বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চায়নার মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ

স্টাফ রিপোর্টার : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চায়না বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। দু’দেশের মধ্যকার বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কয়েক দশকে দ্বি-পাক্ষিক এ সম্পর্ক আরও উন্নত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধের কারণে তাদের এ সম্পর্কে চির ধরেছে।
আইসিসিবি ত্রৈমাসিক বুলেটিনের সম্পাদকীয় এ কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির ২০১৭ এর বিশ্ব ফ্যাক্টবুক অনুসারে, বিগত তিন বছর ধরে পারচেজিং পাওয়ার পারিটিকে ভিত্তি ধরে মার্কিন ২৩.১২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হিসাবে চায়না বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির অবস্থানে রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমূহ (১৯.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি) এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি)। বিশ্বের এ তিন বৃহৎ অর্থনীতির মোট উৎপাদন ৬২.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বের মোট অর্থনীতির ৪৯ শতাংশ।
এতে বলা হয়, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে চায়নার সর্ববৃহৎ রপ্তানি বাজার এবং ষষ্ঠ আমদানিকারক দেশ। অন্যদিকে, চায়না হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুতবর্ধনশীল রপ্তানি বাজার এবং সর্ববৃহৎ আমদানিকারক দেশ। দু’দেশের মধ্যে বিবাদমান শুল্কবিরোধ বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে নাড়া দিতে পারে যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিরোধ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক সময়ে চায়নার রিলিজকৃত হোয়াইট পেপার অনুযায়ী ২০১৭ সালে দু’দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ৫৮৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁচেছে। ট্রাম্প প্রশাসন চায়না থেকে আমদানিকৃত পন্যের উপর ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আমদানি শুল্ক আরোপ করে চায়নাকে বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের বিপরীতে চায়না মার্কিন পন্যের উপর ১১০ বিলিয়ন ডলার আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। বৃহৎ দুই শক্তির মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য বিরুপ প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাত থেকেই সতর্ক করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, বাস্তবতা হচ্ছে অধিকাংশ এশিয়ান দেশের জন্যই চায়না হচ্ছে একক বৃহৎ বাণিজ্য গন্তব্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে দু’দেশের মধ্যে বিবাদমান সম্পর্ক এ অঞ্চলের অস্বস্তির কারণ হয়েছে।
আইসিসিবি বলছে, ২০১৮ এর নভেম্বরে পাপুয়া নিউ গিনিতে এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সভায় অংশ নেয়া দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ যুক্ত বিবৃতিতে আসতে পারেনি, এপেকের ২৫ বছরের ইতিহাসে এটাই প্রথম এ ধরনের ঘটনা। প্যাসিফিক অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিপরীতে চায়নার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এটা ঘটেছে। প্যাসিফিক নিয়ে এ দেশগুলোর মধ্যে অব্যাক্ত যুদ্ধ এ সামিতে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
এতে বলা হয়, ডিসেম্বরের ১ তারিখে রোয়েনস এয়ারসে জি-২০ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চায়না সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চায়না উভয়ই ৯০ দিনের জন্য শুল্ক বাড়াতে বা নতুন শুল্ক আরোপ করা থেকে বিরত থাকবে (মার্চ ১, ২০১৯ পর্যন্ত। জানুয়ারির ৭ তারিখে বেইজিংএ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চায়নার প্রতিনিধিগন মুখোমুখী আলাপ-আলোচনায় বসেন। ৯০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এটাই প্রথম আলোচনা। উভয় পক্ষই নিবিড় যোগাযোগ রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়।
যেহেতু বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হারে বাণিজ্যের মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, বাণিজ্যের উপর আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নির্ভরশীলতা ১৯৬০ সালের ১৭.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ৫১.৯ শতাংশ হয়েছে।
২০১৮ এর ১৭ এপ্রিল রিলিজকৃত আএমএফ এর ”ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক” এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্ধমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা গ্লোবাল ভ্যালু চেইনকে ভেঙ্গে দিবে, নতুন প্রযুক্তির প্রসারের গতিকে কমিয়ে দিবে, বিশ্ব উৎপাদন এবং বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে যার ফলে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। অক্টোবর মাসে আএমএফ আরও সতর্ক করে যে বিশ্ব বাণিজ্যে এ টেনশনের কারনে সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সময় আইএমএফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ২০১৯ সালের জন্য ২.৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের জন্য আরও কমিয়ে ১.৮ শতাংশ প্রজেকশন দেয়। এটা নি:সন্দেহে বিশ্বব্যাপী সূদুরপ্রসারী হতাশার সৃষ্টি করবে কেননা এ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চায়নার মধ্যে বাণিজ্য বিবাদ কখনোই বিশ্বাস এবং গঠনমূলক সহযোগিতার জন্য সহায়ক হবে না। সুতরাং টেকসই বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য কোনরকম কালক্ষেপন না করে চলমান বিবাদকে উপশম করা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ