রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আল্লাহর গযব কী কী কারণে নাযিল হয়

-মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
এ পৃথিবী এমনিতেই সৃষ্টি হয়নি। বরং এর একজন স্রষ্টা আছেন। তিনি হলেন- করুণার আধার, দয়ার নিধান আল্লাহ তা’য়ালা। তাঁর ইঙ্গিতেই পৃথিবীর সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে। তিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ভূষিত করেছেন। যেমন- ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয়ই আমি সম্মানিত করেছি মানব জাতিকে এবং তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছি সর্বত্র (সূরা বনী ইসরাঈল- ৭০)। আরো ইরশাদ করেছেন- তিনি সে মহান সত্তা যিনি মানব জাতির কল্যাণে পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন (সূরা বাকারা- ২৯)। আরো ইরশাদ করেছেন- তোমরাই উত্তম উম্মত, মানবের কল্যাণার্থে তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে (সূরা আলে ইমরান- ১১০)।
আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব যদি তার আসল মালিককে ভুলে যায় এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তার মালিক তার প্রতি শুধু অসন্তুষ্টই হন না বরং তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হন। তবে আল্লাহ তা’য়ালা যেহেতু অতিশয় মেহেরবান, দয়াময় এবং নিরান্নব্বই ভাগ দয়া-মায়া তাঁর কাছে, সেহেতু তিনি তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রয়োগ প্রয়োগ করেন না। তা’ছাড়া আমাদের প্রিয় নবী (স) আল্লাহ তা’য়ালার কাছে এ দোয়া করেছিলেন যে, তাঁর উম্মতকে যেন পূর্বেকার উম্মতের ন্যায় শাস্তি তথা মানবাকৃতিকে বানর, শূকর ইত্যাদি আকৃতিতে রূপান্তর, পাথরের বৃষ্টি, ভূমি উল্টিয়ে দেয়ার মত কঠিন প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিনষ্ট করা না হয়। পূর্বেকার নবীর উম্মতদেরকে তাদের পাপের কারণে বানরে, শূকরে, ভূমিধসে, দেশকে উল্টিয়ে দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। আল্লাহর গযব নাযিল হওয়ার কতিপয় কারণ নি¤œরূপ।
১. পাপের সীমা ছাড়িয়ে গেলে : মানুষ পাপ করতে করতে যখন পাপের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই আল্লাহর শাস্তি নাযিল হয়। পাপিষ্ঠ ফেরাউনকে আল্লাহ তা’য়ালা তখনই ধরেছেন যখন সে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবী করেছে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- হে মুসা! তুমি ফিরাউনের কাছে যাও, সে অত্যন্ত উদ্ধ্যত হয়ে গেছে (সূরা ত্বাহা- ২৪)। নমরূদকে আল্লাহ তা’য়ালা তখনই শাস্তি দিয়েছেন যখন সে নিজেকে প্রভূ বলে দাবী করেছে। অনুরূপভাবে আদ, সামুদ প্রভৃতি জাতিকে তাদের সীমাতিরিক্ত পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। বনী ইসরাঈলগণ আল্লাহর কিতাব তাওরাতকে অস্বীকার, উত্তম জিনিস তথা মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে খারাপ জিনিস তথা ভূমির উৎপন্ন জিনিস চাওয়া, আমালেকা সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধে করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মুসা (আ) ও আল্লাহকে যুদ্ধ করতে বলা এবং আল্লাহর অগণিত নিয়ামত ভোগ করেও অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে চির লাঞ্চনা ও আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয়েছে। পূর্ববর্তী নবীদের এসব  কাহিনী পবিত্র কোরআনে আলোচনা করে আল্লাহ তা’য়ালা এটিই বুঝাতে চেয়েছেন যে, যদি উম্মতে মুহাম্মদী (স)ও তাদের ন্যায় পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে তাদের পরিণতিও অনুরূপ হবে এবং একই ভাগ্যবরণ করতে হবে। 
২. বদ্ দ্বীনি কার্যকলাপের ফলে : হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, যখন সরকারি মালকে নিজের মাল মনে করা হয়, আমানতের মালকে নিজের মালের মত ব্যবহার করা হয়, যাকাতকে জরিমানা মনে করা হয়, ইসলামী আকীদা বর্জিত বিদ্যা শিক্ষা করা হয়, পুরুষ স্ত্রীর অনুগত হয়, মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়, বন্ধুদেরকে আপন মনে করা হয়, পিতাকে পর ভাবা হয়, মসজিদে শোরগোল করা হয়, পাপীলোক গোত্রের নেতা হয়, অসৎ ও নিকৃষ্ট লোক জাতির চালক হয়, ক্ষতির ভয়ে কোন লোককে সম্মান করা হয়, গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন অধিক হয়, মদ্য পানের আধিক্য ঘটে, পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের বদনাম করে- তখন যেন তারা অপেক্ষা করে লু হাওয়া (গরম বাতাস), ভূমিকম্প, ভূমিধস, মানব আকৃতি বিকৃতির, শিলাবৃষ্টি, রক্তবৃষ্টি ইত্যাদি কঠিন আযাবের, যা একটার পর আরেকটা আসতে থাকবে, যেমন হারের সুতা ছিড়ে গেলে মুক্তার দানাগুলো একটার পর একটা পড়তে থাকে (তিরমিযি)।
৩. ব্যভিচার, মাপে কম দেওয়া ইত্যাদি অপকর্মের ফলে : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহ (স) মুহাজিরগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘পাঁচটি মন্দ কাজ এমন আছে যদি তোমরা তাতে জড়িয়ে  পড়ো বা তা তোমাদের মধ্যে বাসা বাঁধে তবে খুবই খারাপ পরিণতির সম্মুখীন হবে। আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি, যেন এ পাঁচটি মন্দ কাজ তোমাদের মধ্যে জন্ম না নেয়।
ক. ‘ব্যভিচার।’ তা যদি কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মধ্যে এমন এমন রোগ দেখা দেবে যা আগে ছিল না।
খ. ‘মাপে কম দেওয়া।’ এ মন্দ কাজ যদি কোন জাতির মধ্যে জন্ম নেয়, তবে তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ দেয়া দেখা দেয় এবং তারা অত্যাচারী শাসকের শিকারে পরিণত হয়।
গ. ‘যাকাত’ না দেয়া। এ মন্দ কাজ যাদের মধ্যে দেখা দেয়, তাদের উপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। যদি সে অঞ্চলে পশু বা পাখি না থাকতো, তবে আদৌ বৃষ্টি হতো না।
ঘ. ‘আল্লাহ এবং রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।’ এ মন্দ কাজ যখন সমাজে দেখা দেয়, তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ওপর অমুসলিমদের আধিপত্য চাপিয়ে দেন। এই আধিপত্যবাদীরা তখন মুসলমানদের সহায়-সম্পদ কেড়ে নেয়।
ঙ. ‘কিতাব অনুযায়ী শাসনকার্য না চালানো।’ যদি মুসলমান শাসকরা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী শাসনকার্য না চালায়, তবে আল্লাহতায়ালা মুসলিম সমাজে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে দেন। তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে সন্ত্রাস ও খুন-খারাবী শুরু হয়ে যায়।” (বায়হাকী, ইবনে মাজাহ হাদীস নং- ১০১৯)
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বীনের কার্যকলাপে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা হলে সেই সম্প্রদায়ের লোকদের অন্তরে ভয় ভীতি ঢেলে দেয়া হয়, কোন সম্প্রদায়ে যিনা-ব্যভিচার বৃদ্ধি পেলে তাদের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়, কোন সম্প্রদায়ের লোক মাপে কম দিলে তাদের রিযিককে সংকোচিত করে দেওয়া হয়, কোন সম্প্রদায়ে অন্যায়ভাবে বিচার-ফয়সালা করা হলে-সে গোত্রে রক্তপাত বৃদ্ধি পায়, কোন সম্প্রদায়ের লোক অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে তাদের মধ্যে শত্রুতাকে প্রবল করে দেয়া হয়। (মুয়াত্তা মালেক, মিশকাত- পৃ: ৪৫৯)। 
৪. অন্যায় কাজে বাধা না দেয়ার ফলে : সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়া ফরজ। মু’মিন এ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারে না। হযরত হুজায়ফা (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবী (স) বলেছেন: যার হস্তে আমার প্রাণ নিবদ্ধ তাঁর শপথ; তোমরা অবশ্যই অবশ্যই ন্যায় কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজ থেকে (মানুষকে) বিরত রাখবে। অন্যথায় আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের উপর আযাব পাঠাবেন। অত:পর তোমাদেরকে পরিত্যাগ করা হবে এবং তোমাদের দোয়াও কবুল করা হবে না। (তিরমিযী) 
৫. অন্যায়ভাবে হত্যা করা : অন্যায়ভাবে হত্যা করা হারাম। হযরত আদম (আ:) এর পুত্র কাবিল যেদিন হাবিলকে হত্যা করে সেদিনই পৃথিবীতে প্রথম ভূমিকম্প হয়। কেননা, অন্যায়ভাবে হত্যাকান্ড আল্লাহ তা’য়ালা পছন্দ করেন না। তিনি ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন মু’মিনকে হত্যা করে তাঁর শাস্তি হলো জাহান্নাম, সে সদা সেখানে অবস্থান করবে (সূরা নিসা- ৯৩)।
রাসূলূল্লাহ (স) ইরশাদ করেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে দূরে থাকবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিষয়গুলো কি কি? রাসূলুল্লাহ (স) বললেন: ১. আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা। ২. যাদু-টোনা করা। ৩. যথাযথ কারণ ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন। ৪. সুদ খাওয়া। ৫. ইয়াতীমের সম্পদ গ্রাস করা। ৬. রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা। ৭. মুসলিম সরলা নির্দোষ মহিলাদের নামে ব্যভিচারের দুর্নাম রটনা করা। (মিশকাত, ১ম খন্ড, বাবুল কাবাইর ওয়া আলামাতুন নিফাক, সহীহ বুখারী, কিতাবুল ওয়াসায়া, হাদীস নং- ২৭৬৬) 
হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন উমর (রা) মহানবী (স) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: যদি কোন ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ কোন অমুসলিমকে হত্যা করে, তবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, কিতাবুদ দিয়াত, হাদীস নং- ২৬৮৬, সুনান নাসাঈ, কিতুবুল কাসামা হাদীসন নং-২৫)
হযরত মু’আবিয়া (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: সব গুনাহই হয়তো আল্লাহ মাফ করে দিবেন, তবে দুই ব্যক্তি ব্যতিরেকে। ১. যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মারা যায় কিংবা ২. যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু’মিনকে হত্যা করে (সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং- ৭ঃ৮১, সুনান আহমদ, হাদীস নং- ৪ঃ৯৯)।
৬. দুনিয়া প্রীতি বৃদ্ধি পেলে: মু’মিন দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতকে অধিক ভালবাসে। সাহাবায়ে কিরাম দুনিয়ার চেয়ে আখিরাতকে প্রাধান্য দিতেন এবং দ্বীনের জন্য মরণকে অধিক পছন্দ করতেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন- আমার উম্মতের উপর এমন দু:সময় আসবে যখন অন্যান্য জাতি তোমাদের উপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে যেমন ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (স)! তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, না বরং তোমরা সংখ্যায় অনেক হয়েও বণ্যার ফেনার ন্যায় ভেসে যাবে। দুশমনদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয়-ভীতি ও প্রভাব প্রতিপত্তি উঠে যাবে। তোমাদের অন্তরে ওহান (কাপুরুষতা) সৃষ্টি হবে। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ওহান কি? রাসূল (স) বললেন, দুনিয়ার মহব্বত ও মৃত্যুর ভয় (আবু দাউদ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন চারটি বিষয় ক্ষতিকর- ক. চোখ নষ্ট হওয়া, খ. কলব শক্ত হওয়া, গ. দীর্ঘ আশা করা ও ঘ. পার্থিব লোভ।
৭. ধনীরা কৃপণ হওয়া : আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: যখন তোমাদের মধ্যে উত্তম লোকেরা তোমাদের নেতা (রাষ্ট্র প্রধান) হয়, ধনীরা দানশীল হয় এবং রাষ্ট্রীয় কার্যাবলী পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়, তখন তোমাদের জন্য যমীনের নি¤œভাগ থেকে যমীনের উপরিভাগ উত্তম। আর যখন তোমাদের মধ্যে ধনী লোকেরা কৃপণ হয়, কার্যাবলী মহিলাদের নির্দেশমত চলে, তখন তোমাদের জন্য যমীনের উপরিভাগ থেকে যমীনের নি¤œভাগ উত্তম। (তিরমিযী, পৃষ্ঠা নং-৪৫৯)
(প্রধান ফকীহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ