বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আল মাহমুদঃ তার পাল্টে যাওয়ার জীবন কথা

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : ‘‘সেই ব্যক্তিই সফলকাম হয়েছে যে স্বীয় আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে’’ আর সেই ব্যক্তিই ব্যর্থ হয়েছে যে তার প্রবৃত্তিকে কলুষিত করেছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারিমে দুই ধরনের ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। এক ধরনের ব্যক্তি যে তার প্রবৃত্তিকে পরিশুদ্ধ করেছে তাকেই বলছে কুরআন সফলকাম মানুষ আর অন্যদিকে যে তার প্রবৃত্তিকে পরিশুদ্ধ করেনি বরং কলুষিত করেছে অর্থাৎ প্রবৃত্তির দাস হয়েই জীবন কাটিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিনের প্রেরিত জীবন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেনি বরং মনুষ্য কল্পিত এবং উদ্ভাবিত দর্শনকে গ্রহণ করে জীবন চালিত করেছে-তারাই সবোর্তভাবে ব্যর্থ এবং অসফল মানুষ হিসেবে পরিগণিত। কবি আল মাহমুদ সেই তার কৈশোর কাল হতে বামপন্থী লোক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সমাজতান্ত্রিক তথা মার্কসবাদী চিন্তাধারা দ্বারা মন মানসিকতা গড়ে তুলেছিলেন এবং ক্রমান্বয়ে বিশ্বাস করতেন যে মানুষের মুক্তি কেবল মার্কসবাদ-  লেনিনবাদই দিতে পারে। অর্থাৎ একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনে দারিদ্র্যতা দূর হয়ে দরিদ্র শ্রমজীবি মানুষের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু মার্কসবাদ নামক মতবাদ-যা একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ মতবাদ-যা পাশ্চাত্যের তিন মনীষীর মতবাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তার খবর অনেকের কাছেই নেই এবং ছিল না। পাশ্চাত্যের তিন মনীষী যথা, চালর্স ডিকেন্স, সিগমুন্দ ফ্রয়েড এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রবক্তা জার্মান দার্শনিক হেগেল এর মতাদর্শের ভিত্তিতে রচিত হয়ে ছিল জার্মানবাসী র্র্কাল মার্কস এর ‘দাস ক্যাপিটা’ নামক গ্রন্থ। এই দাস ক্যাপিটা গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল মেনুফেস্ট অব কম্যুনিস্ট পার্টি। র্কাল মার্কস এর মতাবাদের উপর ভিত্তি করে ভøাদিমির ইলিচ লেনিন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক রুশ বিপ্লব করে সমাজবাদের উপর ভিত্তি করে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেন। ১৯৬৫ সালে  চীনে এসব মতবাদের উপর ভিত্তি করে মাও সেতুং ঘটান একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সেখানে সমাজবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক গণচীন গঠন করা হয় ।

এরপর বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা হয়। ব্যক্তি মালিকানা উৎখাত করে দেশের সকল সম্পদ রাষ্ট্রের হস্তে অর্পণ করে সমবায় এর ভিত্তিতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা স্থাপন করা হয়। বিশ্বের প্রায় ৮৮টি দেশে কম্যুনিষ্ট পার্টির শাখা খোলা হয়। বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত বড় মাপের পরিবারগুলোর প্রতিভাবান যুব শ্রেণিকে টার্গেট করে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারের কাজ জোরেশোরে শুরু করা হয়। কিন্তু খোদ রাশিয়াতেই মাত্র ৭৫  বছরের সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণই ব্যর্থতার পরিচয় দিতে বাধ্য হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করে পরিবার প্রথা উৎখাত করা হয়। মুক্তচিন্তা চেতনার মুখ কঠোরভাবে বন্ধ করে চিন্তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়। মার্কসবাদের নিরীখে সবকিছু ঢেলে সাজানো হয়। 

ডাঃ জিভাগোর লেখক বরিস পাস্তারনাক কে বন্দী করে সাইবেরিয়ার শ্রম শিবিরে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। নোবেল বিজয়ী আলেকজান্ডার সোল জিনেতসিন প্রাণ নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে বাঁচেন। আল মাহমুদ কৈশোরিক উদ্দীপনায় এবং তারুণ্যের জোয়ারের সময়ে সমাজতান্ত্রিক আর্দশের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন এক সময় এবং দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতেন- মার্কসবাদ ও লেনিনবাদ ব্যতীত মানুষের মুক্তি অসম্ভব। কবি ফররুখ আহম্মদও এক সময় কলকাতায় ট্রেড ইউনিয়ন করে শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র্যতা দূর করতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু খোদ চীন রাশিয়ায় যখন সমাজবাদ মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ‘প্রেসত্রেইকা’ দিয়েও বিশাল ব্যর্থতা ঢাকা গেল না, তখন আমাদের মত দেশেও এই আন্দোলন আর ঘাস-পানি খেল না। মেজর আব্দুল জলিল যিনি লিখেছিলেন মার্কসবাদের অ,আ,ক, খ ও কবি আল মাহমুদরাও এমন পরিস্থিতিতে প্রমাদগুনলেন। 

কবি আল মাহমুদ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বছর কারা নির্যাতনের সময়ে-হঠাৎ করে, দৈবক্রমে কারাগার লাইব্রেরিতে পেয়ে যান কাজী আব্দুল ওদুদ কৃত আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ এবং কোরআনের  আশ শোআরা সূরায় কবিদের রকম সকমের বর্ণনা পেলেন। কোরআনের ভাষ্যঃ যারা বিভ্রান্ত তারাই  কবিদের অনুসরণ করে। আপনি দেখেন না, তারা উ™£ান্ত হয়ে প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। আর তারা যা বলে তা তারা করেনা। কবি আশ্চার্যান্বিত হলেন বিস্মিতও হলেন অনেক। কারণ আল কুরআন কে এরা মনে করতেন শুধু একটা ধর্মগ্রন্থ, এতে আবার কবিদের রকম সকম সম্পর্কে মন্তব্য ও পাওয়া যায় এটা কি ধরনের কথা। অথচ নিরেট সত্য হল কুরআন যখন অবতীর্ণ হচ্ছিল সেই চৌদ্দশো বছর পূর্বে আরবের মরুভূমিতে সেই যুগ ছিল সাহিত্যের একটি বর্ণাঢ্য যুগ, এই যুগে অসংখ্য কবির  কবিতা প্রকাশিত হচ্ছিল যা ছিল সাহিত্যের যুগ দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ, এই যুগে বিশ্বের  শ্রেষ্ঠ কবিরা কবিতা চর্চা করতেন। এমন  একটি যুগেই কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ হচ্ছিল যারা ছিলেন তৎ কালের শিক্ষিত ও কাব্যগুণে গুণান্বিত বিশাল জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠির মধ্যেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যের গুণ বিশিষ্টি কুরআন অবতীর্ণ করা হয়। অথচ এই যুগকে হিংসা করে বলা হয় অজ্ঞতার যুগ। অথচ আজকের যুগের যেসব কবি কবিতা লিখেন বিশ্বজুড়ে নাম খ্যাতি অর্জন করেন তাদের চেয়ে সেই যুগের কবিরা ছিলেন অনেক মেধাবী এবং অসামান্য কাব্যশক্তির অধিকারী। আজকের মত কষ্ট কবি তারা ছিলেন না। আমাদের আজকের কবিদের কবিতা মাত্র কয়েক দশকেই অপাঠ্য হয়ে ওঠে কিন্তু আরবের তথাকথিত জাহিলী যুগের কবিদের কবিতা চৌদ্দ পনেরো শো বছরেও পুরোনো হয় না। এখনো একদম সতেজ এবং চির নতুন। একবিংশ শতকেও সেইসব কবিতা পাঠককে মোহিত বিমুগ্ধ করে। 

কবি আল মাহমুদ কুরআনুল কারিমের কবিদের চরিত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উপর্যুক্ত বক্তব্যে খুবই মুগ্ধ হলেন এবং গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়নের সংকল্প গ্রহণ করলেন এবং সেই সময়ে লিখলেন তার  মোড় ফেরানোর কথকতা সম্বলিত আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাব্যগ্রন্থ ‘মায়াবী পর্দা দোলে ওঠে’। যিনি এক সময় পানকৌড়ির রক্ত নামক অশ্লীল গল্প লিখেছেন। তিনিই মোড় ফিরেই লিখলেন-সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, একটি চুম্বনের জন্য প্রার্থনা নামক অসামান্য গল্প। এই যে মোড় ফিরা এই কেবলা পরিবর্তনে লোক লোকান্তর ‘সোনালী কাবীনের সাড়া জাগানো কবি আল মাহমুদের কবিতা চর্চায় কোন ব্যাঘাত ঘটেছে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের অভিমত-আল মাহমুদ তার আদর্শ পাল্টে ফেলেও শিল্প চৈতন্যে সজাগ ও কাব্য নৈপুণ্যে অসামান্য উৎকর্ষতার স্বাক্ষর বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই ক্ষেত্রে ভারতের ড. শিব নারায়ন রায়ের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।  একজন বহুমাত্রিক লেখকের যেসব গুণাবলি থাকা অত্যাবশ্যক- সবই তার বিদ্যমান ছিল, এখানে কোন সামান্যতম ঘাটতির লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হয় না। 

 বাংলা সাহিত্যের অসাধারণ কবি পুরুষ আল মাহমুদ আদর্শ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্বাশত সত্যের সঙ্গে তার মেলবন্ধন চমৎকার অবিস্মরণীয় রূপধারন করেছে।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ