রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে নামাযের ভূমিকা

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : আল্লাহর এবাদত কারী হিসেবেই আমরা দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছি। ইবাদত অর্থ আনুগত্য, দাসত্ব, মেনে নেয়া, অধীনতা স্বীকার করা। এবাদতের আসল অর্থ হল প্রতিদিনের জীবনে সব পদক্ষেপে আল্লাহ তাআলার বিধানে আনুগত্য করা। আল্লাহর আইন মেনে নেয়া, তাঁর দাসত্বে নিজেকে আবদ্ধ রাখা তাঁর অধীনতা স্বীকার করে জীবন-যাপন করাই বান্দার কাছে আল্লাহর দাবী। জীবনের এ লক্ষ্য হাসিল করতে বান্দাহকে সবর্দা সক্রিয় হতে হবে। এজন্য দরকার কঠোর সাধনা, অধ্যবসায় ও নিয়মনিষ্ঠ প্রতিদিনের জীবন। তাকে হতে হবে অনুগত  অন্তর, বিন¤্রহৃদয়, তার মধ্যে বিরাজ করবে সূক্ষ্ম দায়িত্ববোধ, পবিত্র নৈতিকতা, বিশুদ্ধ ঈমান এবং নিরলস প্রচেষ্টা। গভীর ভাবে বুঝতে চেষ্টা করলে পরিষ্কার হয়ে আসে যে, একমাত্র নামাযেই ঐসব গুনাবলী পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে নামাযের মাধ্যমেই তাঁর আনুগত্যপরায়ণ বান্দা হবার নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। নি¤েœ শ্রেষ্ঠ গুণাবলীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে নামাযের ভূমিকা তুলে ধরা হল।
১। আল্লাহর স্মরণে নামায : আল্লাহ বলেন-“আমার স্মরণের জন্যই নামায কায়েম কর। (সূরা- তাহা- ১৪) আল্লাহর স্মরণের কারণেই বান্দাহ প্রতিদিন কঠিন ব্যস্ততায়ও নামাযে দাঁড়িয়ে যেতে অবহেলা করে না। মনোযোগের সাথে আল্লাহর পদতলে সিজদার লুটিয়ে পড়ে।
২। আল্লাহর ভয় জাগ্রত করতে নামাযের ভূমিকা : নামাযী তার কিরাম, রুকু, সিজদা দ্বারা বিন¤্র আমলদার হয়ে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে উঠে। আল্লাহর কাছে জবাবদীহিতার ভয়ে সে জীবনের সব কাজে সচেতন হয়ে উঠে। আল্লাহর ভয় তার হৃদয়ে থাকায় সে অন্যায় কাজ করতে পারে না।
৩। বিনয়ী হতে নামাযের ভূমিকা : মহান প্রভু আল্লাহর সামনে দাড়িয়ে প্রতিদিন এই দুর্বল বান্দাহ নামায পড়তে থাকায় তার চরিত্রের মধ্যে বিনয়ী ভাব চলে আসে। এ ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য হল- “ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই নামায খুব কঠিন কাজ। কিন্তু বিনয়ী অনুগত লোকদের জন্য তা কঠিন নয়। মহান প্রভু আল্লাহর সামনে বার বার মোমেন বিনয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলে। সূরা বাকারা- ৪৫।
৪। আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বের প্রশিক্ষণে নামায : নামাযের  মধ্যে দাড়িয়ে বান্দা বার বার বলে- ইয়্যাকা না’বুদু- আমরা কেবল তোমারই দাসত্ব করি। (সূরা ফাতিহা) বান্দাকে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম মোতাবেক নামাযের সব অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। যেভাবে চাওয়া হয়েছে সেভাবেই তাকে সব দিক ঠিক রেখে নামায আদায় করতে হয়। এভাবেই বান্দার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব করার মজবুত চরিত্র গড়ে উঠে। নামাযের এ আনুগত্যপরায়ণতা সমাজ ও দেশের সাথে বড়দের আনুগত্যে অবনত হতে সে আপত্তি করে না। বাস্তব জীবনে র্শিকমুক্ত নির্ভেজাল জীবন যাপনে সে পাকা সৈনিক হয়ে যায়।
৫। নিয়মানুবর্তী হতে নামাযের অবদান : আল্লাহ পাক বলেন-“নিশ্চয়ই নামায এমন একটি ফরয যা নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করবার জন্য মুমিনদেরকে হুকুম দেয়া হয়েছে। (সূরা নিসা- ১০৩) দৈনিক পাঁচ বার কবর যথাসময়ে নামাযের জামায়াতে শরীক হয়ে বান্দাহ সমস্ত কাজের বেলাতে নিয়মানুবর্তী হতে শিক্ষা পায়। সুন্দর জীবন গঠন প্রণালী এখানে পাওয়া যায়। নামাযীদের জীবনে নামাযের প্রভাবে তারা নিয়মানুবর্তী হয়ে যায়।
৬। কর্তব্যপরায়ন ও দায়িত্ববান হতে নামাযের শিক্ষা : নামাযই মানুষের অন্তরে সব হুকুম আহকাম পালনে কর্তব্যবোধ ও দায়িত্ব নিষ্ঠা বপন করে দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত আযান কানে এলেই নামাযী মসজিদমুখী হতে সচেতন হয়ে উঠে। এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “আযানের শব্দ শুনবার পরও যারা ঘরে বসে থাকে আমার ইচ্ছা হয় তাদের গৃহে আগুন লাগিয়ে দেই।” তাই নামাযে অভ্যন্ত বান্দাহ কি ঈমাম কি মোক্তাদি সবাইকে কাটায় কাটায় সময় মত জামায়াত শুরু করতে খুবই দায়িত্ববান হতে হয়। নামাযের এ শিক্ষা ব্যবসা বাণিজ্য বা চাকুরী সর্বত্রই কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্ববান হতে শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনকে কর্মমুখর জীবন বিধান, দ্বীন ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য কর্তব্য পরায়ন ও দায়িত্ববান করে গড়ে তোলো।
৭। নিয়ম নিষ্ঠ হতে বান্দাকে নামায তৈরী করে : প্রতিদিন বান্দাকে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে নামায আদায় করতে হয়। নিয়ম কানুন মেনে নামায আদায় করার কারনে বান্দা তার প্রাত্যহিক জীবনে নিয়ম নিষ্ঠ হতে যোগ্য হয়ে উঠে। কোন রকম অনিয়ম তার চরিত্রে বরদাশত করে না।
৮। অন্যায়, অশ্লীলতা ও অপরাধমুক্ত জীবন গঠনে নামায যোগ্য করে গড়ে তোলে : আল্লাহ পাক বলেন, “হে নবী) আপনি নামায কায়েম করুন। নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবুত- ৪৫)
নামাযের শিক্ষাতেই নামাজী নিজে ন্যায়বান হয়ে উঠে। যাবতীয় অন্যায় অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থেকে সে চরিত্রবান হয়ে যায়। তাই নামাযের আগে পরে সব কাজ কর্মেই সে হয়ে উঠে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকারী আর অন্যায়ের প্রতিরোধকারী। আল্লাহ বলেন- আর নামায কায়েম কর, দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশ পার করার পর, নিশ্চয়ই ভাল কাজ মন্দ কাজকে দূরীভূত করে। (সূরা হুদ-১১৪)
৯। নামায পবিত্র জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে : নামাযীকে তার দেহ মনকে পবিত্র করতে অজু করতে হয়। পবিত্র দেহ নিয়েই নিয়মিত নামায আদায় করতে হয়। নামাযের জন্য যে পবিত্রতা অর্জন করতে হয় ঐ পবিত্রতা নিয়ে ঘরে বাহিরে সর্বত্র সবকাজে বিচরণ করা সম্ভব হয়। দৈহিক পবিত্রতা থেকে মনের পবিত্র আসে। এভাবে পবিত্র মনের মানুষই নিষ্পাপ থাকতে চায়। তার চলা ফিরায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করে থাকে। সদা সর্বদা সে স্বচ্ছ ও পুত পবিত্রতায় থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে।
১০। সংঘবদ্ধ জীবনের প্রতিচ্ছবি হল জামায়াতে নামায : নামাযীদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত জামায়াতের সাথে ফরয নামায আদায় করতে হয়। একজন ঈমাম বা নেতার আনুগত্য করে নামাযের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত আসনে সক্রিয় থাকতে হয়। জামায়াতে নামায থেকেই জামায়াত বদ্ধ জীবন পরিচালনার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। সমাজ ও দেশে আল্লাহর দ্বীনের আলোকে চলতে হলে দলবদ্ধতার বিকল্প নেই। কুরআন হাদীসে দলবদ্ধতার গুরুত্ব তুলে অনেক বাণী রয়েছে।
১১। পারস্পরিক ভালবাসায় নামাযের ভূমিকা : বান্দা নামাযের তাশাহুদে বলে-সালাম নিজের প্রতি ও সাথী এবাদতকারীদের প্রতি। নামায শেষ করতে দুই দিকে মুখ ফিরিয় বান্দাহ বলে-আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। অর্থাৎ তোমাদের প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। এভাবে একে অপরের প্রতি বার বার শান্তি ও রহমতের দোয়া করতে থাকে। এই নামাযীরাই রাস্তায় দেখা হলে একে অপরকে সালাম জানিয়ে দোয়া করতে থাকে। তাতে পারস্পরিক ভালবাসার মজবুত সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়।
১২। নামায সময় নির্ধারক : প্রতিদিন ফজর, জোহর, আছর, মাগরিব ও এশার জামায়াতে শরীক হয়ে বান্দাহ তার জীবনটাকে সময়ের ছকে তৈরী করতে শিখে। সমস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পূর্ণ প্রস্তুতির শক্তি ও সুযোগ এনে দেয় এই নামায। আল্লাহ বলেন-নিশ্চয় নামায তোমাদের সময় নির্ধারক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ