মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বছরে সাতজনকে ফাঁসি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল জমিদার কাজী সাহাব উদ্দীন চৌধুরীর

ফটিকছড়ির কাজিরহাট কাজীবাড়ি মসজিদ (বামে) জরাজীর্ণ কাজীবাড়ী

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : বছরে অন্তত সাতজনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ক্ষমতা ছিল জমিদার কাজী শাহাব উদ্দীন চৌধুরীর। এখনো রয়েছে সে ফাঁিসর মঞ্চ। তবে নেই সে জমিদারী বা ক্ষমতা। এখন শুধুমাত্র কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর সে জমিদার বাড়ি বা কাজী বাড়িটি। বাড়ির দেয়ালগুলোতে এখন উঠেছে ছোট ছোট বটবৃক্ষের চারা। নানা ধরনের লতাপাতায় ছেয়ে গেছে বাড়ির দেয়ালগুলো। ধসে পড়েছে উপরের ছাদ। ভুজপুরের কাজির হাট বাজারে দক্ষিণ পশ্চিম পার্শ্বে একটি টিলার উপর অবস্থিত বাড়িটি বর্তমানে কাজী বাড়ি বা মিঞা বাড়ি নামে পরিচিত।
ষাট কক্ষের বিশাল প্রাসাদ এখন অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন বিলুপ্তির পাথে ভূজপুরের এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি। বাড়ির চারপাশের পরিখাঁ এখন আর নেই। এখন আর প্রতিরাতে বসেনা নাচ গানের আসর। নেই জমিদারের সোনা রূপাকচিত আলিশান চেয়ার। প্রতি বছর এখন হয়না রাজপুন্যাহ উৎসব।
দেয়াল দরজা জানালার প্রতিটি অংশে মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়াও এখন মুছে গেছে। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে এখন ভয় লাগে। তবে এ ভয় মিঞা সাহেবের নয় এ ভয় সাপ-বিচ্ছুর। বাড়ির উপরের তলার ফাঁসির মঞ্চটিও এখন আর নেই। চার পাশের দেয়ালগুলোই শুধু ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তবে কাজী বাড়ি যাওয়ার একশ গজ আগে উত্তর পার্শ্বে চোখে পড়বে নয়নাভিরাম মোগল স্থাপত্যের স্মৃতি কাজী বাড়ি মসজিদ। তিনটি গম্বুজ আর ১২টি ছোট মিনারযুক্ত মসজিদটি। আড়াইশত বছর আগে তুর্কী প্রকৌশলীরা চুন সুরকির দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন এ মসজিদটি। কালের আবর্তে মুসল্লি¬ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯৭-৯৮ সালে এর বারিন্দা নির্মান করা হয় বলে জানান কাজী তৌহিদুল আলম।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত উত্তর চট্টগ্রামের বিখ্যাত জমিদার কাজি শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর জমিদার বাড়ির গল্প এটি। জমিদার শাহাব উদ্দিন বা হাসমত আলী কেউ এখন আর বেঁেচে নেই। নেই জমিদার বাড়ির আগের সেই জৌলুশ। তাই হয়তো সকলের কাছে এটি একটি গল্পের মতো হতে পারে। বিখ্যাত এবং বহুল আলোচিত এই জমিদার বাড়ির অবস্থান ফটিকছড়ির ভূজপুর এলাকায়।
জানা যায়, কাজি শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর আদি পুরুষ ছিলেন মহব্বত সাধু। তিনি গৌড় নগরে বসবাস করতেন। সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম এসে তিনি সস্ত্রীক বসতি স্থাপন করেন ফেনীর দাঁদরায়। তাঁর একমাত্র ছেলের নাম সাদুল¬াহ। সাদুল¬াহ’র তিন ছেলের একজন কাজি শাহাব উদ্দিন চৌধুরী। অন্য দুজন হলেন আনিস মোহাম্মদ ও মোহাম্মদ হোসন। কাজি শাহাব উদ্দিনের তিন ছেলের একজন কাজি হাসমত আলি চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। আলিফ লায়লা ও চিনফুকস শাহ নামের তার দুটি পুঁথি রয়েছে।
বংশ পরম্পরায় কাজি শাহাব উদ্দিন চৌধুরীর ও তাঁর বংশধরেরা প্রায় দু’শ বছর জমিদারি করেছেন ভুজপুরে। ভূজুপর বাজারটি তখন থেকে কাজিরহাট নামে পরিচিত। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ছিল তাদের জমিদারি। ফটিকছড়ির প্রায় অর্ধশত বর্গকিলোমিটার এলাকা জমিদারির আওতায় ছিল। বছরে একবার রাজপুন্যাহ হতো। তখন হাজার হাজার লোক খাজনা দিতে আসতেন কাজি বাড়িতে।
বর্তমানে বেঁচে থাকা জমিদার পরিবারের সন্তান শিক্ষক কাজি ইকবাল হোসেন জানান, তখন জমিদার হায়দার আলীর আমলে জমিদারির আওতায় মোগল স্থাপত্যের আদলে ২৪টি মহাল ১২টি তরফ ছিল। এ ছাড়া ২২ টি পুকুর (দীঘি) ২২ টি মসজিদ সহ বহু সামাজিক প্রতিষ্ঠান। অনেক রাস্তা সহ ২২টি (হাতির পুল) ব্রিজ কালভার্টও নির্মাণ করেছিলেন । ১৭৬৫ থেকে ১৮৪৫ সাল এসময়ে এ গুলো নির্মান করা হয়। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর তাদের বংশধর।
কাজি বাড়িতে একটি ফাঁসির মঞ্চ ছিল এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষের মাঝে এমন ধারণা থাকলেও এটি নিয়ে জমিদার বাড়ির লোকজনের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন কথা। শিক্ষক ইকবাল হোসেন জানান, এটি ছিল একটি প্রতিকী মঞ্চ। এখানে কোন লোককে ফাঁসি দেয়া হতোনা। একবার বৃটিশ লর্ড কাজি শাহাব উদ্দিনের আমন্ত্রনে এখানে আসেন। তিনি কাজির সকল প্রশাসনিক কাজ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন তুমি সাতটা খুন করলেও তোমার জন্য সবকিছু মাফ হয়ে যাবে। লর্ড সাহেব বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে কাজি শাহাব উদ্দিনকে জমিদারী চালাতে বিশেষ ক্ষমতার একটি সনদ প্রদান করেছিলেন। এতে বিচারিক কর্মকান্ড চালানো এবং বছরে অন্তত সাতজনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। যা পরবর্তীতে ফাঁসির মঞ্চ হিসাবে প্রকাশ পায়। তিনি জানান এখন এটি একটি জমিদার বাড়ীর জন্য অনেকটা কলংকের মতো হয়ে কাজ করছে। তিনি ফাঁসির মঞ্চের কলংক থেকে তাদের রেহাই দেয়ারও দাবী জানান।
জমিদার বংশের অপর সন্তান ব্যবসায়ী কাজী তৌহিদুল আলম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বহু স্মৃতিবিজড়িত কাজি বাড়ী সংরক্ষনের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে তারা লিখিত অনেক আবেদন নিবেদন করেছেন। কিন্তু এটির সংস্কার বা সংরক্ষনে সরকারী কোন প্রকার সহায়তা পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এটিকে সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হলে এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ