শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

পর্নোগ্রাফির কারণসমূহ : ক্ষতি এবং তার প্রতিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [চার]
বাস্তবেই ইসলাম নারী ও পুরুষের যৌন জীবনকে পারিবারিক বন্ধনের সীমারেখায় সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধাপূর্ণ করতে নির্দেশনা প্রদান করে। রসূলুল্লাহ সা, বলেছেন, “আমি কি তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে তোমাদের বলব? তারা হচ্ছে স্নেহপরায়ণ, অধিক সন্তান প্রসবকারিনী এবং স্বামীদের প্রতি বিনম্ন সংবেদনশীল, যারা যখন কষ্ট পায় বা কষ্ট দেয়, স্বামীর নিকট এসে হাত ধরে এবং বলে, আল্লাহর শপথ! তোমার প্রফুল্লচিত্ত না হওয়া পর্যন্ত আমি কোন কিছুর স্বাদ নেব না।’’ ‘‘ইমাম নাসাঈ, আস-সুনাদ আল-কুরবা, অধ্যায়: ‘ইসতিন নিসা, পরিচ্ছেদ: আল-মুলা’ইবাতি, বৈরূত: দারুল-কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৯১, পৃ: ২৫০৫’’
বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধকরণ ঃ ইসলাম নারী-পুরুষের বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন, “সে যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিল সে তার কাছ থেকে অসৎকাজ কামনা করল ও দরজাগুলো বন্ধ করে দিল এবং বলল, ‘আস’। সে বলল, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না। সে নারী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে পেত। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়ে ছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত। ‘‘আল-কুরআন, ১২:২৩-২৪’’
বস্তুতই যুগে যুগে বিকৃত চিন্তা-চেতনার অনুসারী কিছু সংখ্যক লোক শয়তানের প্ররোচনায় নানা রকম অসামাজিক, অশ্লীল এবং পাশবিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্কও তেমনি একটি ঘৃণিত অশ্লীল অপরাধ। কুরআনে বলা হয়েছে “হে ঈমানদারগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তখন তো শয়তান নির্লজ্জতা ও মন্দকাজের আদেশ করবে। যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া তোমাদের প্রতি না থাকত, তবে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র হতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন। আল্লাহ সব কিছু জানেন, শোনেন। ‘‘আল-কুরআন, ২৪:২১’’ সমাজ-সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সকল প্রকার মন্দ, দোষণীয়, অশ্লীল ও অশালীনতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য ইসলাম মানব জাতিকে নির্দেশ দিয়েছে।
ইসলামে একজন পুরুষ ও একজন নারীর মাঝে বিবাহের প্রস্তাবদান ও তা গ্রহণ করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কাজেই বিবাহের আগে সামান্য সম্পর্ক রাখাও বৈধ নয়। রসূলুল্লাহ সা: বলেন, “আমি যখন কোন একজন যুবক ও যুবতীকে নির্জনে একত্র যদি দেখি তখন আমি বিশ্বাস করি না যে, শয়তান তাদের প্ররোচনা দেয় না। ‘‘ইমাম বায়হাকী, আস-সুনান আল-কুবরা, অধ্যায়: আল-অসায়া, পরিচ্ছেদ: জিমা’উ আবওয়াবিত তারগীব ফিন নিকাহ, বাবু তাখসিসিল ওয়াজহি ওয়াল কাফ্ফাইন বি যাওয়াবিন, প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৮৮০’’ কাজেই শুধু এনগেজমেন্টের কারণেও তারা পরস্পর নির্জনে মিলিত হতে পারে না। কেননা পরস্পর মেলামেশা, অপ্রয়োজনীয় দেখা সাক্ষাৎ কিংবা কথাবার্তার মধ্য দিয়ে অনৈতিক ভাব সৃষ্টিক হতে পারে। আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বাক্যালাপ কর না, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। ‘‘আল-কুরআন, ৩৩:৩২’’ কাজেই শুধু এনগেজমেন্ট হওয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য তো হয় না অথচ এমতাবস্থায় কখনো কখনো তাদের মাঝে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
ব্যভিচার নিষিদ্ধকরণ ঃ ইসলাম অশ্লীল কাজ হিসেবে ব্যভিচারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘‘ব্যভিচারিণী নারী এবং ব্যাভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর। ‘‘আল-কুরআন ২৪:২’’ আল্লাহ লজ্জাস্থান হিফাজতকারীকে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজাতকারী নারী; আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও যিকিরকারী নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। ‘‘আল-কুরআন, ৩৩:৩৫’’ তাই আল্লাহ ব্যভিচারকে শুধু নিষিদ্ধই করেননি; বরং ব্যভিচারের নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:৩২’’
রসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘সাত প্রকার লোককে আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামতের দিন) তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দান করবেন। সেদিন আরশের ছায়া ছাড়া আর অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (সেই সাত শ্রেণীর একজন হল) যে ব্যক্তিকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী রমণী ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানায় আর ঐ ব্যক্তি শুধু আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে। ‘‘ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসিলম, অধ্যায় : আল-যাকাত, পরিচ্ছেদ : ফাদলু ইখফাইস সাদাকাহ, প্রাগুক্ত, পৃ: ৬৪৮’’ ‘‘সুতরাং যৌনসঙ্গমরত কোন স্থিরচিত্র ও ভিডিও দেখাও ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার গুণাহের মতো। পর্ণোগ্রাফি ছবি বা অশ্লীল সিনেমা দেখাও ব্যভিচারের সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় নিষিদ্ধ। কেননা রসূলুল্লাহ সা: বলেন, চোখের যিনা দৃষ্টি দেখা, কানের যিনা শ্রবণ করা, মুখের যিনা কথা বলা, হাতের যিনা স্পর্শ করা, পায়ের যিনা পথ চলা। ‘‘ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ, অধ্যায়: মুসনাদুল ‘আশারাহ আল-মুবাশিশরীনা বিল জান্নাহ-মুসনাদু আবি হুরাইরা রা. প্রাগুক্ত, পৃ: ২০৯২’’ চোখের মাধ্যমে ব্যক্তি নারীর সৌন্দর্য ও রূপ উপভোগ করে। পরবর্তীতে এরূপ কাজের প্রতি অন্তরে ভাবের সৃষ্টি হয়। আর এ পথ ধরেই শুরু হয় অশ্লীলতা। ড. মুজাম্মিল সিদ্দিকী বলেন, “পর্ণোগ্রাফিক সিনেমা দেখা, এরূপ গান শুনা কিংবা গাওয়া, কারও হাত-পা এরূপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এসব কাজই এমন অপরাধ বা ব্যভিচার-সংশ্লিষ্ট এবং ব্যভিচারের চূড়ান্ত কাজটি এসবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। “Dr. Muzammil Siddiqi, ‘’This means that watching pornographic movies, listening to such songs or singing them, using one’s hands and feet for this purpose, all these are sins that are related to Zina and then the final act of Zina takes place through haram intercouse’’  http:// www. soundvision.com/ info/ life/ porn/ isporn.asp. accessed on 15th March 2012. সুতরাং পর্ণোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করাও নিষিদ্ধ। কেননা মুসলিমদের সর্বসময় দৃষ্টি অবনত করার আদেশ করা হয়েছে যেন সে অন্য কারো গোপন অঙ্গ দেখা থেকে বিরত থাকে।’
সমকামিতা নিষিদ্ধকরণ ঃ ব্যভিচারের আরেকটি বিকৃত রূপ হচ্ছে সমকামিতা। মানব সভ্যতার উন্নয়নে সমকামিতা এক বড় অন্তরায়। কুরআন এবং হাদীসের নানা স্থানে সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআনের সাত জায়গায় লূত আ. এর জাতির কথা বলা হয়েছে, যাদেরকে সমকামিতার অপরাধের জন্য আল্লাহ ধ্বংস করে দেন। ‘‘সূরা আল-আরাফের ৮০-৮৪ আয়াত, সূরা হুদ এর ৭১-৮৩ আয়াত, সূরা আল-আম্বিয়া এর ৭৪ আয়াত, সূরা আল-হাজ্জ্ব এর ৪৩ আয়াত, সূরা আশ-শুয়ারা এর ১৬৫-১৭৫ আয়াত, সূরা আন-নামল এর ৫৬-৫৯ আয়াত, সূরা আনকারুত এর ২৭-৩৩ আয়াত’’ আল্লাহ বলেন, “আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে তার জাতিকে বলল, ‘তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি। তোমরা তো তৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন কর, তোমরা তো সীমালঙ্ঘন করছ। ‘‘আল-কুরআন, ৭ : ৮১’’ “তোমরা নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের সাথে যৌন কামনা পূর্ণ করছ? তোমরা তো মূর্খ সম্প্রদায়। ‘‘আল-কুরআন ২৭ : ৫৫’’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ