বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বিমান বন্দরের নিরাপত্তা

বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও ভীতি ও আতংকের পাশাপাশি প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এর আশু বা সর্বশেষ কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পলাশ আহমেদ মাহদী নামের এক যুবকের কথিত বিমান ছিনতাই চেষ্টা দেশে শুধু নয়, বিশ্বের সকল দেশেও আলোড়ন তুলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের আকাশ পথে যোগাযোগ রয়েছে সে দেশগুলো এরই মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করেছে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, কোনো দেশই ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিমান বন্দরে নিজেদের যাত্রী ও পণ্যবহনকারী বিমান পাঠাতে সহজে সম্মত হবে না। কোনো কোনো দেশ এমনকি নেতিবাচক ভাবনার কথা প্রকাশ করতেও শুরু করেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। এমন প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশংকাজনক। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া।
আমরা উদ্বিগ্ন আসলে অন্য কিছু বিশেষ কারণে। ঘটনার তথাকথিত বিমান ছিনতাই চেষ্টার অন্তরালের সম্পূর্ণ সত্য জানার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে সত্য, কিন্তু এরই মধ্যে ওই ফ্লাইটের যাত্রী ও ক্রুসহ বিভিন্নজনের মুখে যে সব বর্ণনা শোনা গেছে সেগুলোর পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কয়েকটি সংস্থার বিবৃতিও জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয়ের কারণ সৃষ্টি করেছে। ছিনতাইয়ের জন্য চেষ্টাকারী বলে বর্ণিত যুবক সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যও জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। মাহদী নামের ওই যুবক র‌্যাবের তালিকাভুক্ত অপরাধী বা সন্ত্রাসী ছিল- এরকম তথ্য এসেছে একটি প্রধান কারণ হিসেবে। সংশয়ের সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়ে তাকে আসলে ক্রসফায়ারের শিকার বানানো হয়েছে কি না। এমন প্রশ্নের কারণ, এ ধরনের তালিকাভুক্ত অপরাধী বা সন্ত্রাসীদের সাধারণত গুপ্তহত্যা বা ক্রসফায়ারের শিকার বানানো হয়ে থাকে।
প্রশ্নটি গুরুত্ব অর্জন করেছে অন্য একটি বিশেষ কারণে। সে কারণটি হলো, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্তও সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়নি যে, ওই যুবকের কাছে সত্যি কোনো পিস্তল ছিল কি না। অন্যদিকে কখনো পিস্তলের কথা যেমন বলা হয়েছে তেমনি আবার খেলনা পিস্তলের কথাও শোনানো হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এমনকি একথা পর্যন্ত জানানো হয়েছে যে, ওই যুবক নাকি দু’ রাউন্ড গুলিও ছুঁড়েছিল! বলা হচ্ছে, বাস্তবে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন সেনাবাহিনীসহ কোনো সংস্থার পক্ষ থেকেই কিন্তু কোনো পিস্তল দেখানো হয়নি। এমনকি খেলনা পিস্তলও নয়। তাছাড়া প্রথমে আহত হওয়ার কথা বলা হলেও কতক্ষণ পরই আবার জানানো হয়েছে যে, যুবক নাকি এনকাউন্টারে মারা গেছে!
আমরা অবশ্য কোনো অনুমান নির্ভর আলোচনার বা জল্পনা-কল্পনার পক্ষপাতী নই। আমরা বরং গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে চাই। আমাদের আশা ও বিশ্বাস, ওই রিপোর্টে সব জিজ্ঞাসারই জবাব পাওয়া যাবে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে আনা দরকার। কারণ, দেশের প্রধান এই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে মাঝে-মধ্যেই নিরাপত্তা লংঘিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে সোনা, অস্ত্র ও ইয়াবা ধরনের নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান এবং আটকের ঘটনার আগে-পরে বিমান বন্দরে দায়িত্ব পালনরত অনেকের ব্যাপারেই জানাজানি হয়। যেমনটি ছিনতাই চেষ্টাকারী যুবক পিস্তল কিভাবে সঙ্গে নিতে পারলো তা নিয়ে আলোচনা করার সময় বিমান বন্দরে দায়িত্ব পালনরতদের জড়িত থাকার ব্যাপারে কথা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ হলো, ঘটনাক্রমে দু’-চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও দায়িত্ব পালনরতদের অধিকাংশই সব সময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। একই কারণে একদিকে বেআইনি কর্মকান্ড যেমন বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে তেমনি সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। আমরা উদ্বিগ্ন এজন্য যে, মূলত দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং ২০১৬ সালে ব্রিটেন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পরিবহন করা পণ্য নেয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বাংলাদেশের পণ্যের ক্ষেত্রে আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় দেশগুলো বলেছিল, এসব পণ্য প্রথমে তৃতীয় কোনো দেশের বিমান বন্দরে নামাতে হবে। সেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষার পর বিপদজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ নয় মর্মে সার্টিফিকেট দেয়া হলেই কেবল বাংলাদেশি পণ্যকে ওইসব দেশের বিমান বন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে। দেশের রফতানি আয়ও অনেক কমে গেছে।
এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটেন তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আশা করা হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও পর্যায়ক্রমে তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। অন্যদিকে ঠিক এমন এক সম্ভাবনাময় সময়ে এসেই হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
আমরা মনে করি, একজন কথিত ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারীসহ কয়েকজন মাত্র ব্যক্তির কারণে বাংলাদেশকে নিষেধাজ্ঞার কবলে ফেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যেন কোনো দেশই প্রশ্ন ওঠাতে এবং সংশয় প্রকাশ করতে না পারে। সে উদ্দেশ্যে সরকারকে বিমান বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কঠোর করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ