মুক্তবুদ্ধি সম্পন একজন আধুনিক কবি।

কালের যেমন নিজস্ব ধরন-ধারন এবং বৈশিষ্ট্য থাকে। থাকে আমেজ, মেজাজ এবং স্বর ও সুর। নিজস্ব কালের দাবি অস্বীকার করার মধ্যে কৃতিত্ব হয়তো থাকতে পারে কিন্তু কোনো মাহাত্ম্য নেই। তবে একই আবহে বলা যায়, সময় বদলায় না, মানুষ বদলায়। ইতিহাস বদলায় না, মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে। কবি আল মাহমুদ এক সময় বিভিন্ন ধরনের কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু তার মনের ভেতর যে বিশ্বাসকে তিনি লালন করতেন, সে বিশ্বাস তাকে বারবার নাড়া দিতো, খোঁচা দিয়ে বলতো, তোমার লক্ষ্যটা ঠিক করে নাও। তাই তো তিনি তার লক্ষ্য ঠিক করে নিলেন। খুঁজে পেলেন সঠিক পথ। যাত্রা করলেন অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। এ সূত্র ধরেই কবি আল মাহমুদ ইসলামী ঐতিহ্য বিকাশের উদ্দেশ্যে কলম ধরলেন। তার লেখার মাঝে দাবড়িয়ে দিলেন বখতিয়ারের ঘোড়া। ফিরে পেলেন হারানো পথের সন্ধান। কবি আল মাহমুদের পরিচয় তার কবিতার মাঝেই পাওয়া যায়। তার কবিতা পড়লেই বোঝা যায় কিভাবে তিনি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন।

‘নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি ফল

ডাবের মত চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।

ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর

ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিল থরথর।

মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ,

পাথরঘাটার গীর্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ?

দরগাতলা পার হয়ে সেই মোড় ফিরেছি বাঁয়

কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিলো আয় আয়।’

কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে আমার আগ্রহ শৈশব থেকেই। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন খালেক মাস্টার আমাদেরকে বাংলা পড়াতেন। কবিতা পড়াতে গিয়ে তিনি কবিদের সম্পর্কে এতো সুন্দর করে বোঝাতেন তখন কবিদের দেখার আগ্রহ আরো বেড়ে যেতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া আর যাদের ব্যাপারে খালেক মাস্টার এবং গ্রামের ছেলেমেয়েরা আগ্রহবোধ করতো, তারা হলেন কবি গোলাম মোস্তফা, কবি ফররুখ আহমদ এবং আল মাহমুদ। কবি আল মাহমুদকে ভালো লাগার আরো একটা কারণ হলো, একই জেলায় জন্ম বলে। যদিও তাকে কখনো দেখিনি। তার কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় পড়েছি, কিন্তু তখনো কোনো সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি। পরিচয় হওয়ার কারণও ছিল না। আমি থাকতাম চট্টগ্রাম। কবি ঢাকাতে। তাই দেখাও হয়নি।

কবি আল মাহমুদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় যতোটুকু মনে পড়ে ১৯৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমীতে। একবার ঢাকায় এলে কবি মুকুল চৌধুরী আমাকে নিয়ে গেলেন মাহমুদ ভাইয়ের অফিসে। শিল্পকলা একাডেমীর নীচতলায় আঁকাবাঁকা পথে মুকুল চৌধুরীর পেছন পেছন যেতে লাগলাম। হঠাৎ মুকুল চৌধুরী একটি কক্ষের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। আমিও মুকুলের পিছন পিছন ভেতরে ঢুকলাম। একটি সুন্দর সাজানো গোছানো রুমে উত্তরমুখী হয়ে এক ভদ্রলোক মাথা নিচু করে কি যেন লিখছেন। মাথার পাতলা চুলগুলো সাদা ধবধবে। চোখে চশমা, ছোটখাট গড়ন, হালকা পাতলা। তবে দু’চোখে তার আলোর ঝিকিমিকি। মুকুল আস্তে করে আমাকে বললো, ইনিই কবি আল মাহমুদ। হঠাৎ আমার বুকের ভেতর ধপ্্ করে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম অনেক কথা। ছোটবেলায় যার কবিতা মজা করে পড়েছি। হাঁটতে হাঁটতে যায় কবিতা আবৃতি করতাম সে কবির সামনে আজ আমি দ-ায়মান। কবির কবিতা ছোটবেলা থেকেই আমাকে মুগ্ধ করে আসছে। এই ঝলমলে কবির কবিতা পড়ে এক ধরনের ¯িœগ্ধতা অনুভব করতাম। তাছাড়া আল মাহমুদ- এ নামটির মধ্যেও কেমন ¯িœগ্ধতা জড়ানো। তার কবিতা এবং নামের ¯িœগ্ধতার সঙ্গে আরো একটি ¯িœগ্ধতা যুক্ত হলো, সেদিন তাকে আমি প্রথম দেখি, আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, তার কবিতা এবং নামের মতই এক ধরনের ¯িœগ্ধতা তার চেহারা জুড়ে। সব মিলিয়ে আল মাহমুদ যেন একজন ¯িœগ্ধ কবি।

সালাম দেয়ার সাথে সাথে মাথা তুলে তাকিয়ে বললেন, বস। বসতে বসতেই মুকুলকে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলে কে? মুকুল বলল, হ্যাঁ, মাহমুদ ভাই, ওকে পরিচয় করে দেয়ার জন্য আপনার কাছে নিয়ে এলাম। ফুলকুঁড়ি পত্রিকায় কাজ করছে। নাম শরীফ আবদুল গোফরান। ও নিয়মিত আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। কবি ঠিক আছে বলে মাথা ঝাঁকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলেন। চা-খাওয়ার পর সেদিনের মত বিদায় নিলাম। সেদিন থেকেই কবি আল মাহমুদের কাছে আমার আসা-যাওয়া শুরু।

কবির কিশোরদের জন্য লেখা অনেক কবিতা আমি সংগ্রহ করেছি। কত দিন, কত রাত, কত সময় যে কবির পেছন পেছন ঘুরেছি লেখা সংগ্রহের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতাম। আমার মনে পড়ে কোনো কোনো লেখা আদায় করে নিতে বছরকালও সময় লেগেছে। এসব কিশোর কবিতাগুলো কেমন তা আজ সারাদেশের লাখ লাখ পাঠকের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আল মাহমুদের কবিতা তাদের কাছে কত প্রিয়। কারণ তার সব কবিতাই সবার মুখে মুখে। এ মুছে যাওয়ার মত কবিতা নয়। এসব কবিতা আনতে গিয়ে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনেক স্মৃতি মনে পড়ে আজ। যা এতো অল্প সময়ে লেখা সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই কবি আল মাহমুদের সংস্পর্শে কাটানো ক্ষুদ্র সময়গুলোর স্মৃতি ভবিষ্যতে প্রিয় কবির পাঠকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

আমি যখনই কবির কাছ থেকে কবিতা পেতাম, হাতে নেয়ার আগে তিনি পড়ে শোনাতেন। কিন্তু এ দেরীটুকু মোটেও আমার সহ্য হতো না। কবির হাত থেকে জোর করে নিয়ে পড়তে ইচ্ছে করতো। হাতে নিয়ে অন্তত পঞ্চাশবার পড়তাম তবুও যেন তৃপ্তি মিটতো না। প্রায় বছরখানেক পেছন পেছন ঘুরার পর একটা নতুন কবিতা, এ যেন এক মহাআনন্দা। বুক ভরে যেতো খুশিতে। প্রেস থেকে পত্রিকার প্রথম কপিটা এনেও আগে পড়তাম। এমন একটি কবিতা-

‘আকাশটাকে নিয়ে আমার মস্ত বড় খেলা

মেঘের কোলে ভাসাতে চাই চিলেকোঠার ভেলা।

বাতাস যখন থমকে গিয়ে শান্ত হয়ে রয়

মেঘের ঈগল ভেঙে’ কেবল ফুলের তোড়া হয়;

জলকদরের খাল পেরিয়ে জলপায়রার ঝাঁক

উড়তে থাকে লক্ষ্য রেখে শঙ্খ নদীর বাবা।

মন হয়ে যায় পাখি তখন, মন হয়ে যায় মেঘ

মন হয়ে যায় চিলের ডানা, মিষ্টি হাওয়ার বেগ।

আবার যখন সন্ধ্যা নামে ছড়িয়ে কালোর ছিট।

আকাশটাতে কে এঁকে দেয় নীল হরিণের পিঠ।

ব্রহ্মদেশের বাতাস এসে দরজা টানে রোজ

কোথায় পেলে আমার মত দুষ্টু ছেলের খোঁজ।’

 

কবি আল মাহমুদের কবিতা পড়লে তা সাথে সাথে মুখস্ত হয়ে যায়। তার কবিতার কোন চিৎকার নেই। আছে দুপুরের নীরবতা, জ্যোৎ¯œা রাতের রূপালী ঝিকিমিকি। মাথা আছে। ভালোবাসা আছে। আছে জীবন, চেতনা। এ দেশের আকাশ, মাটি, ফুল, পাখি, নদী সবকিছুর জন্যে কবি আল মাহমুদের হৃদয়ের টলমলে পুকুরে ভালোবাসার একটা সাদা হাঁস সব সময় সাঁতার কাটছে তিরতির ঝিরঝির করে। তার কবিতার শরীতে কান পাতলে সে শব্দ কলকলিয়ে ওঠে।

বৃক্ষের পরিচয় যেমন তার ফলে, একজন কবির পরিচয় তেমনি তার কবিতায়। তার ভাবে, বিষয়ে, বিন্যাসে। কবি আল মাহমুদের পরিচয়ও স্পষ্টতই তার কবিতায়। তার নাতিদীর্ঘ জীবনের সুদীর্ঘ ছন্দময় সংলাপে। তার মনোজগৎ, তার দৃষ্টিকোণ, তার প্রকাশভঙ্গি সবকিছুর ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার কবিতায়। মুখের হাসি আর বুকের ভালোবাসাকে মনের রঙে রাঙিয়ে জীবনের আকাশে রঙধনুর মতো এলিয়ে দেয়ার প্রয়াসী তিনি। তিনি নতুন কাগির, প্রচলিত রীতিনীতি, পুরানো ছাদ ভেঙে তিনি নিজস্ব নিয়মে গড়ে তুলেছেন কবিতার নতুন ইমারত। তেমনি কবি এই কবিতাটিও আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন-

‘গ্লোবের পেটে কান লাগিয়ে খোকন শোনে কান্না

বিশ্বগোলক ফুঁপিয়ে ওঠে, অপার পারি না, আর না।

মানুষ নামের বিজ্ঞানীরা আমায় নিয়ে খেলছে

আমার সাগর পাহাড় নদী রোলার দিয়ে বেলছে।

ক্লোরোফিলের ফলের সবুজ ভরা ছিল আমার গাত্র

সাগরভরা ছিল আমার লবণজলের পাত্র।

সব বিষিয়ে দিচ্ছে মানুষ ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধ

কলের বিষে তলিয়ে গেছে গোলাপ ফুলের গন্ধ।

শস্য ছিল, শ্যামল ছিল, ছিল সুখের পার্বণ

পক্ষী কাঁদে, পুষ্প কাঁদে, রসায়নের রান্না

বন্ধ করো, বন্ধ করো, আর পারি না আর না।’

কবি আল মামুদ এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁকে গত শুক্রবার বিদায় দিয়েছি চিরদিনের জন্য। তাঁর লেখা কবিতায়ই তো তিনি বলে গেছেন-

‘আমার যাওয়ার কালে

খোলা থাক জানালা দুয়ার

যদি হয় ভোরবেলা

স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার॥’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ