শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ক্যারিয়ার

-কামরুন নাহার (অনার্স ২য় বর্ষ)
 আমার নামটা নিয়ে আমার বারো বছর বয়স পর্যন্ত একটা কনফিউশন ছিল। আমাকে সবাই ডাকত পাখি বলে, কিন্তু আমার নাম মোটেই পাখি না। আমার নাম ফাহিমা বিনতে জহির। এটাই ৫ বছর বয়সে লিখা শিখে লিখেছিলাম প্রথম। বারো বছর বয়সে যখন অদ্ভুত একটা সিরিয়াল শুরু হলো স্টার জলসায় তখন থেকে আমার নাম টা নিয়ে আমার অদ্ভুত খারাপ লাগা কাজ করতো। বুঝ হবার পর থেকে আমি আমার ডাক নাম হিসেবে এটাই জানি, কিন্তু “বোঝেনা ......সে...... বোঝেনা” বলে যখন পাশের ঘর থেকে টান দিত তখন খুব মানসম্মানে লাগত। মা আর আন্টিরা একটা পর্ব মিস করতো না। কিন্তু অই ‘পাখি’ নামক চরিত্রটা আমার কাছে অসহ্য লাগত। বলে রাখি, আমি তখন সচেতন ছিলাম না সিরিয়ালের ভয়াবহতা সম্পর্কে। কিন্তু তারপরও আমার তাকে অসহ্য লাগতো। তখন থেকেই খোঁজা শুরু করলাম আমার নাম রাখল কে? খোঁজ নিয়ে যা জানতে পারলাম তা আরো ভয়াবহ, সেটা হলো, আমার নাম কেও পাখি রাখেনি, বরং রেখেছিল “ফাহিমা বিনতে জহির”। সেই “ফাহিমা” কে সংক্ষিপ্ত করে ডাকা হত “ফাহি” বলে, আর কালের পরিক্রমায় “ফাহি” হয়ে গেল “পাখি”। আরেকটা কথা বলি , যখন এই ইতিহাস জানতে পারলাম তখন আমার এটাই জানা হয়ে গেছে আলহামদুলিল্লাহ্‌ যে, “হে মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না কর। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই জালেম। (সূরা: হুজুরাত : ১১)”
এটা জানতে পারলাম একটা উপহার এর মাধ্যমে, আমার প্রিয় বান্ধবী ঊর্মি’র কাছে আমি তার জন্য ধন্যবাদ দিয়েছিলাম, তবে ও আমাকে এটাও বলেছে যে ধন্যবাদ বলার চেয়ে উত্তম কথা হলো জাজাকিল্লাহু/ জাজাকাল্লাহু খইর বলা। এতে তার জন্য দোয়ার মাধ্যমে তার উপকার ও করা হয়। অনেক যুক্তিসংগত কথা। যাই হোক ঘটনাটা তাহলে বলেই ফেলি,
একদিন ক্লাসে বসে ছিলাম, এরপর দিন আমার বার্থডে ছিল। বসে বসে ভাবছিলাম কাল কি কি হবে কাকে কাকে ইনভাইট করবো, ভাবতে ভাবতে মনে আসলো গিফটের কথা, গত বার প্রায় দেড়শ গিফট পেয়েছিলাম কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার যে জিনিসটা দরকার ছিল সেটা কেও গিফট করেনি, আমার দরকার ছিল একটা ১৬ জিবি মেমরী কার্ড, আমার মেমরী কার্ড আব্বু কিনে দেন না, যতই আদর করেন না কেন। আর বার্থডে তো করাই নিষেধ ছিল, কিন্তু ভাগ্য ভালো যে গত দুই বছর ধরে আব্বু বদলি হয়ে চিটাগাং গেছেন তাই আমরা গত দুই বছর ধরে লাইফটা মোটামুটি এঞ্জয় করছি। আরো কিছু জিনিস আছে যেগুলাতে আব্বু কিপটামি করেন। “কিপটামি” আব্বু আসলে তা নন, তবে এসব আমার মামারা খালারা বলতেন। পরে আমার এই দুঃখে দুঃখিত হয়ে ছোট মামা কিনে দিয়েছিলেন ১৬ জিবি ফোন মেমরি। আচ্ছা ঘটনায় ফিরে যাই, আমি ভাবছিলাম কয়েকজন কে বললেই হয় এই কথা আজ, যেন আগামিকাল আমার জন্য একটা ইয়ার ফোন গিফট করে, একটা ছিল আমার কিন্তু, কয়েকদিন আগে ছোট ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়ে একপর্যায়ে হাতাহাতির ফলে এটার তার নষ্ট হয়ে যায়, সেই থেকে আমার এফ এম শোনা হয়নি, আম্মুকেও বলার সাহস হচ্ছিল না, কারণ আম্মু খুশি হয়েছিল এটা নষ্ট হওয়ায়।
রাত জেগে লাভগুরু সহ আরজে দের পক পক শোনা আম্মুর মোটেই পছন্দনীয় না, কারণ এজন্য আমার ২০০০ টাকা জরিমানা হয়েছিল গত মাসে অনুপস্থিতির জন্য, সকালে উঠতে পারিনি। ভাবতে ভাবতে ঊর্মি আসল সামনে, ঊর্মি আমাদের স্কুলে গত বছর ভর্তি হয়েছিল ২১৫ নম্বর রোল নিয়ে, তখন বুঝতে পারিনি এই গোবেচারা মেয়েটার রোল হয়ে যাবে ১। তারপর থেকেই ভাব জমানোর চেষ্টা করি, মেয়েটাও বড্ড সরল সোজা। আমি ঊর্মিকে পেয়েই ইনভাইটেশন কার্ড টা দিলাম। ঊর্মি হাতে নিল আর কি জানি ভাবল। আমি অধৈর্য্য হয়ে বললাম, “শোন, দোস্ত তুই কাল আমায় ভালো দেখে একটা ইয়ারফোন গিফট করিস আর আন্টি কে বলবি আর কোন দামি গিফটের দরকার নাই” , আমার কথায় অবাক হয় ঊর্মি বলেছিল, “কি করিস তুই এটা দিয়ে?”। “কি আবার করবো এফ এম শুনি হাঁদা এফ এম”। পরের দিন সবাই আসল, ঊর্মি আসেনি। আমি ভাবলাম কি কঞ্জুস রে বাবা, একটা তো ইয়ারফোন ই চেয়েছি, এজন্য দাওয়াত মিস করে দিল, এমনি তে তো অনেক হেল্পফুলগিরি দেখায়, কেও টিফিন না আনলে খাওয়ায় নিজের টা, দুই টা ওয়াটার বোটল রাখে যেন অন্যকে পানি খাওয়াতে পারে, পেন্সিল-কলম তো বেশি করে ব্যাগে রাখে যেন কেও না আনলে হেল্প করতে পারে, নোট করে সেগুলা আবার কেও চাইলেই দিয়ে দেয়। আরে বাবা এজন্যই তো ওর কাছে এত ফ্রিলি বলে দিয়েছিলাম গিফটের কথা। যাহ্‌ এবারো কেও দরকারি জিনিস টা দিলো না। মামা কেই বলতে হবে। পরদিন গিয়ে দেখলাম ফার্স্ট বেঞ্চে বসে আছে, আমি দেখেও না দেখার ভান করে থার্ড বেঞ্চে গিয়ে বসলাম, কিছুটা এড়িয়েই গেলাম বলা যায়। আসলে আপমান লাগছিল নিজের। টিফিন টাইমে র‍্যাপিং পেপারে মোরানো কিছু একটা নিয়ে আমার সামনে এল। সেই কিছু একটার সাইজ দেখেই বুঝলাম এটা ইয়ারফোন জাতীয় কিছু না। ঊর্মি আমার সামনে এসেই বলল, 
 - দোস্ত, তোর সাথে বন্ধুত্ব হওয়ায় আমি খুশি, এটা তোর জন্য।
- ধন্যবাদ। (মনে মনে বললাম ডিসগাস্টিং)
- এটা কি তুই মন থেকে বললি?
- কেন! তোর কি মনে হয়? বলিনি?
- না আসলে যদি মন থেকে বলে থাকিস তাহলে নিশ্চই তুই আমার উপর খুশি, তাহলে তুই আমাকে ..........॥
আমি হা হয়ে সেদিন ওর কথা শুনছিলাম। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সরল মনে করা সেই মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিমায়। বাসায় গিয়ে প্যাকেট টা খুলতেই বেরিয়ে এল তিন টি কার্ড, দুইটা বই। বই দুটা দেখে আমি লাফিয়ে উঠলাম, গল্পের বই। আর কার্ড দেখে তো আমি তখন আরো হতবাক। এত সুন্দর কার্ড ! সেখানে হাতের লেখা ছিল ঊর্মির, না হলে বিশ্বাস করতাম না যে ও এটা নিজে নিজে করেছে। তবে দুই টা কার্ডে দুইটা ভাল কথা লিখা ছিল। লিখা ছিল,
“হে মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই জালেম। (সুরা: হুজুরাত : ১১)”
 আরেকটাতে ছিল, “রসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা গ্রহণ কর এবং যা দেননি যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর।” [সূরা হাশর আয়াত নাম্বার:- ০৭]।
সুতরাং রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমানিত নয় এ রকম কোন উৎসব মুসলিমদের উদযাপন করা যাবে না। কারণ এগুলো বিধর্মীদের ধর্মীয় উৎসব আর মুসলিমদের জন্য বিধর্মীদের অনুসরণ করা সরাসরি হারাম।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইহুদী ও নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে, নিশ্চয় আল্লাহ যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” [সূরা আল-মায়িদাহ আয়াত নাম্বার:- ৫১],”
শেষ কার্ডটায় ছিলো, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি- তামাসা ও খেলার বস্তু হিসাবে গ্রহণ করে তাদেরকে এবং কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর যদি তোমরা মুমিন হও।” [সূরা আল-মায়িদাহ আয়াত নাম্বার:- ৫৭]।
প্রিয় বান্ধবী,
আমি জানি কাল তোর বার্থডেতে না যাওয়ায় তুই হয়ত দুঃখ পেয়েছিস, আমি যতটা সম্ভব না যাওয়ার কারণ বলার চেষ্টা করলাম, তুই তো জানিস আমরা কতটা ক্যারিয়ার সচেতন, এজন্যই আমাদের উচিত আসল ক্যারিয়ার কে সামনে রেখে কাজ করা। ক্ষণস্থায়ী ক্যারিয়ার আর দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিয়ার এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটাকে বেশি প্রায়োরিটি দেয়া। এজন্য আমি এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলাম আমার আসল ক্যারিয়ারকে সামনে রেখে। আশা করি এখন থেকে বেশি গুরুত্ব আর গুরুত্বহীন জিনিসের ভেতরের তফাতটা তুইও ধরতে পারবি। আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। আমীন।
ইতি
ঊর্মি
এখানেই চিঠির কথা শেষ হয়েছিল। কিন্তু আমার ভাবনার খোরাকও এখান থেকেই শুরু হয়, যা এখন ও থামেনি। ক্যারিয়ার নিয়ে আমি এখনো ভাবি, তবে দুটো ক্যারিয়ার এর মধ্যে পার্থক্য করবার তাওফিক দিয়েছেন মহান আল্লাহ।
আর ঊর্মি? সে এখনো আমার সাথেই আছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল এর পাশে আমি ওর বাসায় ভাড়া থাকি। ওর বাসা মানে ওর হাসব্যান্ড এর সাথে থাকে, কি আর করা হল এর খাবার ভাল লাগেনি। আর এখানে সেফটি আছে আলহামদুলিল্লাহ্। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইউনিভারসিটি তা চান্স পেয়েই আমি স্যাটিস্ফাইড আলহামদুলিল্লাহ্‌। আমি কি আর ফার্স্ট গার্ল যে মেডিক্যাল এ চান্স পাবো। মাশাআল্লাহ, বারাকাল্লাহ, ঊর্মির মানুষকে সেবা করবার নিয়াত আল্লাহ তায়ালা দয়া করে কবুল করে নিক, আর ঊর্মিকে উত্তম প্রতিদান দান করুক। আমিন।
আমরা তো ক্যারিয়ার নিয়ে খুবই সচেতন আলহামদুলিল্লাহ, আপনি সচেতন তো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ