সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

আল মাহমুদ ও তাঁর কাব্যভুবন

 

মুহম্মদ মতিউর রহমান : আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। অসংখ্য কবির ভিড়ে তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সনাক্তযোগ্য একজন কবি হিসাবে আধুনিক বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ভুবনে নিজের আসন চিহ্নিত করে স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় আধুনিকতার সাথে সনাতন ঐতিহ্য ও গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশের এক স্বচ্ছন্দ সংমিশ্রণ ঘটেছে। যে কারণে তাঁর কবিতার আবেদন হয়েছে অনেকটা সর্বজনীন ও কালাতিক্রম্য। 

আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক হিসাবে পরিচিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩) সবদিক থেকেই বাংলা কাব্যের এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেন। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাবকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে তিনি আধুনিকতার প্রবর্তন করেন। কাব্যের আঙ্গিক, ভাষা-ছন্দ, আবেদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী কবিদের থেকে আলাদা। তাঁর কাব্যের ভুবন একান্তই তাঁর নিজস্ব। মাইকেলের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এক স্বতন্ত্র কাব্য-ভাষা, ভাব-বিষয়, ঐতিহ্য-চেতনা, আবেদন ও ওজস্বিতা নিয়ে তাঁর এক নিজস্ব বর্ণাঢ্য কাব্য-ভুবন নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথের পর কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্যে তাঁর নিজস্ব ধারা ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হলেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়ের জীবনকালে এবং তাঁদের অব্যবহিত পরে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা কাব্যে আবির্ভূত হলেন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), ‘পল্লী কবি’ হিসেবে খ্যাত জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৪), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪), তালিম হোসেন (১৯১৮-৯৯) প্রমুখ। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ঢং-এ কাব্যের সুষমামন্ডিত বর্ণাঢ্য ভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁদের কবিতার দূরাগত স্বপ্নময় উজ্জ্বল ভূবনে তাঁরা স্ব স্ব মহিমায় দীপ্ত, সমুজ্জ্বল। তাঁদের সমকালে আরো অনেকেই বাংলা কাব্যে তাঁদের নিজ নিজ প্রতিভার পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন এবং বাংলা কাব্যে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে প্রতিভাবান যেসব কবি বাংলা কাব্যের দিগন্তকে নানা বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্যতায় সুষমাম-িত করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উলেখযোগ্য হলেন-সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-৭৫), আব্দুল গণি হাজারী (১৯২১-৭৬), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আবুল হোসেন (১৯২২-), সানাউল হক (১৯২৪-৮৩), আবদুর রশীদ খান (১৯২৪-), আতাউর রহমান (১৯২৫-২০০১), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আব্দুস সাত্তার (১৯২৭-২০০০), মাযহারুল ইসলাম (১৯২৮-৮৩), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৮), মোহাম্মদ মাহ্ফুজউলাহ (১৯৩৩-), ফজল শাহাবুদ্দিন (১৯৩৬-), আল মাহমুদ (১৯৩৬-), ওমর আলী (১৯৩৯-), শহীদ কাদরী (১৯৪২-) প্রমুখ। এঁদের মধ্যে আল মাহমুদ নিঃসন্দেহে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উলেখযোগ্য কবি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। হাজার বছরের বাংলা কাব্যের ইতিহাসে অসংখ্য কবির আগমন ঘটেছে, কিন্তু তাঁদের ক’জন অক্ষয়-অমর হয়ে আছেন কালের ইতিহাসে? কেবল মৌলিক প্রতিভার অধিকারী কবি-সত্ত্বাই টিকে থাকে কালের উদ্দাম গতি ও ঝড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে আর তাঁদের প্রত্যেকেরই থাকে এক একটা স্বতন্ত্র পরিচয়, যা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় তাঁদের কাব্যে। 

প্রত্যেক মৌলিক কবিরই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। এ বৈশিষ্ট্য সব সময় এক রকম হয় না। কিন্তু যার যে রকম বৈশিষ্ট্যই থাক না কেন, প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে আমরা সহজে তাঁকে চিহ্নিত করতে পারি। গোলাপ, বেলী, বকুল- প্রত্যেকেই তার নিজস্ব রং, গঠন ও গন্ধেই সুপরিচিত। প্রত্যেক কবিও তেমনি তাঁর নিজস্ব ভাব, ভাষা, শিল্পনৈপুণ্য ও কাব্যিক আবেদনের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জল। আল মাহমুদ তাঁর নিজস্ব ভাষা-রীতি, শিল্প-নৈপুণ্য, উপমা-রূপকল্পের ব্যবহার ও বিষয়-ভাবনার দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছেন। 

বাংলা কাব্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব ঊনিশ শতকেব মধ্য-পঞ্চাশে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে ১৯৩৬ সনের ১১ জুলাই তাঁর জন্ম। পিতার নাম মীর আবদুর রব, মাতা রওশন আরা মীর। পিতামহ মীর আবদুল ওয়াহাব আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ভাষা জানতেন। মাতামহী বেগম হাসিনা বানু মীরের নিকট বিসমিলাহ খানির পর তিনি গ্রামের মসজিদের ইমামের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এম. ই. স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নের পর জর্জ হিক্সথ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। অতঃপর সীতাকু- হাইস্কুল ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। শেষোক্ত হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সনে তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে পড়াশোনা সাঙ্গ করে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করেন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটির পক্ষ থেকে ঐ সময় একটি প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে তরুণ আল মাহমুদের চার লাইনের একটি কবিতা ছাপা হয়। আর তাতেই পুলিশের রোষাণলে পড়ে আত্মগোপন করেন। এ অবস্থায় তিনি কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গে গিয়েও আশ্রয় নেন। তারপর ঘুরে ফিরে ঢাকা শহরে এসে আশ্রয় নেন ১৯৫৪ সনে এবং কালক্রমে এটাই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী আস্তানা। ঢাকায় আসার আগেই স্কুল-জীবনে তিনি কবিতা লেখার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কবিতা লেখার কলা-কৌশল জানার জন্য তিনি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার অন্য আরেকজন খ্যাতনামা এবং তাঁর অগ্রজ কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজ উলাহ্র সান্নিধ্যে যান এবং বাংলা কবিতার ছন্দ সম্পর্কে তাঁর নিকট তালিম গ্রহণ করেন। আল মাহমুদ তাঁর আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় এসে তিনি ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ কবিদের সাথে পরিচিত হন এবং তাঁদের সান্নিধ্যে কবিতা চর্চায় মেতে উঠেন। 

ঢাকায় এসে আল মাহমুদ ১৯৫৪ সনে প্রথমে ‘দৈনিক মিলাত’ পত্রিকায় প্রুফ রীডার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৫ সনে মিল্লাত ছেড়ে তিনি ‘কাফেলা’য় যোগ দেন সহ-সম্পাদক হিসাবে। সেখান থেকে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’এ প্রুফ রীডার হিসাবে যোগ দেন ১৯৬৩ সনে। পরে সেখানে তিনি মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সনে সাময়িকভাবে ‘ইত্তেফাক’ বন্ধ হলে তিনি চট্রগ্রামে ‘বই ঘর’-এর প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। এ সময়ই অর্থাৎ ১৯৬৮ সনের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁর বিখ্যাত ‘সোনালী কাবিনে’র সনেটগুলো রচিত হয়। অতঃপর দৈনিক ইত্তেফাক পুনরায় চালু হলে তিনি তাতে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের ৮ নং থিয়েটার রোডে প্রতিরক্ষা বিভাগের স্টাফ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। 

দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি গ্রুপ ঢাকাস্থ র‌্যাঙ্কিং স্ট্রীট অফিসে ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ প্রকাশ করলে আল মাহমুদ তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। সরকার-বিরোধী র‌্যাডিক্যাল পত্রিকা হিসাবে গণকন্ঠ সরকারের রোষানলে পতিত হয় এবং আল মাহমুদ কারারুদ্ধ হন। এর তিন দিন পর গণকন্ঠও বন্ধ হয়ে যায়। দশ মাস জেলে থাকার পর তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সনে নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীতে সহকারী পরিচালক নিযুক্ত করেন। ১৮ বছর চাকরি করার পর তিনি ১৯৯৩ সনের ১০ জুলাই শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ‘দৈনিক সংগ্রামে’ সহকারী সম্পাদক হিসাবে কয়েক বছর কাজ করেন। 

ইতমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ‘দৈনিক কর্ণফুলি’ প্রকাশিত হলে সম্পাদক হিসাবে সেখানেও তাঁর নামে মুদ্রিত হতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকার লেখক ও কলামিস্ট হিসাবে তিনি কাজ করেন। সমকালীন বাংলা কাব্যে তিনি অন্যতম প্রধান শক্তিমান কবি হিসাবে পরিচিত। তবে কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত হলেও গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সাহিত্যেও তাঁর উলেখযোগ্য অবদান রয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আল মাহমুদ এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। 

মধুসূদন আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কবি হলেও রবীন্দ্রনাথ আধুনিক তথা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। রবীন্দ্র-যুগে রবীন্দ্র-প্রভাব এত ব্যাপক ও সর্বব্যাপী ছিল যে, সেটা অনেকটা একঘেঁয়েমীর মতো মনে হয়। নজরুল এ একঘেঁয়েমীর হাত থেকে মুক্তি দিয়ে বাংলা কাব্যে নতুন প্রাণ-প্রবাহ সৃষ্টি করেন। এরপর তিরিশের কবিরা বাংলা কাব্যে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিরোধী শান্তি-প্রত্যাশী চেতনার বিস্তার ঘটে। তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি জীবনান্দ দাশসহ তিরিশের অনেক কবিই তখন যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তি-প্রত্যাশী, মানবতাবাদী কবিতা চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ তখন পরাধীন, দ্বিতীয় যুদ্ধের পর পঞ্চাশের (বাংলা ১৩৫০, ইংরাজি ১৯৪৩ সন) মন্বন্তরে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, স্বাধীনতা আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ইংরাজ ও হিন্দুদের দ্বিমুখী শোষণ-নির্যাতনে অতিষ্ঠ মুসলমানদের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তিবাদী মনোভাবের কোন স্থান ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে ফররুখ আহমদের আবির্ভাব। নিরন্ন-বুভুক্ষ, স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তৎকালীন পরাধীন ভারতের মুসলমানদের মধ্যে যে স্বপড়বময় আবেগ সৃষ্টি করে ফররুখ আহমদের কাব্যে সে আবেগ রোমান্টিক কাব্য-ভাষা খুুঁজে পায়। ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান সৃষ্টির নেতাদের ডিগবাজি, প্রতারণা ও মুনাফিকীর কারণে ফররুখ আহমদসহ অনেকেরই সে লালিত স্বপ্নের প্রাসাদ গুঁড়িয়ে যাবার উপক্রম হয়। নেতারা যে আদর্শের কথা বলে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁরা বেমালুম সেটা ভুলে যান। ফলে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এ হতাশা ক্রমান্বয়ে আরো বৃদ্ধি পায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি নানারূপ বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে। এ ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কবি আল মাহমুদের কাব্য-ক্ষেত্রে আবির্ভাব। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর প্রথম কাব্য ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৭০ (১৯৬৩) সনে। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় যেমন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও জীবনী ইত্যাদি সাহিত্যের নানা আঙ্গিকে তিনি কাজ করেছেন। 

প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থাকে। সৃষ্টিশীল প্রতিভার ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি প্রযোজ্য। তাঁরা তাঁদের স্ব-স্ব জীবনীদৃষ্টি দ্বারা আমাদের নিকট পরিচিত। অনেক সময় ভাল লাগা, মন্দ লাগার মাপকাঠিও তৈরি হয় এর ভিত্তিতে। নিজস্ব বর্ণ-সুষমা, সুরভি-সৌকর্যে যেমন ফুলের পরিচয়, কবির পরিচয়ও তেমনি তাঁর কাব্য-কর্মের মাধ্যমে। আর এ পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হলো তাঁর রচিত কাব্যে প্রতিফলিত বিশ্বাস, বিষয়-বৈভব, ভাবৈশ্বর্য, বাক-বিন্যাস, কলা-নৈপুণ্য, ছন্দ, প্রতীক, উপমা, রূপক ইত্যাদির ব্যবহারে। বিশ্ববিখ্যাত অমর কবি হোমার, মিল্টন, হাফিজ, রুমী, জামী, ফেরদৌসী, শেখ সাদী, ইকবাল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এঁরা সকলেই তাঁদের স্বকীয় জীবনদৃষ্টির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁদের কাব্যে। এ বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় ব্যতীত বলিষ্ঠ উজ্জ্বল কাব্য-কবিতা রচনা করা অসম্ভব। বিশ্বাসের দীপ্তি প্রত্যেক কবিরকাব্য-ভুবনে চন্দ্রালোকের উজ্জ্বল কিরণ-প্রভা বিকিরণ করে। আল মাহমুদও বিশ্বাসের বৃত্তে আবর্তিত। তবে তাঁর বিশ্বাস কোন একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে স্থিত থাকেনি, নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে এক স্থায়ী, উজ্জ্বল রূপ লাভ করেছে। 

প্রথম জীবনে আল মাহমুদ ছিলেন অনেকটা সংশয়বাদী, বামপন্থী, মার্কসীয় চিন্তা-চেতনার ধারক। ধীরে ধীরে তাঁর বিশ্বাসের বলয়ে পরিবর্তন ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় লাভকারী মুক্তিযোদ্ধা কবি। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে তৎকালীন সরকারের বিরোধিতার কারণে কারারুদ্ধ হন। এ কারাবাসকালেই তাঁর জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সংঘটিত হয়। তাঁর ভাষায় ঃ 

“আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগত-রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কোরানে এসে উপনীত হয়েছি।” (আল মাহমুদঃ কবিতার জন্য বহুদূর, পৃ. ৩২-৩৩)।

এরপর কবি আরো স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের কথা উচ্চারণ করেনঃ 

“...আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহলোকেই আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ্ববিনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবক্রমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম। এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার কবিস্বভাবকে আমি উৎসর্গ করেছি। ... আল্লাহ প্রদত্ত কোন নিয়মনীতিই কেবল মানবজাতিকে শান্তি ও সাম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে। আমার ধারণা পবিত্র কোরানেই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে। এই হলো আমার বিশ্বাস। আমি এ ধারণারই একজন অতি নগণ্য কবি।” (পূর্বোক্ত, পৃ.৩৩)। 

কবি অন্যত্র বলেনঃ “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অলৌকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। মার্কসবাদ সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়ে। (আল মাহমুদ ঃ কবির আত্মবিশ্বাস, পৃ ১১)। 

আল মাহমুদ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে আরো বলেনঃ “নাস্তিকতার ওপর মানবতা দাঁড়াতে পারে না, পারবে না।” (ঐ, পৃ১৮)।

আল মাহমুদ কোন গতানুগতিক মুসলমান নন। আধুনিক বিভিন্ন মতবাদ, প্রচলিত প্রধান ধর্মসমূহ ইত্যাদি গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে ঐশী গ্রন্থ আল কুরআনের সাথে তা মিলিয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাই প্রচলিত ধারণা ও অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে নয়, গভীর প্রত্যয়ের সাথে মুক্ত মন ও উদার যুক্তিপূর্ণ মানসিকতা থেকেই তিনি ইসলামকে একমাত্র সত্য ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাই তিনি অবিচল বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারেন ঃ 

উদিত নক্ষত্র আমি। শূন্যতার বিরুদ্ধগামী, পূর্ণ করে তুলেছি বিস্তার। 

আমি আলো, দীপ্ত করে তুলেছি পৃথিবী। 

আমি তাল মাত্রা বাদ্যযন্ত্র ছাপিয়ে ওঠা আত্মার ক্বেরাত। 

আরম্ভ ও অস্তিমের মাঝখানে স্বপ্ন দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত 

আগুনের বিনীত গোলক। 

নবী ইব্রাহিমের মত অস্তগামীদের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। 

আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না। 

কে তুমি চির বিরাজমান। তোমাকে সালাম। তোমার প্রতি 

মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। এই আমার রুকু, এই আমার সেজদা। 

(হে আমার আরম্ভ ও শেষ ঃ দোয়েল ও কবিতা) 

এখানে কবির বিশ্বাস ও প্রত্যয়দীপ্ত আত্মসমর্পিত চিত্তের গভীর আকুতি নিঃসংশয় প্রার্থনার মত অভিব্যক্ত হয়েছে। কবির এ বিশ্বাস ও প্রত্যয় তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, অন্তরের একান্ত গভীর উপলব্ধি থেকে সঞ্জাত। অতএব, ধরে নেয়া যায় তা নিখাদ ও অকৃত্রিম। কবির বিশ্বাসের সাথে বিষয়, বিষয়ের সাথে ঐতিহ্য-চেতনা ও বিষয়-বৈভবের দিক থেকে তাঁর পূর্বসূরী নজরুল-ফররুখের সাথে ঘনিষ্ঠ অন্বয় থাকলেও কবি-কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গীর দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, ভিনড়ব স্বাদ ও মেজাজের। এ বৈশিষ্ট্যের গুণেই আল মাহমুদকে সহজে চেনা যায়। ঐতিহ্য ধারণ করে ঐতিহ্যের ছড়ে নতুন ঝংকার সৃষ্টি করার মধ্যেই মৌলিকতার প্রকাশ। আল মাহমুদের মধ্যে সে মৌলিকতা সুস্পষ্ট।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ