শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নকল ও ভেজাল ওষুধ

দেশের ওষুধের বাজারে শুধু বিশৃংখলাই চলছে না, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারিতাও চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর ফলে অসুস্থ ও বিপন্ন অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে জনগণকে একদিকে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে যথেচ্ছ প্রতারণারও শিকার হচ্ছে তারা। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ওষুধের বাজারের এই বিশৃংখলা এবং স্বেচ্ছাচারিতার অন্তরালে ওষুধের ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের পাশাপাশি রয়েছে নাম করা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি। কিন্তু সব জেনেও সরকার কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সাধারণ ওষুধের পাশাপাশি দাম বাড়ানো হচ্ছে এমনকি জীবন রক্ষাকারী সকল ওষুধেরও। অনুসন্ধানে জানা গেছে,  ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধে এরই মধ্যে ছেয়ে গেছে দেশের ওষুধের বাজার। এসব বিষয়ে জানা সম্ভব হচ্ছে না বলে জনগণও ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধই কিনছে এবং খাচ্ছে। তারা শুধু অসুস্থ ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, নানা অসুখে ভুগে বহু মানুষের মৃত্যুও ঘটছে। এ ধরনের ওষুধের তালিকা যেমন অনেক দীর্ঘ তেমনি প্রস্তুতকারী কোম্পানীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়াবিটিসসহ মারাত্মক কিছু রোগের জন্য ব্যবহৃত দুষ্প্রাপ্য ও খুবই দামী বিভিন্ন ওষুধ। তাছাড়া পেনিসিলিন, নন-পেনিসিলিন ও সেফালোস্পেরিনসহ অ্যান্টিবায়োটিক ধরনের কিছু বিশেষ ওষুধও রয়েছে, যেগুলো কঠিন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এমন অন্তত ২৯টি প্রস্তুতকারী কোম্পানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল, যে কোম্পানীগুলো ভেজাল ও স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ওই বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
প্রকাশিত রিপোর্টে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের এলাকাভিত্তিক কর্মকান্ডের তথ্য জানাতে গিয়ে বলা হয়েছে, এসব সিন্ডিকেট দেশের অন্তত ৪০টি জেলার ওষুধের বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। মিটফোর্ড, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, ফর্মগেট, গুলশান, মহাখালী, পান্থপথসহ রাজধানীর বিরাট এলাকাজুড়ে তাদের দৌরাত্ম্য চলছে। সরকারের প্রশ্নসাপেক্ষ নীতি ও ভূমিকার সুযোগ নিয়ে ওইসব সিন্ডিকেট ও তাদের নিয়ন্ত্রিত কোম্পানীগুলো শুধু যথেচ্ছভাবে ওষুধ প্রস্তুত করার কার্যক্রমই চালাচ্ছে না, নতুন নতুন আরো কিছু কোম্পানীও ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ প্রস্তুত করার অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। বছর খানেক আগেও যেখানে দেড় থেকে দু’হাজার টাকায় ডায়াবিটিসের ইনসুলিন পাওয়া যেতো সেখানে একই ইনসুলিনের জন্য বর্তমানে তিন হাজার থেকে চার-পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। কম-বেশি একই রকম হারে বেড়েছে অন্য সব জরুরি ওষুধের দামও।
নিজেদের কর্মকান্ডকে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকারী কোম্পানীগুলো কাঁচামালের মূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছে। ইনসুলিনসহ যেসব ওষুধ আমদানি করতে হয় সেগুলোর ব্যাপারেও বিচিত্র বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, নানা বাহারী রঙের দামী মোড়ক ও বোতলসহ এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর পেছনে সহজেই অর্থের ব্যয় অনেক পরিমাণে কমানো সম্ভব এবং কমানো উচিতও। তাছাড়া কাঁচামাল ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ধরনের যুক্তিগুলোকেও গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। কারণ, তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোম্পানিগুলো বহুদিন ধরেই নানা অজুহাতে ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে। বাস্তবে কাঁচামাল বা ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাদের এই দাম বাড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই।
ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ প্রস্তুত করার মধ্য দিয়েও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক অপরাধ করে চলেছে কোম্পানিগুলো। এ বাপারে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ব্যবসায়ী নামের একটি বিশেষ গোষ্ঠীÑ যাদের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের রিপোর্টে নাম ধরে ধরে তাদের সম্পর্কে জানানোও হয়েছে। কিন্তু কোনো ওষুধ বা কোম্পানীর ব্যাপারেই সরকারি কোনো বিভাগ বা দফতরের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি দেখার ও প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব যেসব সরকারি সংস্থার সেসবের কর্তাব্যক্তিদের ঘুষের বিনিময়ে থামিয়ে রাখা এবং ‘ম্যানেজ’ করা হয়। এভাবে দেশের বাজারে ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধের অবাধ বিক্রির কারণে সব মিলিয়েই এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এসবই সম্ভব হচ্ছে সরকারের গাফিলতির কারণে। কারণ, বিএসটিআইসহ এমন অনেক সংস্থা ও বিভাগ রয়েছে যারা সঠিকভাবে যার যার দায়িত্ব পালন করলে কথায় কথায় দাম বাড়ানো এবং এত বেশি ধরনের ওষুধে ভেজাল মেশানো ও সেগুলোকে খোলা বাজারে বিক্রি করা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে বাস্তবে সেটাই হচ্ছে এবং হচ্ছেও বিপুল পরিমাণে। এর ফলে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদে তারাই বরং বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে পুরো জাতিকেই ধ্বংস করে দেয়ার ভয়ংকর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। টাকার লোভে এদেশেরই এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী নামধারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জাতি ধ্বংসের এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিচ্ছে।
আমরা মনে করি, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধের ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সরকারকে একই সঙ্গে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্যও প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে কোনো ওষুধ কেনার আগে তারা সহজে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, জীবন রক্ষাকারীসহ সকল ওষুধের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে আনা হোক এবং ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধ বিক্রি বন্ধের পদক্ষেপ নেয়া হোক, যাতে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ